০৮:৫১ পি.এম
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জানিয়েছেন, ভূমিকে শুধু উৎপাদনের মাধ্যম নয়, বরং মানুষের অস্তিত্বের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘সুস্থ ভূমি ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়ন কোনোটিই সম্ভব নয়।’
মঙ্গলবার রাজধানীর পরিবেশ অধিদপ্তর কার্যালয়ে বিশ্ব মরুময়তা ও খরা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আরও পড়ুন: পদ্মা সেতু হয়ে রূপপুরে ইউরেনিয়াম পরিবহন, শ্রমিক আন্দোলনের শঙ্কা
মন্ত্রী বলেন, বিশ্ব মরুময়তা ও খরা দিবস একটি আন্তর্জাতিক দিবস নন; এটি ভূমি, পরিবেশ, খাদ্য নিরাপত্তা, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘রেইঞ্জল্যান্ড: রিকগনাইজ, রেসপেক্ট, রেস্টোর’ পৃথিবীর চারণভূমি ও প্রাকৃতিক তৃণভূমি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
তিনি জানান, বিশ্বের প্রায় অর্ধেক স্থলভাগ কোনো না কোনো ধরনের চারণভূমি ইকো সিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত, যা কোটি কোটি মানুষের জীবিকা, খাদ্যব্যবস্থা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পানি চক্র এবং কার্বন সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মন্ত্রী উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ মরুভূমির দেশ না হলেও মরুময়তা, ভূমি অবক্ষয় এবং খরার ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়।
আরও পড়ুন: ত্রিশাল ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২০ বছরেও নিয়োগ হয়নি জনবল
জলবায়ু পরিবর্তনের দিকে নির্দেশ করে মন্ত্রী বলেন, অনিয়ন্ত্রিত ভূমি ব্যবহার, মাটির উর্বরতা হ্রাস, লবণাক্ততার বিস্তার, নদীভাঙন, বন উজাড় এবং দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক মৌসুম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমি অবক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত জমি, পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষয়প্রাপ্ত পাহাড়ি ভূমি এবং নদী অববাহিকার ভঙ্গুর ইকো সিস্টেম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
আবদুল আউয়াল মিন্টু জানান, গবেষণা অনুযায়ী দেশে মাঝারি থেকে অতি তীব্র মাত্রার ভূমি অবক্ষয়ের পরিমাণ ২০০০ সালের ১০ দশমিক ৭০ মিলিয়ন হেক্টর থেকে ২০২০ সালে বেড়ে ১১ দশমিক ২৪ মিলিয়ন হেক্টরে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ গত দুই দশকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২৭ হাজার হেক্টর ভূমি অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে। একই সময়ে খরাপ্রবণ এলাকার পরিমাণ ১ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন হেক্টর থেকে বেড়ে ১ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন হেক্টরে উন্নীত হয়েছে, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় ১০ দশমিক ৪ শতাংশ।
আরও পড়ুন: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে গাইবান্ধার স্মৃতি খাতুনের সাফল্য
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ভূমি ও পানি সম্পদের ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে।
বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরার প্রভাব কৃষি উৎপাদন, পানিসম্পদ ও জীবিকার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করছে।
মন্ত্রী আরও জানান, বাংলাদেশ ১৯৯৪ সালে মরুকরণ মোকাবেলায় জাতিসংঘ কনভেনশন’ (ইউএনসিসিডি)-এ স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করে এবং সেই থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
সরকারের নানা উদ্যোগের মধ্যে সামাজিক বনায়ন, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী কর্মসূচি, টেকসই কৃষি, সমন্বিত মৃত্তিকা উর্বরতা ব্যবস্থাপনা, জৈব সার ব্যবহার, সংরক্ষণ কৃষি এবং জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত সম্প্রসারণ উল্লেখযোগ্য।
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় ওয়াকফের জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ
তিনি বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংরক্ষণ, সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খরা মোকাবিলায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
বৈশ্বিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অধিকতর অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা উন্নয়ন এবং জ্ঞান বিনিময়ের আহ্বান জানান।
এছাড়া উন্নয়ন সহযোগী, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতি ভূমি পুনরুদ্ধার, খরা মোকাবিলা এবং প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানে বিনিয়োগ বৃদ্ধির আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকার ভূমি অবক্ষয় নিরপেক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে প্রচেষ্টা আরও জোরদার করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
আরও পড়ুন: সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে ৮৮ কারখানা কর্মমুখর হয়ে উঠছে
এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য অবক্ষয়প্রাপ্ত বনভূমি, জলাভূমি, চরাঞ্চল ও অন্যান্য ইকো সিস্টেম পুনরুদ্ধার, খরা মোকাবিলায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ভূমি ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবিদরা উপস্থিত ছিলেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন