০৩:২২ পি.এম
দীর্ঘদিনের চেনা বৃত্ত এবং গতানুগতিক খোলনলচে ভেঙে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে সাজানো হয়েছে। কেবল অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, এবার ম্যাচের সংখ্যা থেকে শুরু করে নকআউটের সমীকরণে সবকিছুতেই রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলা রয়েছে।
ফুটবল ইতিহাসে এর আগে এমন ১০৪ ম্যাচের মহাযজ্ঞ কখনো পৃথিবী দেখেনি! এই বিশ্বকাপের আয়োজন করছেন ৩টি দেশ, ১৬টি শহর, আর মাঠ কাঁপাতে আসছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪৮টি দল। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় এবং সবচেয়ে দামি আসর।
তিন দেশের আয়োজন:
আরও পড়ুন: আশুলিয়ায় শ্রম আন্দোলনের নামে হামলায় শ্রমিক মো. সেলিম গুরুতর আহত
২০০২ সালে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করে ফুটবল বিশ্বে নতুন নজির গড়েছিল। এবার সেই যৌথ আতিথেয়তার রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথমবার তিনটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ-যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো একসঙ্গে পুরো বিশ্বকে স্বাগত জানাবে। ১৬টি ভিন্ন ভিন্ন ভেন্যুর বৈচিত্র্যময় আবহাওয়ার পাশাপাশি তিন দেশের ভিন্ন সংস্কৃতি এবং ফুটবল উন্মাদনা এই আসরকে দেবে এক অতিরিক্ত মাত্রা।
৩২ থেকে বেড়ে ৪৮ দল:
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ থেকে সর্বশেষ কাতার বিশ্বকাপ পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বমঞ্চে ৩২টি দলের লড়াই দেখতেই অভ্যস্ত ছিলেন দর্শক। তবে দীর্ঘ ২৮ বছরের সেই চেনা বৃত্ত এবার ভাঙছে। উত্তর আমেরিকার এই আসরে দল বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪৮টি। বৈশ্বিক ফুটবলের এই বড় সম্প্রসারণের ফলে সুযোগ পেয়েছে এমন অনেক দেশ, যারা আগে কখনো বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখার সুযোগ পায়নি। ফলে এবার দেখা যাবে রেকর্ড সংখ্যক নতুন ফুটবলার এবং আন্ডারডগ দলের রোমাঞ্চকর লড়াই।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং দামি জাঁকজমকপূর্ণ বিশ্বকাপ। যেখানে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্ত থেকে আসা ফুটবল যোদ্ধারা লড়বে সিলভিও গাজ্জানিগার তৈরি সেই সোনালি ট্রফিটিকে মাথার ওপর তুলে ধরার জন্য।
আরও পড়ুন: শুক্রবার চট্টগ্রামে যাচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, মহাসম্মেলনে বক্তব্য দেবেন
ম্যাচের সেঞ্চুরি:
দল বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ম্যাচ সংখ্যা। কাতার বিশ্বকাপে ফাইনাল পর্যন্ত মোট ৬৪টি ম্যাচ দেখার সুযোগ হয়েছিল। এবার তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১০৪টিতে। অর্থাৎ, এবার বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ম্যাচের সেঞ্চুরি দেখতে যাচ্ছেন ফুটবলপ্রেমীরা। ৩৯ দিনব্যাপী এই টুর্নামেন্টে ফুটবল উন্মাদনার কোনো কমতি থাকবে না, যা যেকোনো ক্রীড়া আসরের জন্য একটি নতুন রেকর্ড।
নকআউটে নতুন সমীকরণ:
দল এবং ম্যাচের সংখ্যা বাড়ায় ফিফাকে বদলে ফেলতে হয়েছে টুর্নামেন্টের মূল কাঠামো। এবার ৪৮টি দলকে ভাগ করা হয়েছে মোট ১২টি গ্রুপে। যেখানে প্রতি গ্রুপে থাকছে ৪টি করে দল। আগের মতো প্রতি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দলের নকআউটে যাওয়াটা নিশ্চিত, তবে এবার নতুন টুইস্ট হিসেবে ১২টির মধ্যে সেরা ৮টি ‘তৃতীয় স্থান’ অধিকারী দলও শেষ ৩২-এ যাওয়ার টিকিট পাবে। এর ফলে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচ পর্যন্ত প্রতিটি দল টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবে।
আরও পড়ুন: সাফের আন্তর্জাতিক ফুটবল আসরে চিকিৎসাসেবার দায়িত্বে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ট্রফি ছুঁতে জিততে হবে আট ম্যাচ:
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এত দিন চ্যাম্পিয়ন হতে হলে একটি দলের জন্য ফাইনাল পর্যন্ত মোট ৭টি বাধা অতিক্রম করতে হত। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই সমীকরণ অতীত হয়ে যাবে। নতুন কাঠামোর অনুযায়ী এবার সোনার ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে চাম্পিয়ন দলকে পুরো টুর্নামেন্টে রেকর্ড ৮টি ম্যাচে জিততে হবে। ৩৯ দিনের এই দীর্ঘ পথচলায় শারীরিক এবং মানসিকভাবে যে দল সবচেয়ে বেশি লড়াকু হবে, তাদের মাথায় উঠবে বিশ্বসেরার মুকুট।
তবে এবারের বিশ্বকাপের গল্প শুধুমাত্র মেসি, নেইমার, রোনালদো, এমবাপ্পে বা ভিনিসিয়ুসদের ঘিরেই নয়। ফুটবল ইতিহাসের পাতায় প্রথমবারের মতো সর্বাধিক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের উপস্থিতি তৈরি করেছে নতুন আলোচনার জন্ম! মধ্যপ্রাচ্য থেকে আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া থেকে উত্তর আফ্রিকা, মুসলিম বিশ্বের একটি অভূতপূর্ব এবং শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব দেখা যাবে এইবারের ফুটবল আসরে।
বিশ্বকাপে মুসলিম বিশ্বের রেকর্ড উপস্থিতি:
আরও পড়ুন: আশুলিয়ায় বিএনপি'র পথসভা, অস্থিতিশীল পরিবেশের প্রতিবাদে আহ্বান
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে মুসলিম দেশের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬টি, যেখানে এবার তা এক লাফে পৌঁছেছে ১৪টিতে! অর্থাৎ, ৪৮ দলের এই মেগা আসরের প্রায় ৩০ শতাংশই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। মহাদেশভিত্তিক হিসাবে, সবচেয়ে বেশি প্রতিনিধিত্ব এসেছে এশিয়া এবং আফ্রিকা থেকে। এশিয়া থেকে মাঠ কাঁপাতে আসছে সৌদি আরব, কাতার, ইরান এবং ইরাক। তাদের সাথে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের আলোয় পা রাখতে চলেছে জর্ডান এবং উজবেকিস্তান। আফ্রিকা থেকে নাইজেরিয়া, সেনেগাল, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, মিশর এবং ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো। অন্যদিকে ইউরোপ থেকে প্রতিনিধিত্ব করছে তুরস্ক এবং বসনিয়া হের্জেগোভিনা। তবে উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চল থেকে এ সময় কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ জায়গা করে নিতে পারবে না। এবারের বিশ্বকাপে রয়েছে কয়েকটি দারুণ প্রত্যাবর্তনের গল্পও। প্রায় ৪০ বছর পর আবার বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছে ইরাক এবং ২৪ বছর পর ফিরছে তুরস্ক। সব মিলিয়ে, ২০২৬ বিশ্বকাপে মুসলিম দেশগুলোর এই রেকর্ড উপস্থিতি শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি বিশ্ব ফুটবলে মুসলিম বিশ্বের ক্রমবর্ধমান শক্তি, বিনিয়োগ এবং প্রতিযোগিতার একটি অনন্য নজির।
সোনার পায়ে ফুটবলের রাজপুত্ররা:
এবার চলুন টাকার অঙ্কে। এই কোটি কোটি ডলারের টুর্নামেন্টে সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় কে? একসময় বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় স্টার ছিল মেসি, রোনালদো এবং নেইমার। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামছেন স্পেনের মাত্র ১৮ বছর বয়সী বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামাল। বর্তমান বাজারে তার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২৫ কোটি ৪০ লাখ ইউরো। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হলান্ড। ক্লাব ফুটবলে ধারাবাহিক গোল করার পাশাপাশি ইউরোপের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করায় তার বাজারমূল্য ১৯ কোটি ৯০ লাখ ইউরো। তৃতীয় স্থানে আছেন ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে যার বাজারমূল্য ১৯ কোটি ইউরো। তার নেতৃত্বেই বাজারমূল্যের দিক থেকে সবচেয়ে দামি স্কোয়াড নিয়ে বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে ফ্রান্স।
কোচিং দুনিয়ার মহানায়করা:
আরও পড়ুন: পুষ্টি ও গবেষণায় সহযোগিতা বাড়াতে বাকৃবি-নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনালের সমঝোতা
খেলোয়াড়দের মাঠে লড়ে কিন্তু ডাগআউটের মাস্টারমাইন্ডদের পেছনে কার খরচ সবচেয়ে বেশি? এই তালিকার শীর্ষে আছেন ব্রাজিলের নতুন ডিরেক্টর বা কোচ কার্লো আনচেলত্তি। হেক্সা মিশনের জন্য আনচেলত্তির ওপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস রেখে ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত তার চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (সিবিএফ)। আর সেই বিশ্বাসের মূল্য হিসেবেই তাকে দেওয়া হচ্ছে বার্ষিক বেতন ৮২ লাখ ৮০ হাজার পাউন্ড। দ্বিতীয় স্থানে আছেন ইংল্যান্ডের টমাস টুখেল, যার বার্ষিক বেতন প্রায় ৫০ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড। তৃতীয় স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের মাউরিসিও পচেত্তিনো, তিনি পান প্রায় ৪৫ লাখ ৩০ হাজার পাউন্ড। এরপর রয়েছেন জার্মানির জুলিয়ান নাগেলসম্যান (৪২ লাখ পাউন্ড), উজবেকিস্তানের ফ্যাবিও ক্যানাভারো (৩৫ লাখ পাউন্ড), এবং পর্তুগালের রবার্তো মার্তিনেজ (৩৫ লাখ পাউন্ড)। ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী কোচ দিদিয়ের দেশম বছরে আয় করেন প্রায় ৩৩ লাখ ১০ হাজার পাউন্ড। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি পান প্রায় ২৮ লাখ পাউন্ড। তালিকার শেষ দুই স্থানে আছেন উরুগুয়ের কিংবদন্তি মার্সেলো বিয়েলসা এবং নেদারল্যান্ডসের রোনাল্ড কোম্যান। দুজনেরই বার্ষিক বেতন প্রায় ২৬ লাখ ১০ হাজার পাউন্ড।
রেকর্ড ভাঙার মেগা মঞ্চে বিশ্বকাপের নতুন যুগ:
ফুটবলের দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। দুজনই এখন ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে রয়েছেন। হয়তো সময়ই উন্মোচন করবে সেই মহাকাব্যিক মুহূর্ত, যেখানে শেষবারের মতো দেখা যেতে পারে তাদের বিশ্বকাপের মঞ্চে।
তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগে প্রশ্নটা তোলা রইল আপনার কাছেই রেকর্ডের এই মহা-আসরে কার হাতে দেখতে চান বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি? কমেন্ট করে জানান আপনার প্রিয় দলের নাম!
আরও পড়ুন: ‘ইউ ক্যান ডু ইট’ বলেছেন প্রধানমন্ত্রী, ১৬ লাখ শিশু-কিশোরের নিবন্ধন
বিশ্বকাপে ফুটবলে কেনো চার্জ দিয়ে খেলতে হবে:
এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চমকটি লুকিয়ে রয়েছে মাঠের ফুটবলে। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এবারের বিশ্বকাপের বল হয়ে উঠছে আরও নিখুঁত এবং স্মার্ট। সবচেয়ে অবাককর ব্যাপার হলো, মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপের মতো এই ফুটবলকেও মাঠে নামানোর আগে দিতে হবে চার্জ!
১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বকাপের বল তৈরি করে আসছে বিখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। ২০২৬ সালের জন্য তারা যে বলটি উন্মোচন করেছে, তার নাম দেওয়া হয়েছে ট্রিওন্ডা। এতে ব্যবহার করা হয়েছে কানেক্টেড বল টেকনোলজি, যা মূলত মাঠে রেফারিদের সিদ্ধান্ত নিতে দারুণভাবে সাহায্য করবে। খালি চোখে এটি সাধারণ ফুটবলের মতো মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে দারুণ বিজ্ঞান। ট্রিওন্ডা বলের ভেতরে একটি ৫০০ হার্জের ইনর্শিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট মোশন সেন্সর চিপ বসানো রয়েছে। একটি ঝুলন্ত সিস্টেমের মাধ্যমে চিপটি বলের ভেতরে আটকে রাখা হয়। কাতার বিশ্বকাপের বলেও ছিল এই চিপ। তবে ২০২২ বিশ্বকাপের বলের সঙ্গে এর একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। আগের বিশ্বকাপে সেন্সরটি বলের ঠিক মাঝখানে বসানো ছিল। এবারের এই বলের সেন্সরটি বসানো হয়েছে বলের এক পাশে!
আসন্ন ১০৪ ম্যাচের সেই দীর্ঘ মহাযাত্রার প্রতিটি মিনিটে তাই রেকর্ড ইতিহাস গড়ার হাতছানি।
লেখক: ইউনুস রাজু, সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন