০১:৪৩ পি.এম
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার মন্তব্য করেছেন যে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ৩০টি অর্থনীতির একটি হতে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ হল বিশ্বের অন্যতম গতিশীল অর্থনীতি। দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল এবং সমগ্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পরিধি, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও গুরুত্ব অনেক বড়।
রবিবার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এ দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ তার উন্নয়ন যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের বিষয়টিও রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে রাজনৈতিক রূপান্তর সামাল দেওয়া, জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করা, অর্থনৈতিক চাপ, জলবায়ুগত ঝুঁকি এবং একটি জটিল বাহ্যিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় আটক ৬৬২ জন
তিনি বলেন, ‘এই পটভূমিতে আমরা বাংলাদেশকে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বের একটি অংশীদার হিসেবে দেখছি। দাতা ও সাহায্যগ্রহীতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়—বরং এখন একটি ভিন্ন মাত্রার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমরা সম্পর্ককে দেখতে চাই।’
মাইকেল মিলার আরও বলেন, এলডিসি মর্যাদা থেকে বাংলাদেশের মসৃণ ও সফল উত্তরণ নিশ্চিত করতে একসঙ্গে কাজ করতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে একটি সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সম্ভাবনা পরীক্ষা করে দেখতে চায়।
বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রস্তাব দেওয়াকে তিনি তাদের ইতিহাসে প্রথম ও অনন্য উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘মূল বার্তাটি হলো—বাংলাদেশ যে গতি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখাবে, আমরা তার সঙ্গে তাল মেলাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।’
আরও পড়ুন: ‘বিরোধীদলে থাকতেই কবর দিতে বাধা, রাষ্ট্রক্ষমতা পেলে কী করবেন’
তবে সম্ভাব্য এফটিএর ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে পর্যাপ্ত অভিন্ন ভিত্তি রয়েছে কি না, তা আগে দেখতে হবে বলে জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে ভারতের ও ভিয়েতনামের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির উদাহরণ তুলে ধরেন মাইকেল মিলার।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তির সফলতা নির্ভর করবে জবাবদিহিতামূলক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, শ্রম অধিকার ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সুশাসনের ওপর।
এই বিষয়গুলোই আসল মূল বিষয়, এগুলো মোটেও গৌণ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মাইকেল মিলার বলেন, বাংলাদেশকে যদি বাহ্যিক চাপ, ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক চাপ, জলবায়ু, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত চাপ সামলে এগিয়ে যেতে হয়, তাহলে দেশটির শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা এবং পূর্বাভাসযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখা আমাদের প্রধান দায়িত্ব: নাহিদ ইসলাম
সাংবিধানিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। এ জন্য রাজনীতিতে আরো বৃহত্তর ঐকমত্য গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন ইইউ রাষ্ট্রদূত।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি, সবুজ প্রবৃদ্ধি, আরো বৈচিত্র্যময় রপ্তানি খাত এবং নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো প্রয়োজন।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং তরুণদের জন্য অর্থবহ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মাইকেল মিলার বলেন, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ সুরক্ষিত রাখা এবং ডেটা বা তথ্য স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। এসব বিষয় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: ঢাবির সূর্যসেন হলের রাশেদ খাঁন ছাত্রশিবিরের শপথবদ্ধ সাথী: তারেক রেজা
বাংলাদেশের জন্য ইইউর বিশেষ প্রস্তাব তুলে ধরে তিনি বলেন, ইউরোপীয় মূল্যবোধের সঙ্গে ইউরোপীয় বিনিয়োগের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রযুক্তি, মানদণ্ড, দীর্ঘমেয়াদি মূলধন ও উদ্ভাবন নিয়ে আসতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল এবং ‘গ্রিন বন্ড’ ইস্যুর মতো উদ্যোগের উদাহরণ দেন তিনি।
ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাবের বড় একটি মূল্য সংযোজন হলো সরকারি প্রশাসন সংস্কারের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের একনায়কতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ এবং রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজকে নতুনভাবে সংগঠিত করার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায় ইইউ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ যেন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সামলে এগিয়ে যেতে পারে, আধুনিক হতে পারে এবং একই সঙ্গে উন্মুক্ত, সার্বভৌম, সহনশীল ও সংযুক্ত থাকতে পারে—সেই লক্ষ্যেই এই প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন: যুবদলকে শক্তিশালী ও আদর্শভিত্তিক সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলতে চাই: নুরুল ইসলাম নয়ন
এর আগে বক্তব্যে বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৌশলগত অবস্থান তুলে ধরে মাইকেল মিলার বলেন, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন মানে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বা নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে নেওয়া নয়। বরং উন্মুক্ত থাকা, তবে অসচেতন না হওয়া; যুক্ত থাকা, তবে নির্ভরশীল না হওয়া এবং সহযোগিতামূলক ও বাস্তববাদী হওয়াই ইইউর অবস্থান।
তিনি বলেন, আজকের আরো লেনদেনমুখী বিশ্বে নির্ভরযোগ্যতা, পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং নীতির গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সে কারণেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদের নীতিমালা, ন্যায্য ও নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য, মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা এবং প্রকৃত বহুপাক্ষিকতার পক্ষে দাঁড়িয়েছে।
মাইকেল মিলার বলেন, অনিশ্চয়তার সময়ে দেশ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন অংশীদার প্রয়োজন, যারা নির্ভরযোগ্য, প্রতিটি সম্পর্ককে শুধু একটি লেনদেন হিসেবে দেখে না এবং দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতায় বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত। পারস্পরিক স্বার্থ, শ্রদ্ধা, ন্যায্যতা ও সবার জন্য সমান সুযোগের ভিত্তিতে এমন অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চায় ইইউ।
তিনি জানান, জলবায়ু, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ডিজিটাল রূপান্তর ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও সহযোগিতা করতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ‘গ্লোবাল গেটওয়ে’ উদ্যোগের মাধ্যমে বুদ্ধিমান, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা অংশীদারত্বের একটি ব্যবহারিক মডেল।
আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১০ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মায়ের মামলা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন