১১:২২ এম
জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) সতর্ক করে জানিয়েছে, ‘এল নিনো’ এখন শুরু হয়েছে এবং জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি দ্রুত শক্তিশালী রূপ গ্রহণ করবে। এর ফলস্বরূপ, চলতি বছরের ‘এল নিনো’ আবহাওয়াগত পরিস্থিতির সামগ্রিক শক্তির দিক থেকে অতীতের সকল রেকর্ডের চেয়েও বেশি হয়ে যাবে। এর প্রভাবে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে খরা, বন্যাসহ অন্যান্য চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি তীব্র আকার ধারণ করেছে।
এল নিনোর ফলে মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের ধারায় পরিবর্তন হয়। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর এল নিনো ঘটে এবং এর স্থায়িত্ব প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস হয়। এল নিনো ও এর বিপরীত অবস্থা ‘লা নিনা’ মধ্যে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন ঘটে, মাঝে থাকে নিরপেক্ষ অবস্থা।
ডব্লিউএমও’র বরাত দিয়ে জেনেভা থেকে ৩ জুলাই এএফপি জানিয়েছে, জলবায়ুবিষয়ক এই প্রাকৃতিক ঘটনাটি চলতি বছরে দ্রুত তীব্রতার দিকে যাচ্ছে। তাই সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলার জন্য দেশগুলোকে এখন থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: অ্যাম্বুলেন্স সেবায় সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ, রোগী ও স্বজনরা জিম্মি
ডব্লিউএমওর মাসিক ‘গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেট’-এ বলা হয়েছে, ‘জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী অবস্থায় পৌঁছাবে।’ সংস্থাটি এল নিনোকে দুর্বল, মাঝারি, শক্তিশালী এবং অত্যন্ত শক্তিশালী - এই চারটি শ্রেণিতে ভাগ করেছে। বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, এটি তৃতীয় স্তর অর্থাৎ ‘শক্তিশালী’ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাবে।
ডব্লিউএমও জানিয়েছে, ‘ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং আগামী কিছু মাসের মধ্যে এটি দ্রুত শক্তিশালী হবে। এর ফলে বিশ্বের অনেক স্থানে চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলো ঘটার সম্ভাবনা বাড়বে।’
ডব্লিউএমওর জলবায়ুবিজ্ঞানী আলভারো সিলভা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত মাসের তুলনায় এখন অনেক বেশি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে যে বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। যদি ভবিষ্যৎ পূর্বাভাসে দেখা যায় এটি আরও তীব্র রূপ নেবে, তাহলে আগামী মাসগুলোতে ডব্লিউএমও নতুন হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করবে।
জেনেভাভিত্তিক সংস্থাটি জানায়, বিভিন্ন বৈশ্বিক জলবায়ু কেন্দ্রের মডেলভিত্তিক পূর্বাভাসে মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ধারাবাহিক ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি আজ উদ্বোধন করবেন বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট
ডব্লিউএমও’র মতে, গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ অঞ্চলে মৌসুমি গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বাড়তে পারে। উত্তরের গোলার্ধের শরৎকালজুড়ে এল নিনো আরও শক্তিশালী হতে থাকবে এবং এর প্রভাব বিশ্বের অনেক অংশে বিস্তৃত হবে।
সবশেষ এল নিনোর প্রভাবে ২০২৩ সাল রেকর্ডের দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর ছিল। ২০২৪ সাল ছিল ইতিহাসের উষ্ণতম বছর, যখন বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্পপূর্ব (১৮৫০-১৯০০) সময়ের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হয়। এল নিনো সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সর্বোচ্চ তীব্রতা পায়, তবে এর ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব সাধারণত পরে আরও স্পষ্ট হয়।
সিলভা আরও উল্লেখ করেন, এল নিনোর প্রভাব চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত এবং ২০২৭ সালেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হবে। কৃষি ও স্বাস্থ্যসহ জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতগুলোকে প্রস্তুত রাখার জন্য আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে বলেও জানান ডব্লিউএমও।
সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো জানাচ্ছেন, মানুষের জীবন রক্ষা ও অর্থনীতি ও সমাজে সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে এসব আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এল নিনো ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে এবং দ্রুত শক্তিশালী হবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। এর ফলে বহু অঞ্চলে খরা, অতিবৃষ্টি, স্থলভাগে তাপপ্রবাহ এবং সমুদ্রে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের ঝুঁকি আরও বাড়বে।
আরও পড়ুন: ভারতের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে এআইনির্ভর সাইবার হামলার ঝুঁকি
ডব্লিউএমও’র হালনাগাদ পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ অক্ষাংশের ৬০ ডিগ্রি থেকে উত্তর অক্ষাংশের ৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সকল জনবসতিপূর্ণ স্থলভাগে সাধারণের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করার সম্ভাবনা পর্যাপ্ত।
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হওয়া সম্ভাব্য। অন্যদিকে ভারতীয় উপমহাদেশ এবং অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
ডব্লিউএমও জানাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর দফায় দফায় সৃষ্টি বা তীব্রতা বৃদ্ধির কোনো প্রমাণ নেই। উষ্ণতর সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডল চরম আবহাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও আর্দ্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে, তাই জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনোর প্রভাবকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকালে এল নিনোর কারণে উষ্ণ সমুদ্রের পানি মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বাড়াতে পারে। বিপরীতে, আটলান্টিক মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি ও বিকাশ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর
এদিকে বৃহস্পতিবার পেরু এল নিনোজনিত ভারী বৃষ্টিপাতের ‘আসন্ন ঝুঁকির’ কারণে দেশের ১ হাজার ৮০০টি পৌরসভার মধ্যে ৮০০টিতে ৬০ দিনের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। দেশটিতে ৯৩ লাখেরও বেশি মানুষ বন্যা ও ভূমিধসের অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে সতর্ক হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব:
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: এল নিনোর বছরগুলোতে এশিয়ার অনেক অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে শুষ্ক পরিস্থিতি ও খরা দেখা দেয়। চলতি বছরের এল নিনো দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ুকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যার কারণে ভারতসহ উপমহাদেশের অন্যান্য অংশে কৃষিকাজের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বৃষ্টিপাত কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারতীয় কৃষি কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে পরিস্থিতি মোকাবিলার জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন।
অস্ট্রেলিয়া: এল নিনোর কারণে অস্ট্রেলিয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণ পরিস্থিতি বিরাজমান থাকে, যা সেখানে তীব্র খরা, তাপপ্রবাহ ও দাবানলের ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি করে।
আরও পড়ুন: গাজীপুরে শ্রমিকদের মারধরে মৃত্যু, তৌফিকের স্ত্রী ও ১২ মাসের সন্তান বিপাকে
আফ্রিকা: আফ্রিকার ‘হর্ন অফ আফ্রিকা’ অঞ্চলে এর প্রভাবে বৃষ্টিপাত বেড়ে গেলেও দক্ষিণ, পশ্চিম, মধ্য ও পূর্ব আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সাধারণত স্বাভাবিকের চেয়ে শুষ্ক ও খরা পরিস্থিতি হবে।
দক্ষিণ আমেরিকা: উপকূলীয় পেরু ও ইকুয়েডরসহ পশ্চিম দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে। অপরদিকে, উত্তর ব্রাজিলে শুষ্ক আবহাওয়া দেখা দেবে, যা আমাজন বনে দাবানলের বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন