০৬:৩৬ এম
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে জুলাই শহীদ ছেলের অনুদানের টাকা দিয়ে সোয়া ৫ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার কিনে দ্বিতীয় বিয়ে করার অভিযোগ উঠেছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনের বাবা মোহাম্মদ আব্দুল মতিনের (৫০) বিরুদ্ধে।
মোহাম্মদ আব্দুল মতিন বর্তমানে রাজধানীর মতিঝিলে একটি প্রতিষ্ঠানে সেলস ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন। তার প্রথম স্ত্রী জান্নাত বেগম (৪৫) এবং উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের কুমড়াশসন গ্রামের এই দম্পতির একমাত্র ছেলে ছিলেন শেখ শাহরিয়ার বিন মতিন। তাদের এক দশকের একটি মেয়ে সন্তানও রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই আব্দুল মতিন দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তবে তিনি এই অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করেন, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিয়েই দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন।
আরও পড়ুন: নকলায় এসবিসি প্রকল্পের এমএনসিএএইচ বিষয়ে জনসংলাপ
জানা গেছে, আব্দুল মতিন ও মমতাজ বেগমের মধ্যে বিয়ের সম্পর্ক ২০০৪ সালের ৭ নভেম্বর থেকে শুরু হয়। দীর্ঘ ২২ বছরের দাম্পত্য জীবন কাটানোর পর স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের কারণে তাদের সম্পর্কে ফাটল দেখা দিয়েছে।
ছাত্রজনতার আন্দোলনে অংশগ্রহণের সময় ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বিকেলে ঢাকার মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন শেখ শাহরিয়ার বিন মতিন। গুলি তার ডান চোখের পাশ দিয়ে ঢুকে মাথা ভেদ করে বেরিয়ে যায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ২০ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জুলাই শহীদ ছেলের ভাতার অনুদানের টাকা থেকে ৭ লাখ টাকার কাবিন ও সোয়া ৫ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার দিয়ে গত ২৯ মে নদীর ধার থেকে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন আব্দুল মতিন।
এ ঘটনার খবর পেয়ে অভিমানে গত ২ জুন একমাত্র মেয়েকে নিয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন মমতাজ বেগম। তবে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি বুঝতে পেরে তাকে আত্মহত্যা থেকে রক্ষা করেন।
আরও পড়ুন: সাংবাদিক আলিফ হত্যার আসামি অপূর্বর ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর
এ ঘটনা পরে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলে দেয়। আব্দুল মতিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি জুলাই শহীদ ছেলে শাহরিয়ারের নাম ভাঙিয়ে নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। স্থানীয়রা দাবি করছেন, অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বেশ অর্থবিত্তের মালিক হয়ে গেছেন।
মমতাজ বেগম গণমাধ্যমকে বলেন, “সন্তান হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই আমার অনুমতি ছাড়াই আব্দুল মতিন দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। আমার জানা মতে, বিয়েতে সোয়া ৫ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার কেনার সামর্থ্য তার নেই। আমার শহীদ ছেলের রক্তের দাগ শুকানোর আগেই সরকারের দেওয়া অনুদানের টাকায় তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করছেন।”
তিনি বলেন, “আমার ছেলের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর পর থেকেই তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য আমাকে বিভিন্নভাবে চাপ দিচ্ছিলেন। তিনি বারবার বলেছিলেন, ‘আমার বংশ রক্ষার জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করতে হবে।’”
মমতাজ বেগম আরও অভিযোগ করেন, আব্দুল মতিন জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ একমাত্র ছেলে শাহরিয়ারের মৃত্যুকে পুঁজি করে নানা প্রতারণা ও ধান্ধাবাজি শুরু করেন। নিষেধ করার পরও তিনি শুনতে চাননি। দুই বউয়ের ভরণপোষণের সামর্থ্য তার নেই। তিনি বলেন, “আমি ২২ বছর তার সঙ্গে কাটিয়েছি। তার আর্থিক অবস্থা ভালো নয়।”
আরও পড়ুন: টাঙ্গাইলে শোষিতের কণ্ঠের ৮ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেক কেটে উদযাপন করা হয়
তিনি অভিযোগ করেন যে, শহীদ পরিবারকে দেওয়ার সরকারি বরাদ্দের এককালীন ৩০ লাখ টাকা তিনি তার সই জালিয়াতি করে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আমি সচেতন থাকায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। শুধু তা নয়, আমার শহীদ ছেলের নাম ভাঙিয়ে আব্দুল মতিন বিভিন্ন সময়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। আমার এখন একটাই চাওয়া, মেয়েটাকে বড় করার আগে যেন আল্লাহ আমাকে নিয়ে না যায়। আমি এ ঘটনার সঠিক বিচার দাবি জানাচ্ছি।
অভিযোগ অস্বীকার করে শহীদ শাহরিয়ারের বাবা মোহাম্মদ আব্দুল মতিন বলেন, “আমার বংশ রক্ষার জন্য আমি দ্বিতীয় বিয়ে করেছি। বিশেষ করে আমার মায়ের অনুরোধে আমি বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছি। এছাড়া বিয়ে করার আগে প্রথম স্ত্রী আমাকে দ্বিতীয় বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু তিনি এখন তা অস্বীকার করছেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমি আলফা গ্রুপের মতিঝিল শাখায় সেলস ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছি। বিয়ে করার মতো সামর্থ্য আমার আছে। ছেলের অনুদানের টাকা দিয়ে বিয়ে করতে হবে, বিষয়টি এমনও নয়। বিয়ে করার পর আমি প্রথম স্ত্রীকে আনতে পাঁচবার বাসায় গিয়েছি। মেয়ের সঙ্গেও দেখা করতে পারিনি। সবশেষ অন্য একজনের মাধ্যমে তাদের বাসায় প্রবেশ করি। কিন্তু আমাকে অসম্মান করে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি এখন সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছি।”
এ বিষয়ে জুলাই যোদ্ধা রুহুল আমিন রিপন গণমাধ্যমকে বলেন, “একজন জুলাই শহীদের বাবা হয়ে মতিন সাহেব যে কাজটি করেছেন তা মোটেও উচিত হয়নি। আমি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।”
আরও পড়ুন: নবাগত বিভাগীয় কমিশনারের শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী আল নূর আয়াস বলেন, “জুলাই শহীদ শাহরিয়ার বিন মতিনের বাবার দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি শুনেছি। তবে বিষয়টি মেনে নেওয়ার মতো না। ছেলেকে যদি সত্যিই তিনি ভালোবাসতেন, তাহলে তিনি এমন একটি কাজ করতেন না। তাদের একটি মেয়েও রয়েছে। তিনি চাইলেই মেয়েটাকে নিয়েই সংসার করে যেতে পারতেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন