০২:২১ এম
ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় দিন ছিল ১৯৯৮ সালের ১২ জুলাই। ওই দিন ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে পরাজিত করে ফ্রান্স প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ফাইনালে অসাধারণ অবদান ও জোড়া গোল করে জিনেদিন জিদান ফরাসিদের কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। বিপরীতে, সেই বছরের ১৩ মে তার দ্বিতীয় পুত্র সন্তান লুকা জন্মগ্রহণ করেন। বুধবার (১৭ জুন) সেই লুকার অভিষেক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আলজেরিয়ার জার্সিতে। বর্তমানে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা থেকে তার গুরুদায়িত্ব থাকবে জাল অক্ষত রাখার।
লুকা জিদান, ফ্রান্সের এক্স-অঁ-প্রোভঁস শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং তিনি ফরাসি যুবদলের হয়ে খেলেছেন। তিনি ২০১৫ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপও জিতেছেন। তার বাবা জিনেদিন জিদান ফরাসি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কিংবদন্তি হলেও, নিজ শিকড়ের টানকে লুকা অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। সুতরাং, গত সেপ্টেম্বর মাসে গ্রানাডার এই গোলরক্ষক আলজেরিয়ার প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন।
লুকার দাদা-দাদি, ইসমাইল ও মালিকা, ১৯৬২ সালে আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দেশ ছেড়ে ফ্রান্সে আসেন। এই পারিবারিক ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক লুকার সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা পালন করেছে। তিনি ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী ১০১ জন খেলোয়াড়ের একজন, যারা ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেও অন্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে।
আরও পড়ুন: হায় সেলুকাস, আমাদের এই বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি
লুকা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমি যখন আলজেরিয়ার কথা ভাবি, তখন আমার দাদার কথা মনে পড়ে। ছোটবেলা থেকে আমরা আলজেরীয় সংস্কৃতির মধ্যে বড় হয়েছি, আর এই ভালোবাসা আমাদের মধ্যে গড়ে তুলেছেন আমার দাদা-দাদি। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপিয়ে জাতীয় সংগীত শুনলে আমি অবিশ্বাস্য আবেগ অনুভব করি।’
জিনেদিন জিদানের মতো, যিনি কখনো নিজের আলজেরীয় শিকড়কে লুকাননি, লুকাও সবসময় নিজের ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত ছিলেন। এটি তাকে আলজেরিয়ার হয়ে খেলায় সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেছে।
কেবল আবেগই নয়, বাস্তবতাও ছিল একটি কারণ। উগো লরিসের যুগ শেষ হওয়ার পর মাইক মেনিয়ঁ ফ্রান্সের এক নম্বর গোলরক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাই ফরাসি জাতীয় দলে নিয়মিত সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা লুকার জন্য অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় আলজেরিয়ার ডাক তার জন্য একটি স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়ায়।
লুকা জিদান ফুটবলের হাতেখড়ি নিয়েছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের যুব একাডেমিতে। ২০১৮ সালের ১৯ মে বাবা জিদানের অধীনে রিয়ালের প্রথম দলে ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র ম্যাচে অভিষেক ঘটে। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব না হওয়ায় এবং থিবো কোর্তোয়া ও কেইলর নাভাসের মতো বিশ্বমানের গোলরক্ষকদের ছায়ায় পড়ে যাওয়ায় তিনি নতুন পথ খোঁজার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আরও পড়ুন: বর্ণাঢ্য আয়োজনে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত
পরে রায়ো ভায়োকানো, রেসিং সান্তান্দার এবং এসডি এইবারের হয়ে খেলেছেন। অবশেষে তিনি গ্রানাডায় পৌঁছান। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ক্লাবে যোগ দেওয়ার পর থেকে ৪৫ ম্যাচে মাঠে নেমে ১৫টি ক্লিন শিট রেখেছেন এবং ধারাবাহিক দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে বিশ্বকাপ দলের সদস্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন।
তবে এবারের বিশ্বকাপে তার অংশগ্রহণ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চিত ছিল। এপ্রিল মাসে আলমেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ফরোয়ার্ড অস্কার নাসেইয়ের সঙ্গে সংঘর্ষে তার চোয়াল ও থুতনিতে গুরুতর আঘাত লাগে। সৌভাগ্যক্রমে সুস্থ হয়ে ফিরলেও, আক্রান্ত অংশকে সুরক্ষিত রাখতে বিশেষভাবে তৈরি মুখোশ পরে মাঠে নেমে তিনি খেলবেন।
কিন্তু কেন বিশ্বের অন্যতম সেরা, দক্ষ ও নান্দনিক ফুটবলার জিনেদিন জিদানের ছেলে হয়ে লুকা গোলরক্ষক হলেন? এর পেছনে বড় ভূমিকা ছিল তার বড় ভাই এনজো। লুকা বলেছেন, ‘ছোটবেলায় আমি ভাইয়ের সঙ্গে ফুটবল খেলতাম। আমি আকারে ছোট ছিলাম বলে সে সবসময় আমাকে গোলপোস্টে দাঁড় করিয়ে দিত। সে বলত আমি নাকি বেশ ভালো গোলরক্ষক, যদিও এখনো জানি না সে সত্যি বলেছিল নাকি মজা করেছিল।’
নিজের আলাদা পরিচয় গড়ার ইচ্ছাও তাকে এই পথে এনেছে। লুকা ব্যাখ্যা করেন, ‘আমি গোলরক্ষক হিসেবেই থেকে গেছি কারণ আমার ব্যক্তিত্ব আলাদা। আমি বাবার সঙ্গে তুলনা পছন্দ করি না, আর গোলরক্ষক হলে তাঁর সঙ্গে তুলনা করা কঠিন।’
আরও পড়ুন: স্বৈরাচারের গুলি দেখেনি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে খ্রিষ্টান: প্রধানমন্ত্রী
২৮ বছর বয়সী এই ফুটবলার মাঠের বাইরেও নিজের পরিচয় তৈরি করার চেষ্টা করছেন, যা তার বিখ্যাত পদবির ভার থেকে আলাদা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি সক্রিয় এবং নিজের ফ্যাশন-সচেতনতা ও ব্যক্তিগত স্টাইল নিয়মিত তুলে ধরেন।
‘ওল্ড মানি’ ট্রেন্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তার ক্লাসিক, বহুমুখী ও মার্জিত পোশাক তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ফেলে। লিনেন শার্ট, টেক্সচারযুক্ত পোলো শার্ট, ঢিলেঢালা পোশাক এবং সূক্ষ্ম অনুষঙ্গগুলো তার স্টাইলের নিয়মিত অংশ। লুকা বলেন, ‘আমি সবসময় বলেছি, আমি আমার বাবাকে শ্রদ্ধা করি এবং এই পদবি বহন করতে গর্ববোধ করি। কিন্তু ফুটবলে আমি চাই মানুষ আমাকে লুকা হিসেবে চিনুক, বাবার সঙ্গে তুলনা করে নয়।’
সকালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে লুকা ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। সেখান থেকেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র উত্তরাধিকার রচনার গল্প শুরু করতে চান।
আরও পড়ুন: রাজধানীতে সাবেক দুই মেয়রসহ তিন আ.লীগ নেতা গ্রেপ্তার
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন