০৭:০৯ এম
আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী মাটি ও ছনের ঘর হারিয়ে যাচ্ছে। জায়গা দখল করছে ইট-পাথরের দালান ও টিন। শীত-গ্রীষ্ম সব ঋতুতেই মাটির ও ছনের ঘর বেশ আরামদায়ক। এই ঘরগুলো গ্রাম বাংলার চির ঐতিহ্যের নিদর্শন এবং ছায়া ঘেরা শান্তির নীড় ছিল। এর আগের সময়ে এই ঘরগুলো গ্রামের মানুষের কাছে ‘গরিবের এসি বাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল। তবে কালের বিবর্তনে এই ঐতিহ্যের মাটির ঘর হারিয়ে যেতে বসেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া মাটির ঘরের জায়গায় এনে দিচ্ছে ইটের বাহারী দালান।
মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা, প্রযুক্তির উন্নয়ন, রুচিবোধের পরিবর্তন এবং পারিবারিক নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে নিজেদের সুরক্ষার কারণে আজকাল আর কেউ মাটি ও ছনের ঘরে থাকতে চান না। সচ্ছলরা ঝুঁকে পড়েছেন পাকা দালানের দিকে। তবুও মানুষ যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাকা দালান কোঠা তৈরি করছেন। এই কারণেই আধুনিকতার ছোঁয়া এবং সময়ের পরিবর্তনে গ্রাম বাংলা থেকে ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈরি ঘর আজ বিলুপ্তির পথে।
একদিন হয়তো সেই মাটিও ছনের ঘরের স্থান হবে ইতিহাসে অথবা যাদুঘরে। মানুষের আর্থিক সামর্থ্য এবং রুচির পরিবর্তনের ফলে গ্রাম থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মাটি ও ছনের ঘর।
আরও পড়ুন: তেলের দাম কমবে কবে: রুশ উপপ্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য
কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন চা বাগানে এখনো কিছু মাটির ঘর দেখা যায়। তবে সেগুলোও বেশিদিন থাকবে না। আধুনিকতার ছোঁয়া পৌঁছে গেছে বাগানগুলোতেও। প্রায় সব বাগানেই দালানকোঠা তৈরি হচ্ছে। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে এখন অনেকে ইটের ঘর তৈরি করছে, ফলে মাটির ঘর ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের ছেলে-মেয়েরা যেন মাটির ঘর দেখতে পারে, তাই অনেকে গ্রামে কিছু ঘর রেখে দিয়েছেন। তবে সেটাও বিরল। বর্তমানে মাটিও ছনের ঘরের সংখ্যা কমতে কমতে প্রায় বিলুপ্তির কাছাকাছি। হয়তো খুব দ্রুতই সেদিন আসবে, যেদিন মাটির ঘরের কথা মানুষের মন থেকে হারিয়ে যাবে। আগামী প্রজন্মের কাছে মাটি ও ছনের ঘর রূপকথার গল্পের মতো মনে হবে।
কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ও আলীনগর চা বাগানের বিভিন্ন টিলায় মাটির ঘর এখনও রয়েছে। চা শ্রমিকরা পরিবার পরিজন নিয়ে নিজস্বভাবে বসবাস করছেন। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন ভালো নয়, তাই আধুনিকতার ছোঁয়া সেখানে লাগেনি। তবে তারা জানান, আগের তুলনায় এখন মাটির ঘর খুব কম রয়েছে। হয়তো সেটাও থাকে না। হয়ে যাবে দালান কোঠা। পরবর্তী প্রজন্ম তাদের কাছে মাটির ঘরের গল্প, কবিতার ছন্দে বা সাহিত্যর পাতায় দেখা ছাড়া কিছুই থাকবে না। নতুন প্রজন্মের কাছে নাটক, সিনেমা ও গল্প কাহিনী রয়ে যাবে।
মাটির ঘরের কারিগর শাহীন, রুস্তম ও কনা মিয়া বলেন, মাটির ঘর তৈরি করতে কারিগরদের তিন থেকে চার মাসের অধিক সময় লাগতো। মজুরি হিসাবে একটি ঘরের জন্য ৩০-৩৫ হাজার টাকা নিতেন। এখন আর কেউ মাটির ঘর নির্মাণ করে না। তাই আমাদেরও আগের মতো কাজ নেই। এখন অন্য কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।
আনু মিয়া বলেন, মাটির ঘর বসবাসের জন্য আরামদায়ক হলেও যুগের বিবর্তনে অধিকাংশ মানুষ মাটির ঘর ভেঙে অধিক নিরাপত্তা ও কম জায়গায় অনেক লোকের বসবাসের জন্য ইটের ঘরকে প্রথম পছন্দের তালিকায় নিয়ে আসছেন। তিনি বলেন, মাটির ঘর শীত গরম উভয় মৌসুমে বেশ আরামদায়ক।
আরও পড়ুন: অরেগনের স্কুলে গুলিতে নিহত ৪, আহত ২; শোকে স্তব্ধ শহর
বেলা নামের একজন জানান, যুগ যুগ ধরে তারা মাটির ঘরে বসবাস করছেন। তাদের তেমন টাকা পয়সা নেই পাকা ঘরে থাকার। আরামের জন্য মাটির ঘরই ভালো। তিনি বলেন, বর্তমানে তাদের বাগানে মাটির ঘরের স্থান দখল করেছে ইট, সিমেন্ট, বালি ও রডের তৈরি পাকা ঘর। মাটির ঘরগুলো বন্যা ও ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হয় বলেই মানুষ ইট সিমেন্টের ঘরবাড়ি নির্মাণে আগ্রহী হচ্ছেন। প্রতি বছর মাটির ঘরে খরচ না করে একবারে বেশি খরচ করলেও পাকা ঘরবাড়িই নির্মাণ করছেন। তবে এখন মাটির ঘরের সংখ্যা কমতে কমতে প্রায় বিলুপ্তির কাছাকাছি। সেই দিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন মাটির ঘরের কথা মানুষের মন থেকে হারিয়ে যাবে। আগামী প্রজন্মের মানুষের কাছে মাটির ঘর রূপকথার গল্পের মতো মনে হবে।
মাটির ঘর কেন কমে যাচ্ছে সে ব্যাপারে জানতে চাইলে কমলগঞ্জের লেখক, গবেষক আহমদ সিরাজ বলেন, মানুষ এখন কর্মমুখী। মানুষের আয়-রোজগার বাড়ার কারণে মানুষ দিন দিন শৌখিন হয়ে উঠছেন। জেলার প্রচুর মানুষ বিভিন্ন দেশে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হয়েছেন। প্রবাসীরা ও সচ্ছল ব্যক্তিরা তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাওয়ায় ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে মাটির ঘরে থাকতে চাইছেন না। এ জন্য মাটির ঘর ভেঙে বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন করে পাকা দালানকোঠা নির্মাণ করছেন। বর্তমানে মাটির ঘরের সংখ্যা কমতে কমতে প্রায় বিলুপ্তির কাছাকাছি। হয়তো সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন মাটির ঘরের কথা মানুষের মন থেকে হারিয়ে যাবে। আগামী প্রজন্মের মানুষের কাছে মাটির ঘর রূপকথার গল্পের মতো মনে হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন