মঙ্গলবার, ২০ই অক্টোবর, ২০২৬ ইং
০৯:৪২ এম
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ইউনাইটেড নেশনস প্লাজায় পেইড পিরিয়ড লিভ বিষয়ক গ্লোবাল সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। মাসিক স্বাস্থ্য, বেতনসহ মাসিককালীন ছুটি এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর সমতা নিয়ে আলোচনা করার জন্য বিভিন্ন দেশের অধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সামাজিক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা এতে অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানটির আয়োজক ছিল RISE। প্রদীপ নায়ক পরিচালিত প্রামাণ্যচিত্র Paid Period Leave এখানে প্রদর্শিত হয়। মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার দূর করা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী বেতনসহ মাসিককালীন ছুটি চালুর গুরুত্ব তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই এই আয়োজনটি করা হয়েছিল।
সামিটে সাংবাদিক মাইনুল ইসলামকে পেইড পিরিয়ড লিভ বা বেতনসহ মাসিককালীন ছুটি সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতে অবদানের জন্য সম্মাননা সনদ প্রদান করা হয়। তিনি চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি ও সংবাদ উপস্থাপক এবং BanglaHour.com-এর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পেইড পিরিয়ড লিভ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অধিকারকর্মী রঞ্জিতা প্রিয়দর্শিনী অনুষ্ঠানে মাসিক স্বাস্থ্যকে নারীর সুস্থতা, মর্যাদা ও কর্মক্ষেত্রে সমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, "বাংলাদেশ সরকার বেতনসহ মাসিককালীন ছুটি চালুর উদ্যোগ নিলে তা নারীর স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন ও কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।"
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন UNESCO Center for Peace-এর উপপরিচালক এমেট ইমানি, Coalition for the UN We Need-এর নির্বাহী পরিচালক অ্যাডাম লুপেল এবং সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের সহযোগী অধ্যাপক আনা কাপলান। আলোচনায় বিশ্বব্যাপী পেইড পিরিয়ড লিভ চালুর প্রয়োজনীয়তা এবং তা বাস্তবায়নের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সামিটের বিশেষ অধিবেশন Advancing Paid Period Leave Through Storytelling and Policy Reform -এ চলচ্চিত্র, সৃজনশীল যোগাযোগ ও আইনি কাঠামোর মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নীতিগত সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এতে অংশগ্রহণ করেন চলচ্চিত্র নির্মাতা সানিয়া পান্ডা ও দামিলোলা আদেয়েরি, অ্যাটর্নি ফারহান আরিয়ান এবং পরিচালক, প্রযোজক ও সংগীতশিল্পী আর্তুরো দে লাস ফুয়েন্তেস। আলোচনায় চলচ্চিত্র ও গল্প বলার মাধ্যমে সামাজিক ভুল ধারণা দূর করার পাশাপাশি নারীদের অধিকার সুরক্ষায় আইন ও কর্মক্ষেত্রের নীতিমালা কার্যকর করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
সম্মাননা গ্রহণের পর মাইনুল ইসলাম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি এই স্বীকৃতিকে নিজের পেশাগত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, "সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মানুষের সামনে তুলে ধরা, জনসচেতনতা তৈরি এবং গঠনমূলক আলোচনা এগিয়ে নিতে সাংবাদিকতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।"
সামিটে বক্তারা মাসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বেতনসহ মাসিককালীন ছুটি বাস্তবায়নের সম্ভাব্য পথ খুঁজে বের করতে সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, নিয়োগকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু স্থানে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের অন্যান্য অংশে আকাশ আংশিক মেঘলা থাকলেও, আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকবে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকাল ৭টা থেকে পরবর্তী ৬ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ সময়ে উত্তর অথবা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬ থেকে ১২ কিলোমিটার হতে পারে। দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে বৃষ্টির উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা না থাকলেও, চট্টগ্রাম বিভাগের দু-এক জায়গায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৬টায় ঢাকায় তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৫৫ শতাংশ। গতকাল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা চট্টগ্রামের আমবাগানে ছিল ৩৫.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে, আজ দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রংপুরের তেঁতুলিয়ায় ১৯.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে কোনো বৃষ্টিপাত ঘটেনি। আজ সন্ধ্যা ৫টা ২৮ মিনিটে সূর্যাস্ত হবে এবং আগামীকাল বুধবার ভোর ৫টা ৫৮ মিনিটে সূর্যোদয় হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ধর্মীয় সম্প্রীতি ধরে রেখেই গড়তে হবে বাংলাদেশ, এমনটি জানিয়েছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী। তিনি উল্লেখ করেছেন, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নভাবে উদযাপনের জন্য এক মাস আগে থেকেই নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রতিমা তৈরি, পরিবহন, মণ্ডপে স্থাপন এবং পূজা উদযাপনের প্রতিটি পর্যায়ে পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী দায়িত্ব পালন করছে।
ডিআইজি বলেন, এবারের পূজায় প্রতিটি মণ্ডপে কমিউনিটি পুলিশকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, যা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে পটিয়া পৌরসভার মুন্সেফ বাজার কালীবাড়ি পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী আরও বলেন, আমি ১১টি জেলা পরিদর্শন করে দেখেছি, প্রতিটি জায়গায় অত্যন্ত সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে পূজাকে নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় সকল নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গোৎসব উদযাপন হতে দেখে আমরা স্বস্তি পাচ্ছি।
তিনি বলেন, এবারের দুর্গাপূজার বিশেষত্ব হলো প্রতিটি পূজামণ্ডপে কমিউনিটি পুলিশকে অন্তর্ভুক্ত করা। বিএনপির নেতারাও পুলিশের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সার্বিক সহযোগিতা করছেন। এ জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই।
ডিআইজি আরো বলেন, দুর্গাপূজা এখন সবার অংশগ্রহণে একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। আবহমান বাংলার ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সব ধর্মের মানুষের একসঙ্গে বসবাসের ঐতিহ্য আমাদের ধরে রাখতে হবে। প্রত্যেকের যেন স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন এবং উৎসব-আচার অনুষ্ঠান উদযাপন করতে পারেন, রাষ্ট্র যেমন সেই পরিবেশকে উৎসাহিত করে, আমরাও তা উৎসাহিত করি। এই সম্প্রীতির ধারা অক্ষুণ্ন রেখে আমরা একটি সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে এগিয়ে যেতে চাই।
পরিদর্শনের সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল ও ডিবি) মোহাম্মদ ইব্রাহিম, পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হক, পটিয়া ট্রাফিক জোনের পুলিশ পরিদর্শক মো. আমীর ফারুক, পটিয়া থানার ওসি (তদন্ত) যুযুৎসু যশ চাকমা, পটিয়া উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মান্না কুমার দেব এবং পটিয়া পৌরসভা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল দে প্রমুখ।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে পশ্চিমা সমর্থিত ‘সরকারি বাহিনীর’ একটি সামরিক প্রশিক্ষণশিবিরে ইরান সমর্থিত হুথি বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ৫৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২০০ জন।
সোমবার, দেশটির শাবওয়া প্রদেশের আল-আলম সামরিক শিবিরে এ হামলা সংঘটিত হয়। সেখানে নতুন নিয়োগ পাওয়া নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ চলছিল।
বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। পশ্চিমা সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, সোমবার প্রশিক্ষণ চলাকালে শিবিরটিতে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান সমর্থিত হুথি বাহিনী। হামলার পর, পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের কর্মকর্তারা এবং চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো প্রথমে ১৮ জন নিহত ও ৩০ জনের বেশি আহত হওয়ার তথ্য দিয়েছিল। পরে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩ জন নিহত ও ২০০ জন আহত।
সংঘাতের তীব্রতা বাড়ছে
ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের মধ্যে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর কিছুটা কমে এসেছিল। তবে চলতি বছর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের আঞ্চলিক প্রভাব নতুন করে সংঘাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
গত মাসে লোহিত সাগরের উপকূলে সরকারি বাহিনীর অনুগত সেনাদের কাছ থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা দখল করে নেয় হুথিরা। এরপর সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আনসার আল্লাহ নামেও পরিচিত হুথি বাহিনীর নামের আরবি অর্থ ‘আল্লাহর সাহায্যকারী’।
হুথিদের অগ্রযাত্রার জবাবে সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট পশ্চিমা সমর্থিত সরকারি বাহিনী পাল্টা অভিযান শুরু করে। পরে তারা ‘ডন অব ইয়েমেন’ নামে একটি অভিযান চালু করে। এর লক্ষ্য হুথিদের দখলে থাকা এলাকা পুনরুদ্ধার করা। এসব এলাকার মধ্যে রাজধানী সানাও রয়েছে। ২০১৪ সালে রাজধানীটি দখল করে নেয় ইরান সমর্থিত হুথি বাহিনী।
এদিকে সৌদি আরবের ওপরও হামলা বাড়িয়েছে হুথিরা। তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনাও রয়েছে।
সোমবার সৌদি কর্তৃপক্ষ রাজধানী রিয়াদের বাসিন্দাদের মোবাইলফোনে সতর্কবার্তা পাঠায়। এতে ‘শত্রুপক্ষের আকাশপথে হামলার হুমকি’ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়।
নতুন নিয়োগ পাওয়া সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি জানান, শাবওয়ায় নিহত ব্যক্তিরা নতুন নিয়োগ পাওয়া সদস্য ছিলেন। এ হামলার জবাবে ‘কঠোর পদক্ষেপ’ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
আল-আলিমি বলেন, ‘নতুন নিয়োগ পাওয়া সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করা থেকে বোঝা যায়, চাপের মুখে পড়লে হুথি মিলিশিয়া সন্ত্রাসী হামলার পথ বেছে নেয়।’
সানা থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদক ইউসুফ মাওরি জানান, হুথিরা এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। তারা দাবি করেছে, সৌদি আরব-সমর্থিত একটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলাটি চালানো হয়েছে। ওই ঘাঁটিতে সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী অবস্থান করছিল।
ইউসুফ মাওরি বলেন, হুথিরা জানিয়েছে, তারা এ ধরনের ঘাঁটিতে হামলা অব্যাহত রাখবে। গোষ্ঠীটির মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, সৌদি আরব-সমর্থিত সামরিক উপস্থিতি রয়েছে—এমন যেকোনো স্থানকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এর আগে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী জানিয়েছিল, তারা তাইজ শহরের দক্ষিণে আল-আকরৌদ, আল-শাকাব ও আল-সারারি এলাকায় হুথিদের সমাবেশ, যানবাহন ও অস্ত্রের ওপর হামলা চালিয়েছে। জ্বালানির সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিতে ভুগছে তাইজ শহর।
এএম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ফ্রান্সজুড়ে সহিংস দাঙ্গার ঘটনা দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে প্রকাশ করছে। সরকারের চাপের মুখে পড়ার পর, কয়েক শ কোটি ডলারের সম্পদহানি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। তরুণদের মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা ও কর্মসংস্থানের সংকট নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক অচলাবস্থা, ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ এবং দুর্বল অর্থনীতির কারণে দেশটি অস্থির পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। আগামী বসন্তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এ সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু সোমবার বলেন, ‘খোলাখুলি বলতে গেলে, আমরা এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি।’ তবে, পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে তাঁর বক্তব্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করা হচ্ছে। সপ্তাহান্তের দাঙ্গায় দেশটির বড় শহরগুলোতে ব্যাপক লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ পুলিশের ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছেন।
প্যারিস, মার্সেই, বোর্দোসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। দুই বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কা সামলে টিকে থাকা লিমোজ শহরের সিটি হলও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবনটির ঘড়ি-টাওয়ারের চূড়া ধসে পড়েছে।
সপ্তাহান্তের সহিংসতায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে শরৎকালীন শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকে স্কুলশিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছিল। জরাজীর্ণ স্কুল, শিক্ষকের ঘাটতি এবং চাকরির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা এসব বিক্ষোভে অংশ নেন। ওই আন্দোলনে ৬ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং শতাধিক স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আগামী সপ্তাহান্তেও নতুন করে বিক্ষোভের কর্মসূচি রয়েছে। নভেম্বরে ধর্মঘটের পরিকল্পনা করছে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো। ফলে, আগামী বসন্তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ফ্রান্সে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। জনমত জরিপে উগ্র ডানপন্থি প্রার্থী মেরিন লো পেন এগিয়ে রয়েছেন।
রাজনৈতিক অচলাবস্থায় বাড়ছে বিভাজন
রোববার টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে সহিংসতার নিন্দা করেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন কোনো পরিকল্পনা তুলে ধরেননি তিনি। বরং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সতর্ক করেন। এরপর তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোতে তিন দিনের সফরে ফ্রান্স ছাড়েন।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নুও বিরোধীদের ওপর দায় চাপিয়েছেন। উগ্র বামপন্থি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশো সরকারের পুলিশি কৌশলের সমালোচনা করে বলেন, সরকারই ‘বিশৃঙ্খলার দরজা খুলে দিয়েছে’। এর জবাবে লেকর্নু বলেন, ‘সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে যারা সহিংসতা চালাচ্ছে, তাদের পক্ষে যুক্তি দেওয়া যায় না। এটি আপনাদের রাজনৈতিক দায়।’
উগ্রডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি দলের প্রার্থী মেরিন লো পেন এ পরিস্থিতিতে অভিবাসন ইস্যু সামনে এনেছেন। তিনি সহিংসতার জন্য ফ্রান্সের দরিদ্র শহরতলি এলাকার অপরাধপ্রবণ তরুণদের দায়ী করেন। এসব এলাকায় দেশের অভিবাসী জনগণের বড় একটি অংশ বসবাস করে।
লো পেন বলেন, ‘আমাদের দেশ সহিংসতা ও অসহায়ত্বের এক চক্রে আটকে পড়েছে।’ তিনি মাখোঁর আমলের বিশৃঙ্খলার মধ্যে কেবল তাঁর কঠোর অবস্থানই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে বলে ইঙ্গিত দেন।
ন্যাশনাল র্যালি দলের সভাপতি জর্ডান বারদেলাও পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি ‘অ্যান্টিফা মিলিশিয়া, উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠী ও ব্ল্যাক ব্লক গোষ্ঠীকে’ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছেন। ব্ল্যাক ব্লক গোষ্ঠীর সদস্যরা বিক্ষোভের সময় পরিচয় গোপন রাখতে সাধারণত একই ধরনের কালো পোশাক ও মুখোশ পরেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের রাজনৈতিক বিভাজন দেশটির সংকটকে আরও গভীর করছে। ২০২৪ সালে আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়েছিলেন মাখোঁ। কিন্তু সেই নির্বাচন উল্টো পার্লামেন্টে অচলাবস্থা তৈরি করে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এ বিভাজন সহজে কাটবে না।
দেশটির রাজনৈতিক মধ্যপন্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর সুযোগ নিচ্ছে ন্যাশনাল র্যালি এবং মেলঁশোর উগ্র বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবোড। জনসাধারণের ক্ষোভকে পুঁজি করে দল দুটি সমর্থন বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, মাখোঁর একের পর এক প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে বাজেট পাস করাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের আধুনিক ফরাসি ইতিহাসের অধ্যাপক রবার্ট জারেটস্কি আটলান্টিক সাময়িকীতে এক নিবন্ধে লিখেছেন, মধ্যপন্থি প্রার্থীদের সংখ্যা বেশি এবং তাঁদের বেশির ভাগেরই সমর্থক তুলনামূলক কম। শেষ পর্যন্ত এতে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে এমন দুই প্রার্থীর একজনের জয়ের পথ তৈরি হতে পারে, যাঁদের ফ্রান্সের গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সরকারি ঋণ ও অর্থনৈতিক পতনের শঙ্কা
বর্তমান সংকট ফ্রান্সের আগে থেকেই বিভক্ত সমাজকে আরও মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সপ্তাহান্তের সহিংসতায় ক্ষোভ ও হতাশার পাশাপাশি দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে একধরনের নেতিবাচক মনোভাবও বাড়ছে।
সম্প্রতি ইপসোস-বিভিএর এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের ৮৫ শতাংশ মনে করেন, ফ্রান্সের অবনতি হচ্ছে। আর ৯৮ শতাংশই দেশটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট।
পরবর্তী সরকার যে দলই গঠন করুক, স্থিতিশীল জোট গঠন করতে পারলেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তাদের হাতে বিকল্প কম থাকবে।
ফ্রান্সের অর্থনীতি কার্যত স্থবির হয়ে আছে। প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক গ্রীষ্মে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে।
পর্যটন এখনো ফ্রান্সের আয়ের অন্যতম বড় উৎস। তবে গত দুই দিনে দেশটির রাস্তায় সহিংসতার যেসব ভিডিও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তা পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করতে পারে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। সুদের হার বাড়ার মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিনিয়োগ প্রায় ১ শতাংশ কমেছে।
তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সরকারি ঋণ নিয়ে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের গবেষকেরা জুলাইয়ে বলেন, ‘ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের সরকারি ঋণের বোঝা অন্যতম বেশি। রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে দেশটির ঋণ আরও বাড়বে বলে আমরা মনে করছি।’
বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, আগামী বছর মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে রেকর্ড ৩৪ হাজার কোটি ইউরো ঋণ নিতে হবে ফ্রান্সকে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় সরকারি ঋণের অনুপাত বেড়ে ১১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এ হার দ্বিগুণ।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগও বেড়েছে। সোমবার ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছায়।
মেলঁশোর একটি প্রস্তাবও বন্ডবাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তিনি ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা দেশটির সরকারি বন্ডের সুদ স্থগিত করা বা সেগুলোর ঋণ বাতিলের পরিকল্পনার কথা বলেছেন।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের মতে, ২০২৭ সালের নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও রাজনৈতিক বিভাজন অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে পরবর্তী সরকার সরকারি অর্থব্যবস্থার সমস্যাগুলো সমাধান না করে বারবার পিছিয়ে দিতে পারে। এতে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ম্যাক্রোঁর প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব
ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বদের একজন জেনারেল শার্ল দ্য গল একবার বলেছিলেন, ‘মহত্ত্ব ছাড়া ফ্রান্স, ফ্রান্স হতে পারে না।’
দেশের আন্তর্জাতিক ভূমিকা ও স্বাধীনতা নিয়ে তার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ছিল।
তবে দীর্ঘ প্রেসিডেন্ট থাকার সময় এক সহযোগীকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যত দিন পারি, মঞ্চের নাটক চালিয়ে যাব। এরপর কী হবে, সে বিষয়ে কোনো ভ্রমে থেকো না। সবকিছু আবার আগের জায়গায় ফিরে যাবে।’
১৯৬৮ সালের দাঙ্গার এক বছর পর পদত্যাগ করেছিলেন দ্য গল। ওই দাঙ্গায় ফ্রান্স কেঁপে উঠেছিল। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের ঘটনার তুলনা টানছেন কিছু বিশ্লেষক।
ম্যাক্রোঁ প্রেসিডেন্ট হওয়ার সময় তাকে ফ্রান্সের অবনতি নিয়ে প্রচলিত হতাশাবাদী ধারণার বিকল্প হিসেবে দেখা হয়েছিল। ফরাসি ভাষায় এ ধারণাকে বলা হয় ‘দেক্লিনিসম’। ২০১৬ সালে প্রকাশিত লারুস অভিধানেও শব্দটি স্থান পেয়েছে।
তখন এক ভাষ্যকার লিখেছিলেন, ম্যাক্রোঁ ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী ও গঠনমূলক বার্তা দেন। তার বক্তব্যে এমন এক ফ্রান্সের ছবি উঠে আসে, যেখানে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু এক দশক পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। বিভিন্ন জনমত জরিপ অনুযায়ী, ম্যাক্রোঁর প্রতি সমর্থন এখন ১৫ থেকে ১৭ শতাংশের মধ্যে। অন্যদিকে সংকটে জর্জরিত রাষ্ট্রের কাছে আরো বেশি প্রত্যাশা করছে সাধারণ মানুষ, যদিও সেই প্রত্যাশা পূরণের সামর্থ্য সরকারের ক্রমেই কমছে। ফ্রান্সের অবনতি নিয়ে হতাশাবাদী ধারণাও জনপরিসরে জোরালোভাবে ফিরে এসেছে।
এএম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ