১১:৪০ পি.এম
শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে গিয়ে উপকূলের দেড় লাখের বেশি মানুষ নানা ভোগান্তির সম্মুখীন হচ্ছেন। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালের মূল ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দেয়াল, ছাদ ও বিমে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও পলেস্তারা খসে পড়েছে এবং বেরিয়ে এসেছে রড। বৃষ্টির সময় ছাদ দিয়ে পানি রোগীদের ওয়ার্ড ও বিভিন্ন কক্ষে ঢুকে পড়ছে।
ঝুঁকির কারণে প্রায় এক বছর আগে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও বিকল্প অবকাঠামো না থাকায় হাসপাতালের চিকিৎসা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সেখানে চলছে।
হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের বিভিন্ন অংশে জরাজীর্ণতার চিত্র স্পষ্ট। ছাদ থেকে পানি পড়ার কারণে কোথাও বালতি বা গামলা রেখে তা সামাল দিতে হচ্ছে। জরুরি বিভাগের একটি অংশের পলেস্তারা খসে পড়ার পরও সেখানে নিয়মিত কার্যক্রম চলছে। প্রতিদিন রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে মুখর থাকা এসব কক্ষে ঝুঁকি নিয়ে সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: জলবায়ু পরিবর্তনে বছরে ৫ লাখের বেশি মৃত্যু, স্বাস্থ্যঝুঁকি বিশ্বজুড়ে
শুধু ভবনের অবস্থা নয়, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালের বিভিন্ন জায়গায় ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়। রোগীদের ওয়ার্ডের টয়লেটগুলো অপরিষ্কার থাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনরা।
হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবলের ঘাটতি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ চারটি ইউনিয়নের স্বাস্থ্যকেন্দ্র মিলিয়ে ৩৯ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ১১ জন। এর মধ্যে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। গাইনি ও শিশু রোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগেও নির্ধারিত চিকিৎসক নেই।
৩০ জন নার্সের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ২২ জন। পাঁচটি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদের বিপরীতে আছেন মাত্র একজন। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মচারী মিলিয়ে মোট ১৭১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত জনবল মাত্র ৮৬ জন।
এদিকে হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেও তার অনেকটাই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। প্রায় আট বছর ধরে অপারেশন থিয়েটার বন্ধ রয়েছে। সার্জারি কনসালটেন্ট না থাকায় সেখানে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় অপারেশনের বিভিন্ন মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যুবদল প্রায় ৫০০ মানুষকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছে
একইভাবে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে এক্স-রে সেবা। সরেজমিনে অপারেশন থিয়েটার ও এক্স-রে কক্ষের দরজায় তালা ঝুলতে দেখা যায়।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অপারেশন থিয়েটার চালু থাকলে সাধারণ কিছু অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি সিজারের মতো জরুরি সেবা স্থানীয় পর্যায়ে দেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু এসব সেবা বন্ধ থাকায় রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিক কিংবা দূরের বাগেরহাট ও খুলনা শহরে যেতে হচ্ছে। এতে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে।
হাসপাতালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট হলো জেনারেটর। প্রায় কোটি টাকা মূল্যের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটরটি জ্বালানি সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে অচল রয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা অভিযোগ করেছেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চিকিৎসা নিতে গিয়ে সবসময় আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। ছাদ ও বিমের ফাটল দেখে অনেকে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। বৃষ্টির সময় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ায় রোগীদের বিছানাও ভিজে যায়। অপরিষ্কার টয়লেট ও দুর্গন্ধের কারণে হাসপাতালের পরিবেশ আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন: স্বাস্থ্যখাতের টেন্ডারে দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ফরিদা বেগম, মায়া বেগম ও সবুজ মিয়াসহ কয়েকজন জানিয়েছেন, চিকিৎসার প্রয়োজনেই হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু ভবনের অবস্থা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। দ্রুত সংস্কার বা নিরাপদ ভবনের ব্যবস্থা না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তারা জানিয়েছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। শয্যা পর্যাপ্ত না হওয়ায় অনেক সময় রোগীদের বারান্দাতেও অবস্থান করতে হয়।
শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রিয় গোপাল বিশ্বাস জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ হাসপাতালের ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। তবে বিকল্প অবকাঠামো না থাকায় বাধ্য হয়ে ওই ভবনেই চিকিৎসাসেবা ও অন্যান্য কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
তিনি জানান, বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে একটি টিনশেড ভবন নির্মাণের প্রস্তাব স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সেটির দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
আরও পড়ুন: স্বাস্থ্যখাতে সহযোগিতার আহ্বান সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের প্রতি জুবাইদা রহমানের
জনবল সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে ডা. প্রিয় গোপাল বিশ্বাস বলেন, হাসপাতাল ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক ও অন্যান্য কর্মীর সংখ্যা অনেক কম। ৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী ভর্তি থাকেন। সীমিত জনবল ও শয্যা দিয়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তার ভাষ্য, হাসপাতালের ভবন ও জনবল দুই সংকটেরই দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে স্থানীয় পর্যায়ে তাদের করার মতো তেমন কিছু থাকে না।
সব মিলিয়ে চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও জনবল, অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার নানা সংকটে শরণখোলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার মান ব্যাহত হচ্ছে। উপকূলের বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য সরকারি এই হাসপাতালটি কার্যকরভাবে চালু রাখতে দ্রুত নিরাপদ ভবন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল এবং বন্ধ থাকা সেবাগুলো পুনরায় চালুর দাবি উঠেছে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে ১০ মাসে ৪০০ মৃত্যু, এক দিনে সর্বোচ্চ ১১ জনের প্রাণহানি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন