১০:২৪ এম
চীনে প্রথমবারের জন্য শিশুদের তুলনায় বয়স্ক মানুষের ভরণপোষণের দায়িত্ব পরিবারগুলোর জন্য বেশি হয়ে উঠেছে। এই তথ্য দেশটির সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
বিবিসি জানাচ্ছে, গত সপ্তাহে প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনে কর্মক্ষম মানুষের তুলনায় নির্ভরশীল বয়স্ক মানুষের অনুপাত বেড়ে ২৩ শতাংশে পৌঁছাবে। অপরদিকে, শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ২২ শতাংশ। অর্থাৎ, কর্মক্ষম মানুষের ওপর নির্ভরশীল বয়স্ক মানুষের অনুপাত এখন শিশুদের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
চীনে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে। বিশেষজ্ঞরা এই পরিসংখ্যানের দিকে নজর রাখছেন, কারণ এটি দেশের অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলবে তা জানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দেশটি এখন বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, যা পরিবারের ব্যয়, অবসরভাতা এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রভাব ফেলতে পারে।
আরও পড়ুন: পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে তালেবানের হামলায় ১ নিহত, ৫ আহত
চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২২ কোটি ৩০ লাখের বেশি। তারা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে, ১৪ বছর বা তার কম বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ২১ কোটি ৩০ লাখ।
বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় চীন বেশ কয়েক বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকারের তরফ থেকে তরুণদের বিয়ে করতে এবং দম্পতিদের বেশি সন্তান নিতে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান প্রকাশের সময় সরকারিভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে, দেশটি এখন এমন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ বয়স্ক।
এর পেছনে অতীতে জন্মহার বেশি থাকা এবং মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ার মতো কারণ রয়েছে। গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়লে অবসরভাতা, স্বাস্থ্যসেবা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ওপর চাপ বাড়তে পারে। তবে বয়স্ক মানুষের চাহিদা ঘিরে নতুন ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগও তৈরি হতে পারে। এই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রকে ‘সিলভার ইকোনমি’ বলা হয়।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত এক গবেষক বলেছেন, জনসংখ্যার এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রবণতা। এটি সাময়িক কোনো ঘটনা নয়। হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক স্টুয়ার্ট গিটেল-বাস্টেন বলেন, জনসংখ্যার এই পরিবর্তনের প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। এর ফলে শিক্ষা ও শিশুদের পেছনে ব্যয়ের তুলনায় অবসরভাতা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে সরকারি ব্যয় বাড়তে পারে।
আরও পড়ুন: দুর্লভ ডাইনোসর ‘জোডি’ ৪৭.৩ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি, বিজ্ঞানীদের অসন্তোষ
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের প্রভাষক মু ঝেং বলেন, জনসংখ্যার এই পরিবর্তন চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি মানুষের ব্যয় করার ক্ষমতাও কমে যেতে পারে। চীনে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার পেছনে দ্রুত নগরায়ণ এবং দেশটির সাবেক এক সন্তান নীতির প্রভাব রয়েছে। ১৯৮০ সাল থেকে ২০১৫ সালের শেষ পর্যন্ত এই নীতি কার্যকর ছিল।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমাতে চীন সরকার এই নীতি চালু করেছিল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই নীতির কারণে প্রায় ৪০ কোটি শিশুর জন্ম ঠেকানো সম্ভব হয়েছিল। তবে এই সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। মু ঝেং বলেন, চীনের জনসংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে এক সন্তান নীতির বড় ভূমিকা রয়েছে। এর ফলে পরিবারগুলোতে বয়স্ক আত্মীয়ের সংখ্যা বাড়লেও তাদের দেখাশোনার জন্য তরুণ মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমে গেছে।
চীন সরকার এক সন্তান নীতির বিধিনিষেধ শিথিল করলেও দম্পতিদের বেশি সন্তান নিতে উৎসাহিত করতে সমস্যায় পড়ছে। দেশটিতে জন্মহার ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। মু ঝেং বলেন, নারী-পুরুষের সামাজিক ভূমিকার পরিবর্তন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষার হার বেড়ে যাওয়ার মতো বিষয়ও জন্মহার কমার পেছনে ভূমিকা রাখছে। চলতি বছরের শুরুতে চীন আগামী পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এতে বয়স্ক মানুষের জন্য আরো বেশি সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ চীনে ৫ কোটি ৩০ লাখের বেশি বয়স্ক মানুষ বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও আর্থিক সহায়তা পাচ্ছিলেন। গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশকের মধ্যে জন্ম নেওয়া অনেক মানুষ এখন বার্ধক্যে পৌঁছাচ্ছেন। আগের প্রজন্মের তুলনায় তাদের অনেকের আয় ও কেনাকাটার ক্ষমতা বেশি। পাশাপাশি, তারা তুলনামূলকভাবে সুস্থ।
আরও পড়ুন: মার্কিন নির্বাচনে নাগরিকত্ব ছাড়াই ভোট দেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশি যুবকের বিরুদ্ধে মামলা
জনসংখ্যায় বয়স্ক মানুষের অনুপাত বোঝার জন্য নির্ভরশীলতার হার ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। তবে এই হিসাবের সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে মনে করেন কিছু বিশেষজ্ঞ। অধ্যাপক গিটেল-বাস্টেন বলেন, এই পরিসংখ্যানের মাধ্যমে বয়স্ক মানুষের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও সমাজে তাদের ভূমিকা যথাযথভাবে তুলে ধরা হয় না। এতে অনেক বয়স্ক মানুষকে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হিসেবে দেখানোর ঝুঁকি থাকে।
তিনি আরো বলেন, এই হিসাবের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় পরিবার, অর্থনীতি ও সরকারি ব্যয়ের ওপর এর প্রভাব আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন