০৭:৩৬ পি.এম
নিজেদের সুরক্ষার জন্য সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো এতদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই নির্ভর করতো। কিন্তু ৫ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ইরান যুদ্ধ সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে এ নির্ভরতা আসলে ফাঁকা বুলি।
বরং অতিরিক্ত যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরতা এবং সংশ্লিষ্টতার কারণেই তারা বারবার ইরানের হামলার শিকার হচ্ছে। ইরান সমর্থিত হুতিদের অন্যতম টার্গেটও সৌদি আরব। তারচেয়ে বড় কথা হলো, হরমুজ প্রণালী প্রায় বন্ধ থাকায় তেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় সৌদি আরবের আয়েও বড় ধাক্কা লেগেছে। ইরান যুদ্ধ আসলে সৌদি আরবের এতদিনের নিশ্চিন্তিকেই দুশ্চিন্তায় পরিণত করেছে।
সৌদি আরবকে বদলে দিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা 'ভিশন ২০৩০'কেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে ইরান যুদ্ধ।
আরও পড়ুন: গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে সরকারের পরিষ্কার ব্যাখ্যা চায় নেজামে ইসলাম পার্টি
অর্থ এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনোটাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না, এটা বুঝে যাওয়ার পর সৌদি আরব নিজেদের সুরক্ষায় বিকল্প ভাবনা শুরু করে। সে ভাবনারই ফল হলো নতুন ইসলামী প্রতিরক্ষা জোট। গত শুক্রবার পবিত্রভূমি মক্কায় সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে গঠিত হয়েছে নতুন এই প্রতিরক্ষা জোট।
ন্যাটো স্টাইলে গঠিত এই জোটটি বলা হচ্ছে 'ইসলামিক ন্যাটো'। নতুন জোটের তিন দেশই মুসলিম বিশ্বের তিনটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী দেশ। সামরিক সক্ষমতায় কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও সৌদি আরবের আছে অঢেল অর্থ। আর ন্যাটো জোটে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই সামরিক সক্ষমতায় তুরস্কের অবস্থান। পাকিস্তান হলো মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তির অধিকারী।
আর্থিক ও সামরিক সক্ষমতা মিলিয়ে নতুন এই জোট মুসলিম বিশ্বে নিরাপত্তা ভাবনায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। পরিবর্তন আসবে বৈশ্বিক ভাবনায়ও। যখন ইসরায়েল পুরো অঞ্চলে তার সামরিক প্রভাব বিস্তার করছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে রিয়াদয়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই এই জোট আঞ্চলিক সম্পর্কেও নতুন মেরুকরণ আনতে পারে।
মক্কা চুক্তির প্রধান অঙ্গীকার হলো- তাদের যেকোনো একটি দেশের ওপর আক্রমণ সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই অঙ্গীকার পাকিস্তান ও তুরস্ককে এমন একটি যুদ্ধের মধ্যে টেনে আনতে পারে, যা তারা এ পর্যন্ত বেশ সতর্কতার সাথে এড়িয়ে চলছিল। তিন দেশের পক্ষ থেকে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক যৌক্তিকতা হলো যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধকে শক্তিশালী করা এবং তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সব দিকের আরও উন্নতি করা। জোটের তিনটি দেশই সুন্নী নেতৃত্বাধীন। তাদের প্রাথমিক মূল লক্ষ্য হচ্ছে যে শিয়া নেতৃত্বাধীন ইরান, তা নিয়ে কারোই কোনো সন্দেহ নেই।
আরও পড়ুন: আসামে ১১০০ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ, ১০ মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় ওলামা অ্যালায়েন্সের নিন্দা
কিন্তু এ জোটের মানেই যে পাকিস্তান ও তুরস্ক ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে, এই বিষয়টি এমনও নয়। বরং পাকিস্তান আর তুরস্ক ইরান যুদ্ধ বন্ধে দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করছে। সৌদি আরবের যুবরাজ সালমান নিজেও হামলা থেকে বিরত থাকতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছেন। পাকিস্তান ও তুরস্ক উভয়ের সাথেই ইরানের সীমান্ত রয়েছে এবং এই সংঘাত যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে তা ঠেকানোর জন্য উভয় দেশেরই জোরালো কারণ রয়েছে। পাকিস্তানকে তার দেশের বড় আকারের শিয়া জনগোষ্ঠী এবং তেহরানের সঙ্গে তার সংবেদনশীল সম্পর্ক সামাল দিতে হবে। অন্যদিকে, তুরস্ক ও ইরান অঞ্চলের অন্যান্য জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদ নিয়ে উভয়েরই সাধারণ উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাৎক্ষণিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া হতেই নতুন এই জোটের আশু লক্ষ্য নয়। নিজেদের সক্ষমতাকে বাড়িয়ে ইরানের দিক থেকে আক্রমণের হুমকি কমিয়ে রাখতেই নতুন এই জোটের যাত্রা।
তুরস্কের একজন কর্মকর্তা সিএনএন-কে জানিয়েছেন, এই জোট কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। পাশাপাশি সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও স্পষ্টভাবে বলেছে যে, এটি কোনো সামরিক অক্ষ বা কোনো উপদলীয় ব্লক তৈরির প্রচেষ্টা নয়। তুরস্কের ওই কর্মকর্তা আরও যোগ করেন, অন্যান্য আঞ্চলিক দেশগুলোও এতে যোগ দিতে পারে, যা ন্যাটো-র মতোই এই জোটে নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলেছে।
এই জোট নিয়ে ইরানের সন্তুষ্ট হওয়ার কোনো কারণ নেই। নিজেদের অসন্তোষ গোপনও করেনি ইরান। ইরানি পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সদস্য ইব্রাহিম রেজায়ি এক্স (সাবেক টুইটার)-এ লিখেছেন, 'সৌদিদের বোঝা উচিত, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে একটি কাগজের চুক্তি তাদের নিরাপত্তা এনে দেবে না। ঠিক যেভাবে আমেরিকানদের ওপর দশকের পর দশক ধরে একতরফা নির্ভরতাও ব্যর্থ হয়েছে।'
মুখে যাই বলুক, নতুন এই জোটের ফলে ইরানের নেতৃত্বের কপালে দুশ্চিন্তার ভাজের সংখ্যা আরো বাড়বে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এখন সৌদি আরবের ওপর হামলার আগে ইরান নিশ্চয়ই নতুন করে ভাববে।
আরও পড়ুন: ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক, উদ্ধারকাজ সম্পন্ন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন