০৪:৩২ পি.এম
২০১৬ সালে কমনওয়েলথ ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার সওগাত নাজবিন খান। বিশ্বের ৫৩ দেশের প্রতিযোগীদের মধ্যে মাত্র চারজন এই আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন, তাদের মধ্যে নাজবিনও ছিলেন।
নাজবিনের পুরস্কার প্রাপ্তির পেছনে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, তিনি তারাকান্দার প্রত্যন্ত এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এইচ এ (হার্ভার্ড এক্সেস) ডিজিটাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামক প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি হতদরিদ্র শিশুদের বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেন।
সওগাত নাজবিনের বাড়ি তারাকান্দা উপজেলার গোয়ালকান্দি গ্রামে অবস্থিত। তিনি ওই গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব মোখলেছুর রহমান খানের কন্যা।
আরও পড়ুন: ঢাবিতে ২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি আবেদন ১১ নভেম্বর শুরু
সোমবার সরেজমিনে গোয়ালকান্দি গ্রামে গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নাজবিন ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় বসবাস করতেন। ফলে ওই এলাকার মানুষ তাকে কখনো দেখেনি এবং তার নামও কখনো শোনেনি।
এইচ এ ডিজিটাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে স্থানীয়রা জানান, সবাই জানতেন যে মোখলেছুর রহমান খান নামের একজন অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন। সেখানে শিক্ষার্থীদের বেতন তখনকার সময় তারাকান্দা উপজেলার সাধারণ প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অন্তত ১০ গুণ বেশি ছিল। সাধারণত তারাকান্দা ও আশপাশের বিত্তবান পরিবারের সন্তানরা স্কুলটিতে পড়াশোনা করত।
নাজবিন কমনওয়েলথ যুব পুরস্কার পাওয়ার পর অভিযোগ ওঠে যে, তিনি বাবার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের প্রতিষ্ঠা হিসেবে দেখিয়ে পুরস্কার লাভ করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে বাবার প্রতিষ্ঠানের মানবসেবার উদ্দেশ্যে নাম ও প্রতিষ্ঠার পেছনে কাজ করেছেন।
এদিকে, ১০ বছর পর প্রতিষ্ঠানটি আবারো আলোচনায় এসেছে। কারণ, তারাকান্দার এইচ এ ডিজিটাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২৬ জন শিক্ষার্থী এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে, কিন্তু একজনও পাস করতে পারেনি। ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আরও পড়ুন: ৫৫ মাদ্রাসাপ্রধানকে শোকজ, লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে ১০ নভেম্বর
গোয়ালকান্দি গ্রামের অনেকের অভিযোগ, মোখলেছুর রহমান ও তার চাচাতো ভাই খায়রুজ্জামান যৌথভাবে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন, কিন্তু কিছুদিন পর তাদের মধ্যে মালিকানা ও সুনাম নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
এইচ এ ডিজিটাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন সাবেক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি মূলত শিক্ষাসেবার বিনিময়ে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয়েছিল। বিনামূল্যে একজন শিক্ষার্থীকে কখনো পড়ানো হয়নি।
সাবেক ওই শিক্ষক আরও জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রথম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর মাসিক বেতন ছিল দুই হাজার ৫০০ টাকা, যা ওই সময় ময়মনসিংহ জেলা শহরেও ছিল না। অথচ সেখানে বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে হতদরিদ্র শিশুদের আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক পাঠদান করার কথা বলা হয়, যার ফলে মোখলেছুর রহমানের মেয়ে কমনওয়েলথ পুরস্কার লাভ করেন।
এ পুরস্কারের অর্থমূল্য বাংলাদেশি টাকায় অন্তত সাড়ে সাত লাখ। পুরস্কার পাওয়ার পর সওগাতকে বিশ্বের ৫০টি দেশে শুভেচ্ছাদূত হিসেবে নিয়োগ করে কমনওয়েলথ, যা তার জন্য আর্থিকভাবে লাভজনক হয়। ওই টাকার ভাগ না পাওয়ায় খায়রুজ্জামান ক্ষিপ্ত হন এবং এ নিয়ে বিরোধ শুরু হয়।
আরও পড়ুন: ৩৭৬ শিক্ষক-কর্মচারী নতুন এমপিওভুক্ত, ১,৫৯৪ জন পেলেন বিএড স্কেল
একপর্যায়ে খায়রুজ্জামান প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা পান এবং সভাপতি ও পরিচালক নিযুক্ত হন। পরে তিনি মোখলেছুর রহমানের কাছে পাঁচ কোটি টাকা পাওনার মামলা করেন। এই দুই চাচাতো ভাইয়ের বিরোধের কারণে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা খারাপ হতে থাকে।
বর্তমানে এইচ এ ডিজিটাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্থায়ী বা অস্থায়ী কোনো ক্যাম্পাস নেই। একেক সময় একেক প্রতিষ্ঠানের অংশ ধার হিসেবে নিয়ে সেখানে পাঠদান করা হয়।
২০২০ সালের ২০ জুন তারাকান্দায় এক সংবাদ সম্মেলনে খায়রুজ্জামান অভিযোগ করেন, স্কুল প্রতিষ্ঠার সময় সওগাত দেশের বাইরে পড়াশোনা করছিলেন। কিন্তু কমনওয়েলথ পুরস্কারের জন্য তাকে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দেখানো হয়, যা ভুয়া।
জানা গেছে, এইচ এ ডিজিটাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় তারাকান্দা উপজেলা সদরের বাসস্ট্যান্ড এলাকার খান কমপ্লেক্স নামের বহুতল ভবনের নিচতলায়। সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে সেখানে গিয়ে ভবনটির নিচতলায় তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা যায়। পরে জানা যায়, তারাকান্দা উপজেলা সদরের কলেজ রোডে বেসরকারি প্রগ্রেসিভ মডেল স্কুলের ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠানটি চলে গেছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষায় ৪১ হাজার ৯০ কোটি টাকার নতুন কর্মসূচি
প্রগ্রেসিভ মডেল স্কুলের প্রধান পরিচালক সোহান জানান, ‘অনেক আগে আমাদের ক্যাম্পাসে তারা (এইচ ডিজিটাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষকরা) পাঠদান করতেন। তবে মাত্র ১৫ দিন পর থেকে তারা আর আমাদের ক্যাম্পাসে আসেননি।’
অনেক অনুসন্ধান করেও এইচ এ ডিজিটাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের কার্যক্রম বর্তমানে কোথায় চলছে, তা জানা যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ও সভাপতি খায়রুজ্জামানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা ধরেননি।
তারাকান্দা উপজেলা সদরের কয়েকজন বাসিন্দা ও এইচ এ ডিজিটাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাধিক শিক্ষক জানান, খায়রুজ্জামান বর্তমানে ঋণগ্রস্ত। এ কারণে তিনি কারোর ফোন ধরেন না এবং অনেকটা আত্মগোপনে রয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা মোখলেছুর রহমান খান বলেন, খায়রুজ্জামান প্রতারণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি তার কাছ থেকে নিজের নামে করে নিয়েছেন। ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের তখনকার কর্মকর্তারা তার এ প্রতারণার সহযোগী ছিলেন। মেয়ের কমনওয়েলথ পুরস্কার পাওয়ার বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
আরও পড়ুন: একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন ১২ নভেম্বর শুরু
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন