০৫:৩৩ পি.এম
রাজনৈতিক সদিচ্ছা, গণমুখী এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা, কার্যকর সিটি গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে সবার জন্য একটি বাসযোগ্য, মানবিক এবং নিরাপদ ঢাকা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত সিপিবি ঢাকা মহানগর উত্তর আয়োজিত ‘সবার জন্য বাসযোগ্য, মানবিক ও নিরাপদ ঢাকা চাই’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সিপিবি নেতারা উদ্বিগ্ন হয়ে বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, বিভিন্ন সেবা সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা, দখল, দূষণ, যানজট এবং বৈষম্যের কারণে ঢাকা ক্রমে বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় মানুষের জীবনযাত্রা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, গণপরিবহন, আবাসন এবং নাগরিক অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আরও পড়ুন: বিএনপি দিল্লির মাধ্যমে আ.লীগের সঙ্গে আঁতাত করছে: মিয়া গোলাম পরওয়ার
সেমিনারে সিপিবি ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি হাসান হাফিজুর রহমান সোহেলের সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাধারণ সম্পাদক লূনা নূর। বক্তৃতা দেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ ক্বাফী রতন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সোহরাব হাসান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফৌজিয়া ফারজানা, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সহসভাপতি শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত নেভি কমোডর বিপন কুমার সাহা, ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজ এবং সিপিবির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সাজেদুল হক রুবেল।
বক্তারা বলেন, ঢাকা শুধু প্রশাসনিক এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্রই নয়, এটি কোটি মানুষের আবাসস্থল। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ন, যানজট, বায়ু এবং শব্দদূষণ, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট এবং খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান কমে যাওয়ায় নগরবাসীর জীবন ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন দুর্যোগের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।
তারা আরও বলেন, নাগরিক সুবিধা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। নগর ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বক্তারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিনের শাসনতান্ত্রিক ব্যর্থতা, রাজনৈতিক দুর্নীতি, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঢাকা তার বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলছে। রাজউক, ওয়াসা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন, পুলিশ এবং দুই সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থা নগরের সেবা এবং অবকাঠামো নিয়ে কাজ করলেও তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নেই। এই কারণে একই সড়ক বারবার খোঁড়াখুঁড়ি, অর্থের অপচয় ও নাগরিক ভোগান্তি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শক্তিশালী এবং সমন্বিত সিটি গভর্ন্যান্স ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে নগর পরিচালনার দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: জামায়াত মানুষকে যে পথ দেখাতে চায়, সেটা দাজ্জালের জান্নাত: রাশেদ খাঁন
ঢাকার বৈষম্যপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে বক্তারা জানান, একদিকে গুলশান-বনানী-বারিধারার মতো অভিজাত এলাকায় আধুনিক নাগরিক সুবিধা রয়েছে, অন্যদিকে বস্তি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সুপেয় পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ আবাসনের মৌলিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। একই শহরের মানুষের জীবনযাত্রায় এমন বৈষম্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নগর উন্নয়ন সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সমান ও ন্যায়ভিত্তিক হতে হবে।
নদী, খাল এবং জলাশয় রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বক্তারা বলেন, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ এবং বালুসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলো বর্তমানে দূষণের শিকার। দখল এবং ভরাটের ফলে খাল-জলাশয় সংকুচিত হয়ে পড়েছে, যার কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সংঘটিত হচ্ছে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে নদী, খাল, জলাশয়, মাঠ এবং উন্মুক্ত স্থান উদ্ধার এবং সংরক্ষণের দাবি জানান তারা।
গণপরিবহন বিষয়ে বক্তারা বলেন, সিন্ডিকেট, অনিয়ম এবং নৈরাজ্যের কারণে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফিটনেসবিহীন বাস, অতিরিক্ত ভাড়া, যাত্রী হয়রানি এবং বেপরোয়া প্রতিযোগিতার কারণে যানজট এবং দুর্ঘটনা বাড়ছে। গণপরিবহনকে সিন্ডিকেটমুক্ত, নিরাপদ এবং সুশৃঙ্খল হিসেবে গড়ে তুলতে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানান তারা।
বায়ু এবং শব্দদূষণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বক্তারা। তাদের মতে, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা, অতিরিক্ত হর্ণ এবং উন্মুক্ত বর্জ্যের কারণে নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। তারা পরিবেশদূষণ বন্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নগর বনায়ন, জলাশয় সংরক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার কথা বলেন।
আরও পড়ুন: মহেশপুর সীমান্তে ১২ বাংলাদেশি আটক, ৪৬৬ প্যাকেট কীটনাশক উদ্ধার
এ ছাড়া, সাশ্রয়ী আবাসন, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ, কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা এবং পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ মৌলিক নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে সেমিনারের বক্তাদের পক্ষ থেকে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন