০৮:৩৩ পি.এম
যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৭টি অঙ্গরাজ্যের পানি সরবরাহব্যবস্থায় সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রাথমিকভাবে, এই হামলার জন্য ইরানের হ্যাকারদের সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে দায়ী করেনি। এ হামলাটি পানি সরবরাহব্যবস্থায় কোনো বিঘ্ন ঘটায়নি, যদিও এ হামলা বিশুদ্ধ পানির মতো জরুরি সেবার ব্যাপারে মানুষের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।
জুলাইয়ের শেষের দিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্য প্রথম তাদের পৌর পানি সরবরাহব্যবস্থায় একটি সমন্বিত সাইবার হামলার শিকার হয়েছে বলে জানায়। এর কয়েক দিন পর, ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-এফবিআই অন্তত সাতটি অঙ্গরাজ্যের পানি ও বর্জ্যপানি শোধনব্যবস্থায় সাইবার সন্ত্রাসীরা অনুপ্রবেশ করেছে বলে সতর্কবার্তা দেয়। এরপর থেকে জর্জিয়া, নিউ জার্সি এবং সাউথ ডাকোটাসহ যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্য এই ধরনের হামলার কথা জানিয়েছে, তবে এই রাজ্যগুলো এফবিআইয়ের তালিকায় থাকা সেই সাতটি অঙ্গরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ১ লাখ ৫২ হাজার সরকারি সুপেয় পানি সরবরাহব্যবস্থা এবং ১৬ হাজারেরও বেশি বর্জ্যপানি শোধনকেন্দ্র রয়েছে। বেশির ভাগ পৌরসভা লেক, জলাশয়, নদী বা ভূগর্ভ থেকে পানি সংগ্রহ করে এবং বৈদ্যুতিক পাম্পের সাহায্যে পাইপের মাধ্যমে পানিকে শোধনকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে পানি ফিল্টার ও জীবাণুমুক্ত করা হয়। পরিশোধিত এই পানি এরপর বড় স্টোরেজ ট্যাংকে পাঠানো হয়, যা পরবর্তীতে বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং পার্ক ও স্কুলের মতো সরকারি জনসেবামূলক এলাকায় পানি সরবরাহ করে।
আরও পড়ুন: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ১৪ পয়েন্টে নাশকতার পরিকল্পনা আ.লীগের
জানা গেছে, পানি শোধনাগার এবং অন্যান্য শিল্পকারখানার সমস্ত শিল্প সরঞ্জামকে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সাহায্যকারী ডিভাইসগুলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকে। হ্যাকাররা ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংযুক্ত নেটওয়ার্ককেই টার্গেট করছে। এই নেটওয়ার্ক পানির চাপ, রাসায়নিকের মাত্রা এবং পানি সরবরাহব্যবস্থার অন্যান্য বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করে, যাতে পানিটি নিরাপদ থাকে। বিভিন্ন পৌরসভার কর্মীরা তারযুক্ত নেটওয়ার্ক, রেডিও বা সেলুলার লিঙ্ক অথবা ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে এই কন্ট্রোলারগুলো পরিচালনার জন্য ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করেন।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিস-এর গ্লোবাল সিকিউরিটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উইলিয়াম আকোতো এক নিবন্ধে এই সাইবার হামলার ভেতরের কৌশল ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, আক্রমণকারীরা ইন্টারনেটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত লক্ষ্যবস্তুগুলোর খোঁজে কন্ট্রোলার, ড্যাশবোর্ড এবং রিমোট অ্যাক্সেস সেবা প্রদানকারী বাইরের কোম্পানিগুলোর ইন্টারনেট অ্যাড্রেসগুলো স্ক্যান করে। এরপরে অপরাধীরা লগ-ইন করার জন্য কোনো ডিফল্ট বা চুরি করা পাসওয়ার্ড, সিস্টেমে ত্রুটি, অথবা ত্রুটিপূর্ণ রিমোট অ্যাক্সেস সেবা খুঁজে বেড়ায়। একবার প্রবেশাধিকার পেয়ে গেলে তারা পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে, নতুন কমান্ড জারি করে বা কন্ট্রোলারের সফটওয়্যার পরিবর্তন করার চেষ্টা করে।
সিবিএস নিউজের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন কর্মকর্তারা খতিয়ে দেখছেন যে এই সাইবার হামলাগুলোর সঙ্গে ইরানি হ্যাকারদের কোনো যোগসূত্র আছে কি না। তবে তারা একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, আরও প্রযুক্তিগত প্রমাণ সংগ্রহের পর এই মূল্যায়ন বদলেও যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে ইরানকে সন্দেহ করার কারণ হলো, অতীতে তারা ইসরায়েলের পানি সরবরাহব্যবস্থার ওপরও একই রকম হামলা চালিয়েছিল। তবে গত সপ্তাহে একটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে ট্রাম্প মিনেসোটা কর্তৃপক্ষকেই এই হ্যাকিংয়ের জন্য দায়ী করেন। তিনি বরং এতে ইরানের জড়িত থাকার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। বৈঠকে ট্রাম্প বলেছেন, 'তারা (মিনেসোটা কর্তৃপক্ষ) বলতে পছন্দ করে, “ওহ, এটা ইরান।” ইরানের ভাগ্য এতটাও ভালো নয়। মিনেসোটা নিয়ে মাথা ঘামানোর চেয়ে ইরানের আরও বড় বড় সমস্যা রয়েছে।' তবে তদন্তকারীরা এটিও খতিয়ে দেখছেন, কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে অন্য কোনো পক্ষ ইরানের কৌশলগুলো নকল বা অনুকরণ করার চেষ্টা করেছে কি না।
তবে এই হামলায় পানি সরবরাহব্যবস্থার কোনো ক্ষতি হয়েছে বা খাওয়ার পানি অনিরাপদ হয়ে পড়েছে, এমন তার কোনো প্রমাণ মেলেনি। হামলার কারণে কিছু নেটওয়ার্ক ম্যানুয়ালি পরিচালনা করতে হয়েছে এবং সতর্কতাস্বরূপ পানি ফুটিয়ে খাওয়ার নির্দেশনা জারি করতে হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সাইবার হামলার সবচেয়ে বড় হুমকি পানি সরবরাহের ওপর নয়, বরং এটি তাদের পানির নিরাপত্তার প্রতি জনগণের আস্থার ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে ভাবতে হবে।
আরও পড়ুন: হুথিদের সউদী আরবের তেলক্ষেত্র, রিয়াদ বিমানবন্দর ও সেনাক্যাম্পে হামলার দাবি
হোয়াইট হাউসের সাবেক ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি ন্যাশনাল সাইবার ডিরেক্টর জেক ব্রাউন বিবিসি-কে বলেছেন, এমন একটা সময়ে তারা আমাদের মৌলিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের প্রতি আমাদের আস্থায় আক্রমণ করছে, যখন আপনারা জানেন যে, যুদ্ধ নিয়ে পুরো দেশ গভীরভাবে বিভক্ত।
এদিকে, উইলিয়াম আকোতো পানি সরবরাহব্যবস্থা নিরাপদ রাখতে তাৎক্ষণিকভাবে কন্ট্রোলার এবং হিউম্যান ড্যাশবোর্ডগুলোকে ইন্টারনেট সংযোগ থেকে সরাসরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন