০৬:০২ পি.এম
গাইবান্ধায় সংবাদ সংগ্রহের জন্য যাইনি এমন সময় সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করার একটি ঘটনা তদন্ত করেছেন রংপুরের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুল ইসলাম। তিনি রোববার (২১ জুন) দুপুরে সার্কিট হাউজে সময় সংবাদের প্রতিবেদক, হেদায়েতুল ইসলাম বাবু এবং যমুনা টিভির প্রতিবেদক জিল্লুর রহমান মন্ডল পলাশসহ স্থানীয় সাংবাদিকদের বক্তব্য শোনেন এবং সেগুলো রেকর্ড করেন।
গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সাদুল্লাপুরের ধাপেরহাটে অর্পিত সম্পত্তি জনৈক ব্যক্তি মালিকানা করে ৩ কোটি টাকার আত্মসাতের বিষয়ে ভূমি অফিস থেকে ভিন্ন ভিন্ন দুটি প্রতিবেদনের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গেলে সাদুল্লাপুরের এসিল্যান্ড, জসিম উদ্দিন সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয়ে ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেন এবং খুবই উগ্র, অপেশাদার আচরণ করেন। এ নিয়ে সময় সংবাদে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওই বিষয়টির তদন্তের নির্দেশ দেন রংপুর বিভাগের কমিশনার।
তদন্তকারী কর্মকর্তা রংপুর বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, আজই তদন্ত শেষ করে তিনি বিভাগীয় কমিশনারকে বিস্তারিত জানাবেন। পাশাপাশি তিনি পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
আরও পড়ুন: জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদ্যাপন
এর আগে, শুক্রবার (১৯ জুন) সময় সংবাদে প্রতিবেদন প্রচারের পর গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে অর্পিত সম্পত্তি (সরকারি জমি) ব্যক্তিমালিকানাধীন দেখিয়ে অধিগ্রহণ এবং এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে সাংবাদিকদের হেনস্তার ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার।
শুক্রবার (১৯ জুন) সময় সংবাদ এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রচার করে যেখানে হাসানপাড়া মৌজার অর্পিত সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানাধীন হিসেবে উপস্থাপন করে প্রায় তিন কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ গ্রহণের অভিযোগ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়।
ঢাকা রংপুর মহাসড়ক ছয়লেনে উন্নীত করণ প্রকল্পের জন্য হাসানপাড়া মৌজায় ১/১ এবং ২৩৭ বিআরএস খতিয়ানের সাবেক ৭৬ ও ১১২ হাল দাগে সাড়ে ছয় শতক জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর জমি ও স্থাপনা বাবদ ২ কোটি ৮০ লাখ ৫৯ হাজার ৯৩২ টাকা ৭০ পয়সা জেলা প্রশাসকের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা থেকে ছাড় করা হয় সাবেক উপজেলা পীরগঞ্জের রামনাথপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর এবং তার পরিবার সদস্যদের জন্য। অভিযোগ রয়েছে যে, অধিগ্রহণকৃত জমি অর্পিত সম্পত্তি। ফারুকী নামের একজন একই ইউনিয়নের বাসিন্দা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল.এ শাখায় আপত্তি দেন। তিনি দাবি করেন যে, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে তার প্রতিপক্ষ জাহাঙ্গীর ও তার পরিবারের সদস্যরা ক্ষতিপূরণের টাকা তুলেছেন। তিনি প্রশ্ন করেন, "অর্পিত সম্পত্তি হলে কীভাবে এই টাকা পরিশোধ করা হলো?"
২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর সাদুল্লাপুরের এসিল্যান্ড (সহকারী কমিশনার, ভূমি) একটি প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছেন যে, এই সম্পত্তিতে সরকারের কোনো স্বার্থ জড়িত নেই। আবার ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল ধাপেরহাট ইউনিয়ন ভূমি অফিসের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয় এই সম্পত্তিতে সরকারি স্বার্থ জড়িত আছে। কোন একটি প্রতিবেদন সঠিক, তার উত্তর খুঁজতে ২ জুন সময় সংবাদ সাদুল্লাপুরের এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিনের বক্তব্য জানতে চেয়েছিল। ওই দিনও প্রতিবেদকের সাথে অশোভন আচরণ করেন তিনি।
আরও পড়ুন: ঢাকায় গিয়ে ৫ দিন ধরে নিখোঁজ শিশু ইমাম, সন্ধান চেয়ে পরিবারের আকুতি
বিষয়টি জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লাকে তাৎক্ষণিক মোবাইল ফোনে অবগত করা হলে তিনি খাস জমিসংক্রান্ত কমিটির সভাপতি ও সাদুল্লাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বক্তব্য নেয়ার পরামর্শ দেন। সেদিনই খাস জমিসংক্রান্ত কমিটির সভাপতি ও সাদুল্লাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনিও কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। অর্পিত ও ব্যক্তি মালিকানা সংক্রান্ত ভূমি অফিসের একই জমি নিয়ে ভিন্ন দুটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করলে এনিয়ে তিনিও কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হননি। তিনি বলেও দিয়েছেন যে, তিনি বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানাতে বলেন। কেন তিনি কথা বলতে পারবেন না প্রশ্ন করলে তিনি এসিল্যান্ডের মতো আচরণের পুনরাবৃত্তির হুমকি দেন এবং আসতে পারেন বলে তার কথা শেষ করেন।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) আবারও সাংবাদিকদের বক্তব্য জানতে এসিল্যান্ডের অফিসে যায় সময় সংবাদের প্রতিবেদক হেদায়েতুল ইসলাম বাবু এবং যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদক জিল্লুর রহমান মন্ডল পলাশ।
সাংবাদিকদের দেখতে পেয়ে এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিন মোবাইল জমা রাখার নির্দেশ দেন। এরপর প্রশ্ন করতেই তিনি চেয়ার থেকে উঠে আঙুল তুলে ধমকাতে থাকেন। আবার প্রশ্ন করলে তেড়ে এসে বলেন, "এটা কি ফাজলামোর জায়গা?" বলেই ক্যামেরা কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেন তিনি। ক্যামেরায় কেন হাত দিচ্ছেন, জানতে চাইলে তিনি আবারও ধমক দিয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকেন, "এটা কি রেকর্ডের জায়গা?" এবং যান চলে যান বলে ধমকাতে ধমকাতে গাড়িতে উঠে অফিস ত্যাগ করেন। ঘটনা গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের ভূমি অফিসে ঘটে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সময় সংবাদের প্রতিবেদক হেদায়েতুল ইসলাম বাবু এবং যমুনা টিভির প্রতিবেদক জিল্লুর রহমান মন্ডল পলাশ সংবাদ সংগ্রহের জন্য গেলে সাদুল্লাপুরের এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিন তাদের হেনস্তা, লাঞ্ছিত ও অশোভন আচরণ করেন। প্রশ্নের সদুত্তর না দিয়ে তিনি সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করেন এবং ক্যামেরা কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেন।
আরও পড়ুন: কোম্পানীগঞ্জে মাটিবাহী ট্রাকের চাপায় মাদরাসা ছাত্রের মৃত্যু
প্রতিবেদনটি প্রচারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। অর্পিত সম্পত্তি অধিগ্রহণের অভিযোগ এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে অসদাচরণের ঘটনায় গণমাধ্যমকর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন