০৫:১৮ পি.এম
আফ্রিকার দেশ সুদান, যা তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধে ভুগছে, তা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে যাঁরা প্রাণ হারিয়েছে, তাদের সংখ্যা দেড় লাখ থেকে ৪ লাখ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, আর অন্তত ৪৫ লাখ মানুষ দেশের বাইরে প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সুদানের ৩ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন, এবং প্রায় ২ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অর্থনীতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শিক্ষা এবং চিকিৎসাসহ সব স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ভেঙে পড়েছে।
আরও পড়ুন: জানাজা থেকে ফেরার পথে গ্রেপ্তার ইউপি চেয়ারম্যান, অসন্তোষ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
বর্তমানে সুদান এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের সম্মুখীন। দুর্ভিক্ষের পাশাপাশি কলেরাসহ ছড়িয়ে পড়া নানা মহামারি সংকটকে আরো জটিল করে তুলেছে।
এই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের নেতৃত্বে সুদানের নিয়মিত সেনাবাহিনী সুদান সশস্ত্র বাহিনী-এসএএফ রয়েছে। তার প্রতিপক্ষ হল আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস-আরএসএফ, যার নেতৃত্বে আছেন হেমেদতি নামে পরিচিত জেনারেল মোহামেদ হামদান দাগালো।
একসময় এই দুই জেনারেল ছিলেন সহযোদ্ধা। ২০১৯ সালে গণ-অভ্যুত্থান এবং সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন প্রায় ৩০ বছরের স্বৈরশাসক ওমর আল-বশির। সে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন এসএএফ প্রধান জেনারেল বুরহান এবং আরএসএফ প্রধান জেনারেল হেমেদতি।
বশিরের পতনের পর বুরহান দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হন এবং হেমেদতি হন তার ডেপুটি। ২০২১ সালে তারা দুজনে মিলে সামরিক শাসন জারি করেন।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হলো যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ‘থিওডোর রুজভেল্ট’
এক লাখ সদস্যের আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় নিয়ে দ্বিমত দেখা দেয়। বুরহান চাচ্ছিলেন ২ বছরের মধ্যে একত্রীকরণ সেরে ফেলতে, তবে হেমেদতির চাওয়া ছিল ১০ বছর।
একত্রীকরণের পর কে বাহিনীর নেতৃত্ব দেবেন তা নিয়েও দ্বন্দ্ব শুরু হয়, কেউ কাউকে ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। উত্তেজনার এক পর্যায়ে, ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সকালে খার্তুমের একটি সামরিক ঘাঁটিতে সংঘর্ষ শুরু হয়, যা দ্রুত রক্তক্ষয়ী দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ সমঝোতার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও এই যুদ্ধ থামাতে পারেনি। বরং যত দিন যাচ্ছে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে নতুন কৌশল নিয়ে মাঠে নামছে দুই পক্ষই।
যুদ্ধ শুরুতে স্থলেই সীমাবদ্ধ ছিল, ক্রমেই তা আকাশেও ছড়িয়ে গেছে। ড্রোনের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার যুদ্ধকে আরো অনিশ্চিত এবং প্রাণঘাতী করে তুলেছে। ড্রোনের ব্যবহার সুদান গৃহযুদ্ধের ছন্দই বদলে দিয়েছে।
আরও পড়ুন: ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ, চাক শুমারের চাপে বৃদ্ধি
আগে বর্ষাকালে যুদ্ধ প্রায়শই মন্থর হয়ে পড়ত। কারণ বন্যায় রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় সৈন্য, ভারী অস্ত্র এবং রসদ পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ত। তবে আবহাওয়ার কারণে স্থলবাহিনী থমকে গেলেও ড্রোনগুলো সচল থাকতে পারে। চলাচলের জন্য ড্রোনকে রাস্তার ওপর নির্ভর করতে হয় না, এগুলো অসুস্থ হয় না এবং কাদার মধ্যেও আটকে যায় না।
ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রকে যেমন প্রসারিত করেছে, তেমনি এটি যুদ্ধকে বেসামরিক জীবনে আরো গভীরে নিয়ে গেছে। বর্তমানে সুদান গৃহযুদ্ধে আর ফ্রন্ট লাইন বলেই কিছু নেই। ঘরবাড়ি, বাজার এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্রমশ ড্রোনের আঘাতের সীমানার মধ্যে চলে আসছে। ফলে গোটা সুদান এক উন্মুক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে।
বর্তমানে বিদেশে তৈরি ড্রোনের সরবরাহ বাড়তে থাকায় জাতিসংঘ সতর্ক করেছে যে, এই সংঘাত আরো একটি নতুন এবং মারাত্মক ধাপে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। শুধুমাত্র ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে ড্রোন হামলায় অন্তত ৮৮০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
নিরাপত্তা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘আফ্রিকা ডিফেন্স ফোরাম-এডিএফ’ জানায়, তুরস্কের সরবরাহ করা ড্রোন এসএএফকে শক্তিশালি করেছে। তুরস্কের বানানো ড্রোন দীর্ঘ সময় উড়তে পারে, বিস্ফোরক বহন করতে পারে এবং খরচও তুলনামূলক কম। তুরস্ক জানিয়েছে যে তারা সুদানের সার্বভৌমত্ব এবং শান্তি প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে।
আরও পড়ুন: মিয়ানমারে পাচারের সময় ৪৯২ বস্তা সারসহ ৮ পাচারকারী আটক
অন্যদিকে, আরএসএফও তাদের ড্রোন কার্যক্রম বৃদ্ধি করেছে। তারা চীনে তৈরি দূরপাল্লার ড্রোন পাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে, যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাত আরএসএফকে ড্রোন সরবরাহের কথা অস্বীকার করেছে।
প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রকাশনা ‘মিলিটারি আফ্রিকা’ জানিয়েছে যে, তুর্কি ড্রোন আরএসএফ-এর পক্ষেও দেখা গেছে, ফলে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্দিষ্ট হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সুদানের আরেক শহরের মত অবরুদ্ধ আল-উবাইদের মানুষের জীবনে ড্রোন এখন এক ভয়াবহ বাস্তবতা। এখানে জীবনযাত্রার সবচেয়ে সাধারণ নিয়মগুলোর মধ্যেও লুকিয়ে থাকে আকস্মিক মৃত্যুর আতঙ্ক।
গত জুনে, ৪২ বছর বয়সী পয়োনিষ্কাশন ট্রাকচালক আহমাদো একটি পানির ট্রাক স্টেশনে কাজ করছিলেন। আকস্মিক ড্রোন হামলায় স্কুল শেষে তার সঙ্গে দেখা করতে আসা তার ৯ বছরের ছেলে এবং দুই সহকর্মী নিহত হন।
আরও পড়ুন: মুসলিমবান্ধব পর্যটনের গন্তব্য হতে চায় মালয়েশিয়ার পাহাং রাজ্য
আহমাদো বলেন, ‘আমার দিনটি অন্য যেকোনো দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। আমাদের মাথার ওপর ড্রোন উড়ছিল, কিন্তু আমি কখনোই ভাবিনি যে আমার সন্তান বা আমি এর লক্ষ্যবস্তু হবো।’
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক ‘আফ্রিকা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’-এর নিরাপত্তা বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক নেট অ্যালেনের মতে, ড্রোন সুদানের যুদ্ধক্ষেত্রকে নতুন রূপ দিয়েছে এবং এটি প্রক্সি যুদ্ধের ভবিষ্যতের একটি রূপরেখা দেখাচ্ছে।
আল-উবাইদ এবং সমগ্র সুদানজুড়ে বাসিন্দারা বলছেন যে মাথার ওপর ড্রোনের আওয়াজ এখন তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আল-উবাইদ শহরে পরিস্থিতির অবনতি বিশেষভাবে তীব্র রূপ ধারণ করেছে। শহরটি গত ১৮ মাস ধরে এসএএফ-এর নিয়ন্ত্রণে অবস্থান সত্ত্বেও এক দুর্বিষহ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা জাতিসংঘ ‘অবরোধের মতো পরিস্থিতি’ বলে উল্লেখ করেছে।
উত্তর কর্দোফানের রাজধানী আল-উবাইদ প্রধান কিছু সড়কের ওপর অবস্থিত, যা খার্তুমের সঙ্গে দারফুর, বৃহত্তর কর্দোফান অঞ্চল এবং সুদানের দক্ষিণাঞ্চলকে যুক্ত করে। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শহরটি দুই পক্ষের জন্য কৌশলগত লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।
আরও পড়ুন: ভৈরবে চাঁদা দাবির সংঘর্ষে আহত ১৫
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক জানিয়েছেন, জুন মাসে তার কার্যালয় শহর এবং এর আশেপাশে ১৫টি ড্রোন হামলা নিশ্চিত করেছে, যাতে অন্তত ৪৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। তিনি সতর্ক করে দেন যে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা সম্ভবত আরও অধিক। ক্রমবর্ধমান ড্রোন হামলা ত্রাণ সহায়তা মোতায়েনেও বাধা সৃষ্টি করছে। এই মাসের শুরুর দিকে, বাস্তুচ্যুত প্রতিবেশীদের জন্য ৫০ টন ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার একটি ট্রাক ড্রোন আঘাত হানে। সংস্থার মতে, চলতি বছরে এটি জাতিসংঘের ত্রাণবাহী ট্রাকে ড্রোন হামলার দ্বিতীয় ঘটনা।
নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের কান্ট্রি ডিরেক্টর শাশ্বত সরাফ জানিয়েছেন, ‘আল-উবাইদের পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের, হাত-পা এবং ঘরবাড়ি হারাচ্ছে। কোনো কিছুই রেহাই পাচ্ছে না এবং যারা এই হামলা থেকে বেঁচে ফিরছে, তারা অনাহারে দিন কাটাচ্ছে, তাদের আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।’
২৭ বছর বয়সী যুবক এল সাদিক এর আগে তিনবার ড্রোন হামলা থেকে বেঁচে গেছেন। কিন্তু গত জুনে চতুর্থ হামলায় তার বাম পা উড়ে গেছে। এল সাদিক বলেন, ‘ড্রোনের হামলা থেকে আপনি লুকিয়ে থাকতে পারবেন না। যখন আমরা শুনি যে আকাশে ড্রোন আছে, তখন আমরা কোনো কংক্রিটের ভবনের নিচে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু এটি হঠাৎ করেই চলে আসে; আমরা জানি না কখন বা কোথায় এটি আঘাত হানবে।’
এল সাদিকের জন্য এখন বাইরে বের হওয়া মানে চরম আতঙ্ক। তিনি বলেন, ‘আপনি যখন বাইরে যান, তখন জানেন না যে আপনি আর ফিরে আসতে পারবেন কিনা। হয়তো আপনি কোথাও বসে আছেন, আর হঠাৎ করেই আপনার পাশে একটি ড্রোন এসে পড়ল। আপনি বেঁচেও থাকতে পারেন, আবার মারাও যেতে পারেন। আপনি কিছুই জানেন না।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন