১০:৫৩ এম
পিরোজপুরের মঠবাড়ীয়া উপজেলায় শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, এমপিওভুক্তি ও আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়ভাবে আলাউদ্দীন নামে পরিচিত এক ব্যক্তি ও তাঁর স্ত্রী নেহারুকে ঘিরে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে জাল সনদ ব্যবহার, ভুয়া প্রত্যয়নপত্রের মাধ্যমে চাকরি গ্রহণ, নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে বিষয়গুলো সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, শিক্ষক নিয়োগের বৈধতা এবং এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। এ নিয়ে স্থানীয় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি ও সনদ নিয়ে প্রশ্ন:
আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ তিন জেলাকে সিলেট বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব সিলেটবাসীর
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মঠবাড়ীয়া উপজেলার সাপলেজা এলাকার বাসিন্দা আলাউদ্দীন তিনবার বিএ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের পর উত্তীর্ণ হন। পরবর্তী সময়ে কম্পিউটার শিক্ষকের একটি সনদ সংগ্রহ করে বেতমোর আশরাফুল উলুম মাদ্রাসায় কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময়ে মাদ্রাসায় বিদ্যুৎ-সংযোগ না থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ বিল তৈরি করে অধ্যক্ষ ও সভাপতির স্বাক্ষর জালের মাধ্যমে মাদ্রাসা বোর্ডে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে কম্পিউটার শাখা চালু ও পরবর্তী সময়ে এমপিওভুক্তির ব্যবস্থা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া এমপিও-সংক্রান্ত বিল পাসের বিষয়কে কেন্দ্র করে মাদ্রাসার অধ্যক্ষের সঙ্গে অসদাচরণ ও মারধরের অভিযোগও রয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি জানাজানি হলে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাঁকে প্রতিষ্ঠান থেকে অব্যাহতি দেয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
পরবর্তী সময়ে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার মানিকখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলে বেতমোর মাদ্রাসার অভিজ্ঞতা ও প্রত্যয়নপত্র ব্যবহার করে আলাউদ্দীন চাকরি গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগও করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, সংশ্লিষ্ট নিয়োগ ও প্রত্যয়নপত্রের কাগজপত্র বিদ্যালয়ে সংরক্ষিত রয়েছে।
আরও পড়ুন: এলপিজি গ্যাসের দাম এক লাফে ২২৩ টাকা বৃদ্ধির তীব্র প্রতিবাদ খেলাফত মজলিসের
ওই বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকাকালে স্থানীয় সংসদ সদস্য রিমনের সহযোগিতা এবং তাঁর এক আত্মীয়ের সমর্থনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও উঠেছে। পরবর্তী সময়ে তাঁকে বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের লিখিত সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
এরপর তিনি মঠবাড়ীয়ার জাফরাখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন বলে জানা গেছে। সেখানেও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তী সময়ে তাঁকে প্রতিষ্ঠান থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে ভান্ডারিয়া উপজেলার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে নতুন করে শিক্ষক পদে যোগদানের চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এ নিয়োগপ্রক্রিয়া ও অর্থ লেনদেনের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্ত্রীর বিরুদ্ধেও জাল সনদে নিয়োগের অভিযোগ:
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে যমুনা উপজেলা ও ভেটুয়া ব্রিজের দাবি নিয়ে মানববন্ধন
অন্যদিকে, আলাউদ্দীনের স্ত্রী নেহারুর বিরুদ্ধেও শিক্ষক নিয়োগে জাল সনদ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, নলীভীম চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এনটিআরসিএ-সংক্রান্ত সনদ ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণের জাল সনদ ব্যবহার করে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ নেওয়া হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক স্বপন বাবুর মাধ্যমে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে এ নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছিল বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
পরবর্তী সময়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্তে তাঁর সনদ জাল হিসেবে শনাক্ত হওয়ার পর বেতন-ভাতা বন্ধ করা হয় বলে অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লিখিত সিদ্ধান্ত পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
এদিকে, বর্তমানে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে পুনরায় তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রায় দুই লাখ টাকার বিনিময়ে বেতন-ভাতা ছাড় করানোর চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটি, শিক্ষা প্রশাসন ও আর্থিক নথিপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্বামীর হাতে স্ত্রী মারুফা আক্তার খুনের অভিযোগ
এ ছাড়া কিছুদিন আগে নলী-তুলাতলা এলাকায় একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে তাঁর বিরোধ ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি:
একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগ, সনদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয় সামনে আসায় স্থানীয় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, শিক্ষক নিয়োগের সময় প্রয়োজনীয় সনদ ও অভিজ্ঞতার কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না? কোনো প্রতিষ্ঠানে সনদ জাল হিসেবে শনাক্ত হওয়ার পরও অন্য প্রতিষ্ঠানে একই ব্যক্তির নিয়োগের সুযোগ তৈরি হলো কীভাবে? এমপিওভুক্তি ও বেতন-ভাতা ছাড়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর যাচাই-বাছাই কতটা কার্যকর ছিল?
আরও পড়ুন: গাইবান্ধায় দাঁড়িয়ে থাকা অটোভ্যানে ট্রাকের ধাক্কায় ২ জন নিহত
তাঁদের মতে, এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র, সনদ, প্রত্যয়নপত্র, তদন্ত প্রতিবেদন ও এমপিও-সংক্রান্ত কাগজপত্র নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য: তালাশ বিডির পক্ষ থেকে আলাউদ্দীন, তাঁর স্ত্রী নেহারু, অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান শিক্ষক, পরিচালনা কমিটির সদস্য এবং জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে তাঁরা কোনো বক্তব্য বা মন্তব্য দিতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক নথিপত্র পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
সার্বিকভাবে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র পরীক্ষা, সনদের বৈধতা নির্ধারণ এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয় অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসন ও তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
আরও পড়ুন: প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নির্বাচনী অধিকার নিয়ে সাংবাদিকদের কর্মশালা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যোগ্যতার যথাযথ যাচাই এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন সম্ভব।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন