০২:১৬ পি.এম
ঢাকা, ১ নভেম্বর, ২০২৬ : সিঙ্গাপুর, যেটি ‘শীতাতপনিয়ন্ত্রিত দেশ’ হিসেবে পরিচিত, বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী শীতলীকরণ ব্যবস্থার বিকল্প খুঁজতে বিভিন্ন প্রযুক্তির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। এই প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে শীতলীকরণ কয়েলযুক্ত বিম, প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহনির্ভর শীতলীকরণ এবং অন্যান্য প্রযুক্তি, যেগুলোর উদ্দেশ্য হলো বিদ্যুৎ-নিবিড় এয়ার কন্ডিশনারের ওপর নির্ভরতা কমানো।
এএফপির তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সিঙ্গাপুরে মাথাপিছু এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের হার সর্বাধিক। দেশটির প্রায় ৯৯ শতাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন আবাসিক ভবনে শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা বিদ্যমান।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের মোট কার্বন নিঃসরণের এক-পঞ্চমাংশের জন্য স্থানীয় ভবন খাত দায়ী। অন্যদিকে, একটি ভবনের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যয় হয় শীতলীকরণে।
আরও পড়ুন: ‘সংবিধানের চেয়ে বড় নন মোদি-শাহ’, দিল্লির সমাবেশে রাহুল গান্ধী
শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর দেশের নির্ভরতার চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে বিখ্যাত অর্চার্ড রোড ধরে হাঁটার সময়। দোকানের দরজা খুললেই ভেতরের শীতল বাতাস রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে, যা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে। সিঙ্গাপুরে সারা বছর দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩১ থেকে ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে, ফলে এই শীতল বাতাস বিশেষ স্বস্তি প্রদান করে।
তবে এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের ফলে তাপের সমস্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। যন্ত্রের কম্প্রেসর থেকে নির্গত গরম বাতাস পরিবেশের তাপমাত্রা বাড়ায়। এ ছাড়া, এসব যন্ত্র চালাতে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ যদি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপন্ন হয়, তবে তা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিকল্প শীতলীকরণ প্রযুক্তি
সিঙ্গাপুরের কিছু ভবনে প্রচলিত এয়ার কন্ডিশনারের বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি হলো ‘অ্যাকটিভ চিলড বিম’ (এসিবি)। এই প্রযুক্তিতে ছিদ্রযুক্ত প্যানেলের মধ্যে শীতলীকরণ কয়েল থাকে, যা ভবনের ছাদে স্থাপন করা হয়।
আরও পড়ুন: লন্ডনের মেয়র সাদিক খান তুরস্ক সফরে গিয়ে আয়া সোফিয়ায় নামাজ পড়তে চান
ভবনের ওপরের তলায় অবস্থিত একটি শীতলীকরণ কেন্দ্রে পানি ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ঠান্ডা করা হয়। এরপর পাম্পের মাধ্যমে সেই পানি কয়েলের মধ্যে প্রবাহিত করা হয়। একই সময়ে বিমের ভেতরে থাকা ছোট ছোট নজলের মাধ্যমে বাতাস প্রবাহিত করা হয়।
এই বায়ুপ্রবাহের ফলে নিম্নচাপের একটি অঞ্চল তৈরি হয়, যা নিচের কক্ষের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ বাতাসকে টেনে নেয়। বাতাসটি শীতলীকরণ কয়েলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় ঠান্ডা হয়ে যায় এবং পরে আবার কক্ষে ছড়িয়ে পড়ে।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত আটতলা ‘পায়া লেবার গ্রিন’ ভবনের অফিসকক্ষের তাপমাত্রা আরামদায়ক ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা হয়। ভবনটিকে সিঙ্গাপুরের অন্যতম পরিবেশবান্ধব স্থাপনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
এএফপির একটি প্রতিনিধি দল ভবনটি পরিদর্শনকালে ছাদের মসৃণ সাদা প্যানেলগুলো থেকে প্রবাহিত শীতল বাতাস অনুভব করে। প্রচলিত এয়ার কন্ডিশনারের মতো একটানা যান্ত্রিক শব্দও এ ব্যবস্থায় শোনা যায় না।
আরও পড়ুন: হরমুজ স্বাভাবিক না হলে ভিন্ন পথে হাঁটার হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের
মানবসম্পদ পেশাজীবী রেনুগা শেখর গত বছরের নভেম্বরে পায়া লেবার গ্রিনের একটি অফিসে কাজ শুরু করেন। ৩০ বছর বয়সী রেনুগা ও তাঁর সহকর্মীরা প্রথমে ছাদের খোলা পাইপ ও প্যানেল দেখে ভেবেছিলেন, জায়গাটির সাজসজ্জা অনেকটা গুদামের মতো।
তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে তেমন কিছু ভাবিনি। কেউ এ নিয়ে মন্তব্যও করেননি।’
কয়েক মাস পর তারা অফিসের অস্বাভাবিক নীরবতা লক্ষ করেন। রক্ষণাবেক্ষণের সময় প্রযুক্তিবিদদের মুখে ‘এসিবি’ শব্দটি শোনার পর তারা জানতে পারেন, অফিসটি অ্যাকটিভ চিলড বিম প্রযুক্তিতে ঠান্ডা রাখা হয়।
রেনুগা বলেন, ‘শীতলীকরণ ব্যবস্থাটি এতটাই স্বাভাবিক ও নির্বিঘ্ন ছিল যে, এটি কতটা ভিন্ন, তা আমরা বুঝতেই পারিনি। তাপমাত্রাও অফিসের সবার জন্য আদর্শ।’
আরও পড়ুন: ইরান দিল দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের হুমকি: ট্রাম্পের হাতে থাকবে না নিয়ন্ত্রণ
ভবনটির নকশাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি আর্কিটেক্টসের তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত এয়ার কন্ডিশনারের তুলনায় এই ব্যবস্থা ৩০ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে।
সিঙ্গাপুরের পশ্চিমাঞ্চলের তুয়াস বন্দরে বন্দর কর্তৃপক্ষের একটি রক্ষণাবেক্ষণ ভবনেও বিকল্প শীতলীকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে রয়েছে ‘প্যাসিভ ডিসপ্লেসমেন্ট কুলিং’ ব্যবস্থা, যা যান্ত্রিক পাখার ওপর নির্ভরতা কমাতে প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহকে কাজে লাগায়।
এ ব্যবস্থায় ছাদের শীতলীকরণ কয়েল বাতাসকে ঠান্ডা করে। ঠান্ডা বাতাস নিচে নেমে আসে এবং উষ্ণ হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই আবার ওপরে উঠে কয়েলের কাছে পৌঁছায়।
এভাবে চলমান বায়ুপ্রবাহের চক্র তৈরি হয়, যা পাখার প্রয়োজন কমিয়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি শব্দদূষণও হ্রাস করে।
আরও পড়ুন: মণিপুরে বিক্ষোভে উত্তাল, ভয়াবহ সংঘাতে নিহত ৫
মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি
শীতলীকরণের আরেকটি বিকল্প হলো ‘রেডিয়েন্ট কুলিং’। এ ব্যবস্থায় ১৪ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ঠান্ডা করা পানি পাইপ বা প্যানেলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। এর ফলে মানুষ ও বিভিন্ন বস্তু থেকে বিকিরিত তাপ শোষিত হয় এবং আশপাশের তাপমাত্রা কমে আসে।
শীতলীকরণের বিকল্প প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ব্যবহারের উদ্যোগে সরকারেরও সমর্থন রয়েছে।
২০২৪ সালে সরকারের এক গবেষণায় বিকল্প শীতলীকরণ প্রযুক্তিকে (এসিটি) গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গবেষণায় বলা হয়, এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে সিঙ্গাপুরে শীতলীকরণ খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার সর্বোচ্চ ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পের ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা খারিজ
দেশটির ভবন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অন্তত ৩৩টি সরকারি ও ১৪টি বেসরকারি ভবনে বিকল্প শীতলীকরণ প্রযুক্তি গ্রহণ করা হয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে নিট-শূন্য কার্বন নিঃসরণ অর্জনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য রয়েছে সিঙ্গাপুরের।
তবে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারে অভ্যস্ত মানুষের কাছে বিকল্প ব্যবস্থাগুলো গ্রহণযোগ্য করে তোলাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বিকল্প শীতলীকরণ প্রযুক্তির সমর্থকেরা স্বীকার করেন, প্রচলিত এয়ার কন্ডিশনারের তুলনায় এসব ব্যবস্থা স্থাপনে বেশি খরচ হয়। তবে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কারণে পরিচালন ব্যয় অনেক কম হওয়ায় দীর্ঘ মেয়াদে প্রাথমিক বিনিয়োগের চেয়ে বেশি সাশ্রয় সম্ভব বলে তাঁরা মনে করেন।
বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় বিকল্প হলো হাইব্রিড কুলিং। এতে এয়ার কন্ডিশনারের তাপমাত্রা ২৫ দশমিক ৫ থেকে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রেখে সঙ্গে পাখা ব্যবহার করা হয়।
ডিপি আর্কিটেক্টসের পরিচালক চুয়া জি জুন বলেন, ‘সবাই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অফিসে কাজ করতে বেশি অভ্যস্ত। তাই হঠাৎ করে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা মেনে নেওয়ার মতো মানসিক পরিবর্তন এখনো সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্যতার পর্যায়ে পৌঁছায়নি।’
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বাড়তে থাকায় শীতলীকরণের চাহিদাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রচলিত এয়ার কন্ডিশনারে বাষ্প-সংকোচন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এতে রেফ্রিজারেন্টের সাহায্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে তাপ সরিয়ে নেওয়া হয়।
বিকল্প শীতলীকরণ প্রযুক্তিও একই মৌলিক নীতির ওপর কাজ করে। তবে এসব প্রযুক্তিতে ঠান্ডা বাতাস সরাতে কম বিদ্যুৎ ব্যয় করা হয় অথবা কিছুটা বেশি তাপমাত্রার সঙ্গে মানুষের মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে যন্ত্র চালানোর সময় কমানো হয়।
নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির শীতলীকরণ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ওয়ান ম্যান পুন বলেন, ‘প্রযুক্তিগুলো সঠিক পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার প্রতিনিধিত্ব করে। ভবিষ্যতে এতে আরও উন্নত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যুক্ত করা উচিত, যার মধ্যে পূর্বাভাসভিত্তিক ব্যবস্থাও থাকবে। কক্ষ অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা হওয়ার আগেই এসব ব্যবস্থা তাপমাত্রা সমন্বয় করতে পারবে।’
তবে তিনি বলেন, ‘বাষ্প-সংকোচন প্রযুক্তির তুলনায় বেশি কার্যক্ষমতা বা দক্ষতা রয়েছে—এমন কোনো বিকল্প শীতলীকরণ পদ্ধতি আমরা এখনো খুঁজে পাইনি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন