০২:১৭ পি.এম
সিলেটের প্রকৃতি, ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি মিলিয়ে গড়ে উঠেছে বৈচিত্র্যময় এক পর্যটনভূমি। পাহাড় বেয়ে নেমে আসা স্বচ্ছ পানির ধারা, পাথরে ছাওয়া নদী, দিগন্তজোড়া চা-বাগান ও বর্ষায় পানিতে ডুবে থাকা রাতারগুলের বনভূমি প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটককে আকর্ষণ করে। এর সঙ্গে রয়েছে সুফি-সাধকদের স্মৃতি, ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপনা ও শত বছরের ইতিহাস।
বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের তালিকায়ও জাফলং, লালাখাল, রাতারগুল, বিছনাকান্দি এবং শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার সিলেটের উল্লেখযোগ্য পর্যটন গন্তব্য হিসেবে স্থান পেয়েছে। সিলেট ভ্রমণ শুধুমাত্র কয়েকটি দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নগরীর ঐতিহাসিক স্থাপনা থেকে সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি জনপদ—প্রতিটি স্থানের রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য।
সিলেটের পরিচয়ের সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা স্থানগুলোর একটি শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার। এটি শুধুমাত্র ধর্মীয় স্থান নয়, বরং সিলেটের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা এখানে আসেন শ্রদ্ধা জানাতে।
আরও পড়ুন: নতুন সাজে সেন্টমার্টিন, পর্যটকদের অপেক্ষা
সিলেট নগরের প্রাণকেন্দ্রে একটি উঁচু টিলার ওপর অবস্থিত এই মাজারকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে নানা ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্য। এ কারণে সিলেটের পর্যটন মানচিত্রেও এর গুরুত্ব বিশেষ। মাজার এলাকায় গেলে ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি পুরোনো সিলেট নগরের ঐতিহ্যেরও ছাপ পাওয়া যায়। দেশি-বিদেশি অনেক পর্যটক সিলেট সফরের শুরুতেই এই ঐতিহাসিক স্থানটি পরিদর্শন করেন।
সিলেটের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য শাহী ঈদগাহ ময়দান। নামের মধ্যেই এর পরিচয়। এটি ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ ময়দান, যেখানে দীর্ঘকাল ধরে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
সিলেট জেলা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মোগল আমলে ফৌজদার ফরহাদ খাঁ এই ঈদগাহ নির্মাণ করেন। কারুকার্যখচিত স্থাপনাটিতে ২২টি সিঁড়ি বেয়ে মূল অংশে উঠতে হয় এবং সেখানে ১৫টি গম্বুজ রয়েছে। আধুনিক ডিজাইনে নির্মিত করা হয়েছে উচ্চ মিনার। তবে শাহী ঈদগাহের গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিকও। ১৭৮২ সালে সহোদর সৈয়দ মোহাম্মদ হাদী ও সৈয়দ মোহাম্মদ মেহেদীর নেতৃত্বে এখানে ইংরেজবিরোধী অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে মহাত্মা গান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিও এ স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
সুরমার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ক্বিন ব্রিজ
আরও পড়ুন: জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন মোঃ নাসির মিয়া
সিলেটে প্রবেশের অন্যতম পরিচিত প্রতীক ক্বিন ব্রিজ। সুরমা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই সেতু যেন পুরোনো সিলেটের সঙ্গে বর্তমান নগরীর একটি ঐতিহাসিক সংযোগ। ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক ইতিহাসের সঙ্গে ক্বিন ব্রিজের নাম জড়িয়ে আছে।
সিলেট জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত শতকের ত্রিশের দশকে (১৯৩৬ সালে নির্মিত) আসাম প্রদেশের গভর্নর মাইকেল ক্বিনের নাম থেকেই সেতুটির নামকরণ করা হয়। দীর্ঘদিনের ব্যবহারে এটি সিলেটের অন্যতম পরিচিত ঐতিহাসিক নিদর্শনে পরিণত হয়েছে।
সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে সুরমা নদীর প্রবাহ দেখা, নদীর দুই তীরের নগরজীবন উপভোগ করা কিংবা পুরোনো সিলেটের স্থাপত্য ও ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়া—সব মিলিয়ে ক্বিন ব্রিজ শহুরে পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জাফলং, সাদাপাথর আর বিছনাকান্দি
আরও পড়ুন: দিরাই উপজেলা ছাত্রদলের সংগ্রামী যুগ্ম আহ্বায়ক ফাহিম হাসান: ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে নেতাকর্মীদের ভালোবাসার প্রতীক
সিলেটের পর্যটনের কথা উঠলে প্রথম সারিতেই আসে জাফলং। খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত পিয়াইন নদীর উৎপত্তিস্থল। এই সীমান্তবর্তী অঞ্চল পর্যটকদের কাছে ‘প্রকৃতি কন্যা’ হিসেবেও পরিচিত। জাফলংয়ের সৌন্দর্যের মূল আকর্ষণ হলো পাহাড়, নদী ও পাথরের সমন্বয়। পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ পানি, নদীর বুকে ছড়িয়ে থাকা পাথর, ওপারে ভারতের পাহাড়, ডাউকি অঞ্চলের পাহাড়ি জলধারা এবং ঝুলন্ত ডাউকি ব্রিজ—সব মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে অনন্য ভূদৃশ্য।
বর্ষায় পাহাড়ি পানির প্রবাহ ও সবুজের আধিক্য জাফলংকে দেয় এক রূপ; শুষ্ক মৌসুমে পাথর ও নদীর স্বচ্ছতা সামনে আসে অন্যভাবে। তাই ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে জাফলংয়ের সৌন্দর্যও বদলে যায়।
কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জে অবস্থিত সাদাপাথর সিলেটের নতুন প্রজন্মের পর্যটন আকর্ষণগুলোর অন্যতম। নাম থেকেই বোঝা যায়, এখানে পাথরই সৌন্দর্যের অন্যতম প্রধান উপাদান।
ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা পাহাড় থেকে নেমে আসা স্রোতধারা, নদী ও সাদা পাথরের বিস্তীর্ণ উপস্থিতি এ অঞ্চলকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। সিলেট জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর সিলেট শহর থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দূরে এবং মূল পর্যটন স্পটে যেতে নৌপথ ব্যবহার করা হয়।
আরও পড়ুন: শ্রীমঙ্গলে চা শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচনের তফসিল, ভোট ২৮ নভেম্বর
পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ পানি, চারপাশের পাহাড় এবং নীল-সবুজ প্রকৃতি সাদাপাথরকে ছবি তোলার পাশাপাশি প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর জন্য জনপ্রিয় করে তুলেছে।
গোয়াইনঘাটের রুস্তমপুর ইউনিয়নের বিছনাকান্দি যেন পাহাড়, নদী, পাথর ও মেঘের একসঙ্গে তৈরি প্রাকৃতিক মঞ্চ। এটি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী এলাকা এবং খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির সঙ্গে বড় বড় পাথর এসে জমে তৈরি করেছে এখানকার বিশেষ ভূদৃশ্য।
বর্ষাকালে পাহাড়ি পানির প্রবাহ বাড়লে বিছনাকান্দির সৌন্দর্যও বহুগুণ বেড়ে যায়। পর্যটন বোর্ডের তথ্যেও বর্ষাকালকে এ অঞ্চলের সৌন্দর্য উপভোগের উপযুক্ত সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিস্তীর্ণ চা-বাগান
আরও পড়ুন: সুনামগঞ্জে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাসহ ৮ জনকে গ্রেপ্তার
সিলেটের সঙ্গে চা-বাগানের সম্পর্ক এতটাই গভীর যে চা-বাগান ছাড়া সিলেটের পর্যটনচিত্র কল্পনা করা কঠিন। শহরের কাছাকাছি মালনীছড়া ও লাক্কাতুরাসহ বিভিন্ন চা-বাগানের সারি সিলেটের ভূদৃশ্যকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়।
মালনীছড়া চা-বাগান সিলেট শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত এবং শহরের কেন্দ্র থেকে তুলনামূলক সহজেই সেখানে যাওয়া যায়। লাক্কাতুরা চা-বাগানও বিমানবন্দর সড়কের পাশে অবস্থিত।
সারি সারি চা-গাছ, ঢেউ খেলানো সবুজ টিলা, শ্রমিকদের চা পাতা সংগ্রহের দৃশ্য এবং বাগানের নিরিবিলি পরিবেশ পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে। একই সঙ্গে চা-বাগান সিলেটের অর্থনীতি, শ্রমজীবী মানুষের জীবন এবং ঔপনিবেশিক সময় থেকে গড়ে ওঠা চা-শিল্পের ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত।
সিলেটের পর্যটনকে শুধু পাহাড়, নদী কিংবা জলপ্রপাত দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে আধ্যাত্মিকতা, শাহী ঈদগাহে ইতিহাস, ক্বিনব্রিজে ঔপনিবেশিক স্মৃতি, জাফলংয়ে পাহাড়-পাথর, লালাখালে নদীর স্বচ্ছতা, সাদাপাথরে পাথরের সৌন্দর্য, বিছনাকান্দিতে পাহাড়ি জলধারা, পাংথুমাইয়ে জলপ্রপাত, রাতারগুলে জলাবন আর চা-বাগানে সবুজ অর্থনীতি। সব মিলিয়ে সিলেটের পর্যটন একটি বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা।
আরও পড়ুন: ৩নং বড়দল দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে আলোচনায় মোঃ নাসির মিয়া
এই বৈচিত্র্যই সিলেটকে অন্য অনেক পর্যটন অঞ্চলের চেয়ে আলাদা করে। একই ভ্রমণে একজন পর্যটক যেমন প্রকৃতির কাছে যেতে পারেন, তেমনি জানতে পারেন ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন ও চা-শিল্পের গল্প। আর তাই সিলেট কেবল একটি গন্তব্য নয়। এ যেন পাহাড়, নদী, পাথর, বন, চা আর মানুষের গল্পে লেখা একটি জীবন্ত ভ্রমণকাব্য।
পানির নিচে সবুজ বন
সিলেটের পর্যটনে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী নামগুলোর একটি রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট। এটি গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত একটি মিঠাপানির জলাবন। বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট হিসেবে পরিচিত।
বর্ষাকালে পানির উচ্চতা বেড়ে গেলে বনের বড় অংশ পানির নিচে চলে যায়। তখন নৌকায় করে গাছের সারির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। পানির ওপর গাছের প্রতিচ্ছবি, নীরব পরিবেশ এবং বনের ভেতরের সরু জলপথ রাতারগুলকে অন্য যেকোনো পর্যটন স্পটের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।
রাতারগুল শুধু সৌন্দর্যের জায়গা নয়; এটি জীববৈচিত্র্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক পরিবেশ। বন ও জলাভূমির এই মেলবন্ধন সিলেটের পরিবেশগত বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন