০৯:৩৪ এম
মরক্কোর প্রাচীন নগরী ফেজের আঁকাবাঁকা অলিগলি পেরিয়ে তালাআ কাবিরা সড়কে পৌঁছালে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এক অসাধারণ স্থাপত্যের প্রবেশদ্বার। ঘোড়ার নালের আকৃতির খিলান, দেয়ালে সূক্ষ্ম স্টাকোর কারুকাজ, সিডার কাঠে খোদাই করা নান্দনিক নকশা এবং জ্যামিতিক নকশার মোজাইক—এসব দেখে মনে হয়, যেন কোনো রাজপ্রাসাদের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন দর্শনার্থী। কিন্তু এটি কোনো রাজপ্রাসাদ নয়; বরং ইসলামী শিক্ষা, ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা ও মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন—ঐতিহাসিক বু ইনানিয়া মাদরাসা।
বু ইনানিয়া মাদরাসার ইতিহাস মরক্কোর মারিনিদ রাজবংশের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। চতুর্দশ শতকে এই রাজবংশ উত্তর আফ্রিকার অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাদের শাসনামলে ফেজ শহর ধর্মীয় শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্পকলা ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিশেষত মাদরাসা নির্মাণের মাধ্যমে শাসকরা ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার প্রসার ঘটানোর পাশাপাশি নিজেদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও ধর্মীয় বৈধতাও সুদৃঢ় করতে চেয়েছিলেন।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই উঠে আসে সুলতান আবু ইনান ফারিসের নাম। তিনি মারিনিদ শাসক আবুল হাসানের পুত্র ছিলেন। ১৩৪৮ সালে পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তিনি ক্ষমতা দখল করেন এবং নিজেকে সুলতান ঘোষণা করেন। তাঁর শাসনামলে রাজ্য পরিচালনা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা এবং ফেজের মর্যাদা বৃদ্ধির নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। বু ইনানিয়া মাদরাসা নির্মাণও ছিল সেই বৃহত্তর প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আরও পড়ুন: আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনকে লজ্জাজনক বললেন নেতানিয়াহু
বু ইনানিয়া মাদরাসার নির্মাণকাজ শুরু হয় ৭৫১ হিজরির ২৮ রমজান, আনুমানিক ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে। নির্মাণকাজ শেষ হয় ৭৫৬ হিজরিতে, অর্থাৎ ১৩৫৫ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে। প্রায় পাঁচ বছরের এই নির্মাণযজ্ঞে তৎকালীন মরক্কোর দক্ষ কারিগর ও স্থপতিরা অসাধারণ নৈপুণ্যের পরিচয় দেন। মাদরাসাটির নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছিল। কথিত আছে, নির্মাণকাজ শেষে ব্যয়ের হিসাব দেখে সুলতানের সামনে তা পেশ করা হলে তিনি হিসাবের খাতা ছিঁড়ে ফেলে মন্তব্য করেন, ‘যা সুন্দর, তা কখনো বেশি দামি নয়; খরচ যত বেশিই হোক।’
বু ইনানিয়া মাদরাসার ভেতরে প্রবেশ করলে প্রথমেই চোখে পড়ে একটি আয়তাকার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। মার্বেল পাথরে সজ্জিত এই উঠানের মাঝখানে রয়েছে ফোয়ারা। প্রাঙ্গণকে ঘিরে থাকা গ্যালারি, ওপরের তলায় শিক্ষার্থীদের আবাসিক কক্ষ এবং দুই পাশে অবস্থিত বড় বড় পাঠকক্ষ মাদরাসাটির পরিকল্পিত স্থাপত্যের পরিচয় বহন করে। প্রাঙ্গণের দেয়ালে রয়েছে একাধিক স্তরের অলংকরণ। নিচের দিকে জেলিজ নামে পরিচিত রঙিন জ্যামিতিক নকশার মোজাইক টাইলস, তার ওপরে আরবি ক্যালিগ্রাফির শৈল্পিক বিন্যাস এবং আরো ওপরে খোদাই করা স্টাকোর নকশা। কোথাও আরাবেস্ক অলংকরণ, কোথাও মুকারনাসের সূক্ষ্ম কারুকাজ, আবার কোথাও কোরআনিক বাণী ও শৈল্পিক লিপির সমন্বয়। সবশেষে সিডার কাঠের ছাদে খোদাই করা নকশা পুরো স্থাপত্যকে দিয়েছে এক অনন্য মাত্রা।
এখানে প্রতিটি উপাদান যেন আলাদা আলাদা শিল্পকর্ম, অথচ সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক সুসংহত নান্দনিক পরিবেশ। পাথর, কাঠ, প্লাস্টার ও রঙিন টাইলসের সমন্বয়ে নির্মিত এই স্থাপত্য মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলার উচ্চমানের সাক্ষ্য বহন করে। মাদ্রাসাটির পাঠকক্ষগুলোর আকার ও বিন্যাসও উল্লেখযোগ্য। কিছু গবেষক এর স্থাপত্য পরিকল্পনার সঙ্গে কায়রোর সুলতান হাসান মাদরাসার ইওয়ানভিত্তিক স্থাপত্যের তুলনা করেছেন।
মাদরাসার ঠিক বিপরীতে অবস্থিত দার আল-মাগানা বা ‘ঘড়ির ঘর’ ফেজের আরেকটি ঐতিহাসিক বিস্ময়। একসময় ভবনটির সম্মুখভাগে একটি জটিল যান্ত্রিক ঘড়ি স্থাপন করা হয়েছিল বলে জানা যায়। কথিত আছে, ঘড়িটির নির্দিষ্ট সময়ে ধাতব গোলক পিতলের পাত্রে পড়ে শব্দ সৃষ্টি করত এবং একই সঙ্গে জানালার মতো কিছু অংশ খুলে যেত।
আরও পড়ুন: লুলার বিজয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা, ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ
বু ইনানিয়া মাদরাসার পাঠ্যক্রমের কেন্দ্রে ছিল ইসলামী জ্ঞানচর্চা। মারিনিদ শাসকদের অনুসৃত মালেকি মাজহাবের ফিকহ ছিল এর শিক্ষার অন্যতম ভিত্তি। কোরআন, ইসলামী আইনশাস্ত্র এবং ধর্মীয় বিষয়াবলির পাশাপাশি ভাষা, ব্যাকরণ, অলংকারশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা ও অন্যান্য জ্ঞানশাখার চর্চাও মধ্যযুগীয় ফেজের শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিল।
সাত শতকেরও বেশি সময় ধরে নানা রাজনৈতিক পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নগরজীবনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে বু ইনানিয়া মাদরাসা টিকে আছে। বিভিন্ন সময়ে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একাধিকবার সংস্কার করা হয়েছে। বিশেষ করে ভূমিকম্প ও দীর্ঘদিনের ক্ষয়ক্ষতির কারণে এর বিভিন্ন অংশে মেরামত ও পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন দেখা দেয়।
পরবর্তী শতকগুলোতে পরিচালিত সংস্কারকাজের লক্ষ্য ছিল ভবনের মূল স্থাপত্যরীতি ও কারুকাজ যথাসম্ভব সংরক্ষণ করা। আধুনিক সংরক্ষণ কার্যক্রমের ফলে এর জেলিজ মোজাইক, কাঠের অলংকরণ, স্টাকোর নকশা ও অন্যান্য স্থাপত্য উপাদানের উল্লেখযোগ্য অংশ আজও দর্শনার্থীদের সামনে উন্মুক্ত রয়েছে। ১৯৮১ সালে ফেজের প্রাচীন মদিনা ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
মরক্কোর বু ইনানিয়া মাদরাসা এমন একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা, যেখানে শিক্ষা, ধর্মীয় জীবন, রাজনীতি ও শিল্পকলার ইতিহাস একসূত্রে গাঁথা। এর নির্মাণের পেছনে যেমন ছিল মারিনিদ শাসকদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষা, তেমনি এর প্রতিটি খিলান, মোজাইক, কাঠের খোদাই ও ক্যালিগ্রাফিতে ফুটে উঠেছে তৎকালীন মুসলিম কারিগরদের অসাধারণ সৃজনশীলতা। কিংবদন্তি ও ঐতিহাসিক তথ্যের পার্থক্য বিবেচনায় রেখেও বলা যায়, এই মাদরাসা মধ্যযুগীয় ফেজের জ্ঞানচর্চা ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক অনন্য সাক্ষী।
আরও পড়ুন: পুতিনের ‘গোপন তহবিল’ থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলছেন ট্রাম্প, রুশ-মার্কিন সম্পর্কে নতুন মোড়
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন