ঢাকা সোমবার, ০২ই নভেম্বর, ২০২৬খ্রিষ্টাব্দ ১৭ই কার্তিক, ১৪৩২বঙ্গাব্দ ২১শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিজরী
সোমবার, ০২ই নভেম্বর, ২০২৬ইং ১৭ই কার্তিক, ১৪৩২বাং

বাজারে আগুন, পকেটে টান: মধ্যবিত্তের নীরব কান্না, নিম্ন আয়ের মানুষের হাহাকার


বাজারে আগুন, পকেটে টান: মধ্যবিত্তের নীরব কান্না, নিম্ন আয়ের মানুষের হাহাকার

 

দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে দিশেহারা মানুষ, বাড়ছে জনক্ষোভ, আয় বাড়ছে না, অথচ প্রতিদিন বাড়ছে সংসার খরচ; বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকির দাবি, নীরব অর্থনৈতিক সংকটে মধ্যবিত্ত, কঠিন চাপে নিম্ন আয়ের মানুষ।
দেশে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয় এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও শাকসবজি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় প্রতিটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষাব্যয় এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার ব্যয়। সব মিলিয়ে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও গভীর অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে।

বিশেষ করে নির্দিষ্ট বেতনে জীবিকা নির্বাহ করা বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর, পরিবহনশ্রমিক এবং সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর কাছে সংসার চালানো এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাসের শুরুতে যে বেতন হাতে আসে, তার বড় অংশই বাড়িভাড়া, বাজার ও যাতায়াত খরচে শেষ হয়ে যাচ্ছে। মাসের শেষ দিকে অনেক পরিবারকে ধারদেনা কিংবা সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ও অসন্তোষ বাড়ছে। মানুষের অভিযোগ, আয় বৃদ্ধির কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলেও প্রতিনিয়ত বাড়ছে জীবনযাপনের ব্যয়। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।

সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম বড় কারণ হলো আয়ের তুলনায় ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। একজন বেসরকারি চাকরিজীবী কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর মাসিক আয় নির্দিষ্ট থাকলেও বাজারদর, বাড়িভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যয়ের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। প্রতিনিয়ত এসব খাতে ব্যয় বাড়লেও আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা থাকলেও বেসরকারি খাতের বিপুলসংখ্যক কর্মজীবী মানুষের আয় বৃদ্ধির বিষয়টি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় ও সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আমিনুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সরকার শুধু সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বা বেতন স্কেল বাড়িয়েছে। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ বেসরকারি চাকরিজীবী বা সাধারণ জনগণের তো এক টাকাও আয় বাড়েনি। উল্টো সবকিছুর দাম বাড়ায় আমাদের সংসার চালানো এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।"

তিনি বলেন, আগে যে পরিমাণ টাকা দিয়ে মাসের বাজার করা সম্ভব হতো, এখন সেই টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্যের অর্ধেকও কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিসাব করে চলতে হচ্ছে।

আমিনুল ইসলামের মতো অসংখ্য বেসরকারি চাকরিজীবীর অভিজ্ঞতা এখন প্রায় একই। কেউ সন্তানের শিক্ষার ব্যয় কমাচ্ছেন, কেউ চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছেন, আবার কেউ পরিবারের খাদ্যতালিকা থেকে প্রয়োজনীয় কিছু পণ্য বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকের ক্ষেত্রে সঞ্চয় করার সুযোগ তো দূরের কথা, মাসের খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।


জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেনের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু যানবাহনের জ্বালানি খরচে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, কৃষি, শিল্পকারখানা, পণ্য উৎপাদন, বাজারজাতকরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে এর প্রভাব পড়ে।

সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি একলাফে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর ফলে পরিবহন ও উৎপাদন খাতে নতুন করে ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। নতুন মাসে জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত রাখা হলেও আগের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এখনো সাধারণ মানুষের ব্যয় ও বাজার পরিস্থিতিতে অনুভূত হচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রির বিষয়টি সামনে এসেছে। জ্বালানি তেলের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী যানবাহন ও অন্যান্য পরিবহন পরিচালনায় বাড়তি খরচ হচ্ছে। পরিবহন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পেলে পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়ে। আর সেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত পণ্যের খুচরা মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশেষ করে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের বাজারে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে জ্বালানি ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কৃষিপণ্য, মাছ, মাংস, শাকসবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়লে ভোক্তাকেও বেশি দাম দিতে হয়।

এ ছাড়া ডিজেলনির্ভর কৃষিযন্ত্র, সেচপাম্প ও উৎপাদন ব্যবস্থায় জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে কৃষককে পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার মুখে পড়তে হতে পারে। এতে উৎপাদক ও ভোক্তা—উভয় পক্ষই অর্থনৈতিক চাপের শিকার হন।


জ্বালানি তেলের পাশাপাশি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিদ্যুতের ব্যয় বাড়লে শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ, ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়, দোকানপাটের খরচ এবং সেচনির্ভর কৃষির ব্যয় বেড়ে যায়।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিল একটি নিয়মিত পরিচালন ব্যয়। বিদ্যুতের দাম বাড়লেও অনেক প্রতিষ্ঠান পণ্যের দাম বা সেবামূল্য তাৎক্ষণিকভাবে বাড়াতে পারে না। ফলে তাদের মুনাফা কমে যায়। অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে পণ্যের মূল্য সমন্বয় করা হলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই বাড়তি চাপ পড়ে।

অর্থনীতিবিদদের সাধারণ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এসব খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব সামগ্রিক মূল্যস্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের দাবি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে শুধু উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ের হিসাব নয়, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।

আরও পড়ুন: পঞ্চগড়ে দুই মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ৩


দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের দুরবস্থা দৃশ্যমান হলেও মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক সংকট অনেকটাই নীরব। কারণ, নিম্ন আয়ের মানুষের একটি অংশ টিসিবি, ওএমএস কিংবা বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার সামাজিক মর্যাদা, আত্মসম্মান ও লোকলজ্জার কারণে এসব কর্মসূচির সুবিধা নিতে সংকোচ বোধ করেন।

ফলে বাইরে থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও ভেতরে ভেতরে তাঁরা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছেন। পরিবারের সদস্যদের কাছে আর্থিক সীমাবদ্ধতার বিষয়টি প্রকাশ না করে অনেকেই নিজের প্রয়োজন কমিয়ে দিচ্ছেন।

মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তির আয়ের ওপর নির্ভরশীল থাকেন একাধিক সদস্য। বাড়িভাড়া, সন্তানের স্কুল-কলেজের বেতন, যাতায়াত, চিকিৎসা, খাবার ও অন্যান্য খরচ মেটানোর পর হাতে খুব সামান্য অর্থ অবশিষ্ট থাকে। কোনো সদস্য অসুস্থ হলে কিংবা হঠাৎ অতিরিক্ত কোনো ব্যয় তৈরি হলে পুরো মাসের বাজেট এলোমেলো হয়ে যায়।

বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিজীবী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে চাকরির অনিশ্চয়তা, সীমিত বেতন এবং মূল্যস্ফীতির চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। অনেকেই চাকরি হারানোর ভয়ে বাড়তি বেতন দাবি করতে পারেন না। আবার যে বেতন পান, তা দিয়ে আগের মতো জীবনযাপন করাও সম্ভব হচ্ছে না।

এ পরিস্থিতি মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায় এক ধরনের নীরব অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। তাঁদের অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, বিনোদন, সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছেন।


দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সবচেয়ে কঠিন প্রভাব পড়ছে দিনমজুর, রিকশাচালক, শ্রমিক, গৃহকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষের ওপর। তাঁদের অধিকাংশের আয় দৈনিক কিংবা অনিয়মিত। কোনো দিন কাজ থাকলে আয় হয়, আবার কোনো দিন কাজ না থাকলে পরিবারের খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

একজন দিনমজুরের দৈনিক আয় দিয়ে বর্তমানে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। বাজারে সামান্য পরিমাণ চাল, ডাল, তেল ও সবজি কিনতেই আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।

নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে মাছ-মাংসের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে। কেউ তিন বেলার পরিবর্তে দুই বেলা খাবারের ব্যবস্থা করছেন, আবার কেউ প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে তুলনামূলক কম দামের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।

এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু অর্থনৈতিক সংকটই নয়, মানুষের পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও জীবনমানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।


নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি খরচ, পরিবহন, সরবরাহ সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব থাকতে পারে। তবে এসব কারণের পাশাপাশি বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব, অযৌক্তিক মুনাফা এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে আসে।

একই পণ্য উৎপাদনস্থল থেকে পাইকারি বাজার এবং সেখান থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছানোর প্রতিটি ধাপে দাম বাড়তে থাকে। ফলে উৎপাদক যে দামে পণ্য বিক্রি করেন, ভোক্তাকে তার চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হয়।

এখানে প্রশ্ন উঠছে, উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যবর্তী সরবরাহ ব্যবস্থায় কারা কতটা মুনাফা করছেন এবং পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ কী—তা নিয়মিতভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না।

বাজারে পণ্যের সরবরাহ, পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান, মজুত পরিস্থিতি এবং ব্যবসায়ীদের মূল্য নির্ধারণের বিষয়গুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কোনো ব্যবসায়ী বা সিন্ডিকেট যদি অযৌক্তিকভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করে, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

শুধু অভিযান পরিচালনা কিংবা জরিমানা করলেই বাজার স্থিতিশীল হবে না। বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত তথ্য দেশের সামগ্রিক মূল্য পরিস্থিতি মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।

বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে সীমিত আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে। কারণ খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদা। অন্যান্য ব্যয় কমানো সম্ভব হলেও প্রতিদিনের খাবারের প্রয়োজন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

অর্থনীতির প্রচলিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আয় অপরিবর্তিত থাকা অবস্থায় পণ্য ও সেবার দাম বাড়তে থাকলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ আগে যে অর্থ দিয়ে একটি পরিবার মাসের প্রয়োজনীয় বাজার করতে পারত, এখন একই অর্থে সেই পরিমাণ পণ্য কেনা সম্ভব হয় না।

এর ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার পাশাপাশি সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সক্ষমতাও সংকুচিত হয়। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন: ভৈরবে ইঁদুর তাড়ানোর বৈদ্যুতিক ফাঁদে প্রাণ গেল জজ মিয়ার


বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের অন্যতম দাবি হলো জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও বিদ্যুতের ক্ষেত্রে জনস্বার্থ বিবেচনায় ভর্তুকি কিংবা লক্ষ্যভিত্তিক মূল্যসহায়তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার প্রভাব পরিবহন, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা এবং নিত্যপণ্যের বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। তাই এসব খাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সাধারণ মানুষের ওপরও বাড়তি চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।

প্রয়োজনে কৃষি, গণপরিবহন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। বিশেষ করে কৃষকদের জন্য ডিজেল ও সেচ সুবিধায় সহায়তা দেওয়া হলে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে ভর্তুকির সুবিধা যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। ভর্তুকির নামে কোনো অনিয়ম, অপচয় কিংবা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর বাড়তি লাভের সুযোগ তৈরি হলে তার উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।


দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি সংকটে থাকা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্যও খাদ্যসহায়তা সহজলভ্য করা প্রয়োজন। টিসিবি ও ওএমএস কর্মসূচির আওতা, পণ্য সরবরাহ এবং উপকারভোগীর সংখ্যা বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় বাড়ানো যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার, যাতে প্রকৃত সংকটে থাকা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন না করে সহায়তা নিতে পারেন। ডিজিটাল নিবন্ধন, নির্দিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্র এবং স্বচ্ছ উপকারভোগী নির্বাচনব্যবস্থা চালু করা গেলে এ ধরনের সহায়তা কার্যক্রম আরও কার্যকর হতে পারে।

একই সঙ্গে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য সংগ্রহ এবং ভোক্তার কাছে সহনীয় দামে পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।


দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিল্পকারখানা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। তাঁদের একটি বড় অংশের আয় নির্ধারিত হয় প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও কাজের ধরন অনুযায়ী। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের আয় বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ না থাকলে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নয়, বেসরকারি খাতের কর্মীদের ন্যায্য মজুরি, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মীদের জন্য ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন, শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন পরিশোধ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শুধু সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি বা রাজস্ব আয়ের হিসাব দিয়ে বিচার করা যায় না। সাধারণ মানুষ তাঁদের আয় দিয়ে কতটা প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কিনতে পারছেন, পরিবার নিয়ে কতটা স্বস্তিতে থাকতে পারছেন—সেটিও অর্থনীতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।


সাধারণ মানুষের ক্ষোভের পেছনে শুধু বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি নয়, বরং জীবনযাত্রার অনিশ্চয়তাও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আয় না বাড়লেও প্রতিনিয়ত ব্যয় বাড়ছে। ফলে মানুষের সঞ্চয়, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যখন মাস শেষে প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে ব্যর্থ হন, তখন সেটি শুধু আর্থিক সংকট থাকে না; পারিবারিক ও সামাজিক চাপেরও কারণ হয়ে ওঠে। সন্তানদের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানো, পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করানো কিংবা ভবিষ্যতের জন্য কিছু অর্থ সঞ্চয় করা—এসব স্বাভাবিক প্রত্যাশাও অনেকের কাছে ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

মানুষের প্রত্যাশা, সরকার এমন অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করবে, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন না হয়ে পড়ে। বাজার নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য সহনীয় রাখা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং কর্মজীবী মানুষের আয় বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয় এবং স্থির আয়ের এই বাস্তবতা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে। তাই শুধু আশ্বাস কিংবা সাময়িক পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।

সাধারণ মানুষ সরকারের কাছে বিলাসী জীবনযাপনের নিশ্চয়তা চায় না। তারা চায় ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, সহনীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়, সন্তানের শিক্ষার নিশ্চয়তা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা এবং সম্মানজনকভাবে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ।

রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির সুফল যদি সাধারণ মানুষের রান্নাঘর, বাজারের ব্যাগ এবং মাসিক পারিবারিক বাজেটে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে অর্থনৈতিক স্বস্তি কেবল পরিসংখ্যানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকার কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে কী ধরনের বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করে। কারণ মানুষের ধৈর্যেরও সীমা রয়েছে। সেই সীমা অতিক্রম করার আগেই জনজীবনে স্বস্তি ফেরানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

আরও পড়ুন: নড়াইলে হারিয়ে যাওয়া ৩৫ টি মোবাইল ফোন উদ্ধার : প্রকৃত মালিকদের কাছে হস্তান্তর করলেন নড়াইলের পুলিশ সুপার

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

কালকিনিতে সপ্তাহব্যাপী জাতীয় যুব দিবস ২০২৬ এর শুভ উদ্বোধন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

রিপোর্ট-শাহ্ জালাল সরদার, কালকিনি(মাদারীপুর)

রবিবার, ১ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

০২:০৫ পি.এম


কালকিনিতে সপ্তাহব্যাপী জাতীয় যুব দিবস ২০২৬ এর শুভ উদ্বোধন

দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ" এই স্লোগানে মাদারীপুরের কালকিনিতে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের আয়োজনে সপ্তাহব্যাপী জাতীয় যুব দিবস ২০২৬ এর উদ্বোধন করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে রবিবার সকালে উপজেলা পরিষদের সামনে হতে একটি র‍্যালি ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচীর অনুষ্ঠিত হয়। পরে উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়াম ভবনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিশোর কুমার দাসের সভাপতিত্বে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা হাবিবুল আলম, উপজেলা বিএনপির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক বেপারী,উপজেলা বি আর ডিবি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুদীপ বিশ্বাস, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রাসেদুল ইসলাম, উপজেলা জনস্বাস্থ্য সহকারী প্রকৌশলী মোঃ লিমন হোসেনসহ উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা বৃন্দ।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

এমপি নূরুল ইসলাম নূরুলের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগের প্রতিবাদে শনিবারে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আব্দুল আউয়াল মিছবাহ সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি

রবিবার, ১ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

০২:০৭ পি.এম


এমপি নূরুল ইসলাম নূরুলের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগের প্রতিবাদে শনিবারে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল

 সুনামগঞ্জ - ৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম নূরুলের বিরুদ্ধে করা কথিত মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগের প্রতিবাদে আগামীকাল শনিবার দুপুর ১১ টায় বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেছেন সুনামগঞ্জ সদর ও পৌর বিএনপি।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা বি এন পির আহবায়ক
মো: ফারুক আহমেদ লিলু, পৌর বি এন পির আহবায়ক
সাইফুল্লাহ হাসান জুনেদ
ও জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসান রাজু বলেন
আওয়ামী লীগপন্থী ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম তার লুটপাটের অপকর্ম ঢাকতেই মাননীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম নূরুলের বিরুদ্ধে মিথ্যা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ করেছেন । তারা বলেন,মিথ্যা অভিযোগ করে এডভোকেট নূরুল ইসলাম নুরুলের ব্যাপক জনপ্রিয়তা নষ্ট করা যাবে না। তারা বলেন রাজনৈতিকভাবে হয়রানি, ও এমপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যেই এসব মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে।
নেতৃবৃন্দ আগামীকাল শনিবার দুপুর ১১ ঘটিকার বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে সকল নেতা কর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উপস্থিত তাকার জন্য আহবান জানিয়েছেন।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

১০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য সমাবর্তন ‘শুধুই গল্প’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

রবিবার, ১ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

০২:১৩ পি.এম


১০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য সমাবর্তন ‘শুধুই গল্প’

ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দুই দশক পার করে ২১ বছরে প্রবেশ করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র একবার।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে ১১ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী বেরিয়ে গেছেন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৩৯৯ জন সমাবর্তন পেয়েছেন, কিন্তু প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী এখনও সমাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন। এই শিক্ষার্থীদের অনেকেই বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, গণমাধ্যম, শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবসা ও দেশের বাইরে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত রয়েছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাবেক শিক্ষার্থীদের ছাত্রজীবনের সোনালি স্মৃতিকে ফিরে দেখার জন্য কোনো আবেগঘন মুহূর্তের আয়োজন করতে পারেনি। ফলে হাজারো শিক্ষার্থী এখনও তাদের কাঙ্ক্ষিত সমাবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছেন।

প্রথম সমাবর্তন ২০১৭ সালের ১৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত পাঁচটি ব্যাচের ১ হাজার ৩৯৯ জন গ্র্যাজুয়েট অংশগ্রহণ করেন। সেই সময় ২৯ জন শিক্ষার্থীকে মোট ৩২টি স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়।

২০১৭ সালের সমাবর্তন ছিল নজরুল চেতনায় উদ্ভাসিত এক গৌরবময় অনুষ্ঠান। কিন্তু এরপর নতুন কোনো সমাবর্তন না হওয়ায়, একের পর এক অ্যাকাডেমিক ব্যাচ পাস করলেও শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এই দীর্ঘ বিরতিতে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই মনে করছেন, ডিগ্রির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না পাওয়ার কারণে কর্মক্ষেত্রে এক ধরনের অসম্পূর্ণতা রয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এইচ. আই. হাবিব বলেন, "সমাবর্তন হয়েছে মাত্র পাঁচটি ব্যাচ নিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এখন ২০তম ব্যাচ চলে এসেছে। সমাবর্তন না হওয়ার কারণে একটি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে উঠতে যা প্রয়োজন, সেসবের কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না। বরং সাবেক শিক্ষার্থীরা আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, কোনো অ্যালামনাই গঠন করা পর্যন্ত সম্ভব হচ্ছে না এই বিচ্ছিন্নতার কারণে। সমাবর্তনের মাধ্যমে চূড়ান্ত সনদ প্রদান করা হয়, কিন্তু সমাবর্তন না হওয়ায় শিক্ষাজীবনের সেরা অর্জন সেই সনদও পেতে পারছি না আমরা।"

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও লোকপ্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাজমুল হাসান বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠ ব্যাচের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুধু শিক্ষাজীবনের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত থাকায় এই প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি ও সুনামের সঙ্গে আমার আবেগ ও দায়িত্ববোধ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, সমাবর্তন উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন, যা শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অধ্যবসায় ও অর্জনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে। দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে; ফলে অনেক সাবেক শিক্ষার্থী এখনো তাদের কাঙ্ক্ষিত সমাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাই সমাবর্তন আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করে সম্ভাব্য সময়সীমা নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন এবং সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।"

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নিহার সরকার অংকুর বলেন, "একটি সমাবর্তন করতে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে সরকারের সঙ্গে এক ধরনের যোগাযোগ থাকতে হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। যদিও-বা এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না, কিন্তু স্বাভাবিক একটা যোগাযোগ থাকতে হয় যে একটা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তনটা করবে, নিয়মিতভাবে করবে, একটা চাহিদা থাকতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের। আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের যদি মিশন-ভিশন ঠিক না থাকে, তাহলে এগুলো তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না; যে কারণে তারা সমাবর্তনগুলো করার ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে তারা এতটা মনোনিবেশ রাখে না। তারা ব্যস্ত থাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়ে, শিক্ষক-কর্মকর্তারা ব্যস্ত থাকে ডেভেলপমেন্ট কাজ নিয়ে, তারা ব্যস্ত থাকে ইভিনিং কোর্স নিয়ে, তারা ব্যস্ত থাকে কীভাবে আরএফকিউ (RFQ) করবে। সুতরাং শিক্ষার্থীদের এই সমাবর্তনের আনুষ্ঠানিকতার তাদের কাছে কোনো গুরুত্ব নেই, যে কারণে তারা এতে মনোনিবেশ করে না।"

সমাবর্তন নিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, "জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ২০ বছরের পথচলায় এখন পর্যন্ত মাত্র একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় সমাবর্তনের জন্য আমাদের হাজারো শিক্ষার্থী অপেক্ষা করছে। আসলে একটি সমাবর্তন আয়োজন ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং এতে অনেকের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হয়। বস্তুতপক্ষে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো একটি দিকই আমরা এখনও পরিপূর্ণভাবে গড়ে তুলতে পারিনি। আমাদের যেমন লোকবলের অভাব রয়েছে, তেমনি রয়েছে অর্থসংকট। তারপরও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কাছে সমাবর্তন একটি আবেগের জায়গা। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে চায়, বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুনভাবে দেখতে চায়। আমরাও তাদের এই চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে একমত। আমরা আমাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা চেষ্টা করব, দ্বিতীয় সমাবর্তনটি যেন খুব ধুমধাম ও জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করতে পারি। আমরা ধীরে ধীরে সমাবর্তন খাতে অর্থ জমা করার চেষ্টা করছি। উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে অতি দ্রুতই দ্বিতীয় সমাবর্তনের আয়োজন করতে পারব।"

উল্লেখ্য, সমাবর্তন হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান, যেখানে শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হয়। সাধারণত নির্দিষ্ট সময় পরপর এই আয়োজন করা হয় এবং এতে উপাচার্য, চ্যান্সেলরসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকেন। শিক্ষার্থীরা অ্যাকাডেমিক পোশাক (গাউন ও ক্যাপ) পরে অংশগ্রহণ করে এবং তাদের শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

দীপু মনিসহ ৯ আসামি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে, জিয়াউল আহসান ভার্চুয়ালি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

রবিবার, ১ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

০২:১৩ পি.এম


দীপু মনিসহ ৯ আসামি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে, জিয়াউল আহসান ভার্চুয়ালি

২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনিসহ কারাবন্দী ৯ আসামিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে।

আজ রোববার (০১ নভেম্বর) সকালে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠনের শুনানির জন্য নজিরবিহীন নিরাপত্তার মধ্যে তাঁদের আদালতে নেওয়া হয়।

অন্যদিকে, নিরাপত্তাজনিত কারণে মামলার অন্যতম আসামি সাবেক শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান কাসিমপুর কারাগার থেকে অনলাইনে ভার্চুয়ালি এই শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এদিন রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ গঠনের পক্ষে শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা অন্য ৮ আসামি হলেন—জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, পুলিশের সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু এবং সাংবাদিক ফারজানা রূপা। তবে গুরুতর অসুস্থতার কারণে সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হককে এদিন আদালতে হাজির করা হয়নি।

আদালতের নথি অনুযায়ী, গত ৭ অক্টোবর এ মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন ধার্য ছিল। কিন্তু আসামিপক্ষের সময় আবেদনের প্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল শুনানি পিছিয়ে ১ নভেম্বর পুনর্নির্ধারণ করেন। এর আগে, গত ৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ পলাতক শেখ হাসিনাসহ ৩০ আসামিকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আদেশ দেন। নির্ধারিত সময়ে আত্মসমর্পণ না করায় গত ১৬ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল তাঁদের পলাতক ঘোষণা করেন এবং তাঁদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স কাউন্সিল) নিয়োগের নির্দেশ দেন।

মামলায় পলাতক অন্যান্য হাইপ্রোফাইল আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মাহবুবউল আলম হানিফ, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসান মাহমুদ, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ এবং সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ সহ তৎকালীন একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা।

প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগে ২০১৩ সালের ৫ মে রাতে শাপলা চত্বরে অভিযানে ৩২ জনকে হত্যার বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি, পরদিন ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যাকাণ্ডের দায়ের ওপর ভিত্তি করে ৪১ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রস্তুত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ২৭ জুলাই ৪১ আসামির বিরুদ্ধে দাখিলকৃত এই অভিযোগ ট্রাইব্যুনাল আমলে নেন এবং কারাবন্দীদের আদালতে হাজিরার পাশাপাশি পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

আর্কাইভ

Please select a date!

নামাজের সময়সূচী

তারিখঃ ২১শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিঃ
ফজর ০৪:৪৮
জোহর ১১:৪৩
আসর ০৩:৪৩
মাগরিব ০৫:১৯
ইশা ০৬:৩১
সূর্যোদয় : ০৬:০৫ সূর্যাস্ত : ০৫:১৯
অনলাইন জরিপ
ফলাফল
থার্টি-ফার্স্ট নাইটে তরুণদের জন্য প্রকাশ্যে পানি-টানি খাওয়ার বিরুদ্ধে আহ্বান। আপনার মন্তব্য দিন
হ্যা
100%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%