১২:৩৭ পি.এম
আজ ৩ নভেম্বর—আমাদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত বেদনাবিধুর একটি দিন। আজ আমার প্রিয় বাবার ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। দেখতে দেখতে বাবাকে হারানোর ২৩ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এত বছর পরও তাঁর শূন্যতা আমাদের হৃদয় থেকে একটুও মুছে যায়নি। আজও প্রতিটি স্মৃতি, প্রতিটি মুহূর্তে বাবার অভাব গভীরভাবে অনুভব করি।
২০০৩ সালের ৩ নভেম্বর সকাল ৭টায় রাজধানী ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমার বাবা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে সেদিন তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চিরদিনের জন্য আমাদের ছেড়ে চলে যান। সময়ের পরিক্রমায় জীবনের অনেক কিছু বদলে গেছে, বদলে গেছে আমাদের পারিবারিক জীবনও। কিন্তু বাবাকে হারানোর সেই শূন্যতা আজও আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যের হৃদয়ে গভীরভাবে রয়ে গেছে।
আমার বাবা ছিলেন অত্যন্ত ভালো মনের একজন মানুষ। আমার দেখা জীবনের যতটুকু সময়ে তাঁকে পেয়েছি, কখনো কারও সঙ্গে তাঁকে ঝগড়া-বিবাদে জড়াতে দেখিনি। কারও সঙ্গে মনোমালিন্য কিংবা খারাপ আচরণ করতে দেখিনি। তিনি ছিলেন সহজ-সরল, বিনয়ী ও মাটির মানুষ। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন, কাউকে কষ্ট দিতে চাইতেন না। তাঁর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় দিক ছিল—তিনি কখনো কারও সঙ্গে অন্যায় করতে চাইতেন না।
বাবার জীবনটাও খুব সহজ ছিল না। ছোটবেলায় তাঁর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি তাঁর মাকেও হারান। জীবনের শুরুর সময়েই তাঁকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। দাদির কাছে বড় হয়েছেন, পার করেছেন অনেক কঠিন সময়। শৈশবের সেই অভাব-অনটন ও প্রতিকূলতা তাঁকে জীবনের বাস্তবতা চিনতে শিখিয়েছিল। হয়তো সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে আরও বেশি মানবিক, সহনশীল ও বিনয়ী করে তুলেছিল।
বাবা আমাদের পরিবারের জন্য ছিলেন নির্ভরতার একটি জায়গা, ভালোবাসার আশ্রয়। তাঁর উপস্থিতি আমাদের পরিবারকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছিল। কিন্তু একসময় তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর চিকিৎসার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছিল। খালা-মামারাও সাধ্যমতো চিকিৎসার ব্যয় বহন করেছেন। সবাই চেয়েছিলেন, বাবা সুস্থ হয়ে আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসুন। কিন্তু সব চেষ্টা ও প্রত্যাশাকে পেছনে ফেলে একদিন তিনি চিরবিদায় নিলেন।
বাবার মৃত্যুর পর আমাদের পরিবার যেন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। তাঁর চলে যাওয়ায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা আজও পূরণ হয়নি। একজন বাবাকে হারানো মানে শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়; হারিয়ে ফেলা জীবনের এক নির্ভরতার জায়গা, ভালোবাসার আশ্রয় এবং কঠিন সময়ে মাথার ওপর থাকা ছায়া। সময় অনেক দূর এগিয়ে গেছে, কিন্তু বাবাকে হারানোর কষ্ট আজও একই রকম রয়ে গেছে।
আজও বাবার বলা কিছু কথা কানে বাজে। বিশেষ করে জীবনের শেষ সময়ে দেওয়া তাঁর একটি উপদেশ আমার হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে। তিনি বলেছিলেন—
“জীবনে যতদিন বেঁচে থাকবি, কখনো কারও সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবি না, কাউকে ব্ল্যাকমেইল করবি না। মানুষের সঙ্গে অন্যায় করবি না।”
বাবার এই কথাগুলো শুধু উপদেশ নয়, আমার কাছে জীবনের অন্যতম মূল্যবান শিক্ষা। জীবনের নানা পরিস্থিতিতে তাঁর সেই কথাগুলো মনে পড়ে। মানুষ হিসেবে সৎ থাকা, কারও সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করা এবং অন্যায়ের পথ থেকে দূরে থাকার যে শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন, তা আজও আমার চলার পথের পাথেয়।
বাবা, আপনি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু আপনার স্মৃতি, আপনার ভালোবাসা এবং আপনার দেওয়া শিক্ষা আমাদের হৃদয়ে বেঁচে আছে। পৃথিবীতে কিছু মানুষের শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। আপনি ছিলেন আমাদের কাছে তেমনই একজন মানুষ। মহান আল্লাহর কাছে একটাই প্রার্থনা—তিনি যেন আপনার জীবনের সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেন, কবরের আজাব থেকে হেফাজত করেন, আপনার কবরকে প্রশস্ত ও নূরে পরিপূর্ণ করে দেন এবং আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন।
আমার বাবার জন্য সবাই দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন তাঁকে ক্ষমা করে জান্নাতবাসী করেন। আমিন।
বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসায় স্মরণ করছি আমার প্রিয় বাবাকে।
আজ আমার শ্রদ্ধেয় বাবার মৃত্যুবার্ষিকী। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, আল্লাহ যেন আমার বাবাকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করেন। বাবা, তুমি ওপারে যেখানেই থাকো, মহান আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখুন এবং শান্তিতে রাখুন। আমিন।
আরও পড়ুন: সুনামগঞ্জে ডিবির অভিযানে ইয়াবাসহ যুবক আটক
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন