০৯:২৯ এম
মানবজীবন মহান আল্লাহ তাআলার অসংখ্য নিয়ামতে পরিপূর্ণ। মাটি, পানি, আলো, বাতাস, বিবেক ও জ্ঞান—এসবই মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অনুগ্রহ। তথাপি, মানুষ অনেক সময় মহান আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলে যায়। পবিত্র কোরআনের সুরা আর-রহমান আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামত ও তাঁর প্রতি মানুষের কৃতজ্ঞতার বিষয়টি তুলে ধরেছে। আর-রহমান শব্দের অর্থ পরম করুণাময়। সুরাটির শুরুতেই মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর করুণার পরিচয় তুলে ধরেছেন।
সুরা আর-রহমান পবিত্র কোরআনের ৫৫তম সুরা। এর আয়াতসংখ্যা ৭৮। পারা ২৭। এই সুরার একটি বিশেষত্ব হলো মহান আল্লাহ তাআলা এখানে একটি আয়াত ৩১ বার পুনরাবৃত্তি করেছেন। আয়াতটির অর্থ হলো, "তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?" বিভিন্ন নিয়ামত ও সৃষ্টির নিদর্শন বর্ণনার পর বারবার এই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মানুষ ও জিনকে তাঁর অনুগ্রহ স্মরণ করতে এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে আহবান জানিয়েছেন।
সুরা আর-রহমানের আয়াতগুলোতে ছন্দোময় ভাষা, অন্ত্যমিল ও অপূর্ব বর্ণনাশৈলী লক্ষ্য করা যায়। এর শ্রুতিমধুর উপস্থাপন এবং নিয়ামত ও কৃতজ্ঞতার গভীর বার্তার কারণে একে নিয়ামত ও কৃতজ্ঞতার মহাকাব্য হিসেবে অভিহিত করা যায়। সুরাটির ছন্দোময় বর্ণনা পাঠকের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সৃষ্টিজগতের প্রতি উপলব্ধি জাগিয়ে তোলে। আলী (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "প্রতিটি জিনিসেরই একটি সৌন্দর্য রয়েছে, আর কোরআনের সৌন্দর্য হলো সুরা আর-রহমান।" (শুআবুল ঈমান, হাদিস ২২৬৫)
আরও পড়ুন: আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়া হাফেজ হীরাকে সংবর্ধনা
এই সুরায় মহান আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতের বিভিন্ন নিয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে সমুদ্রের বিস্ময়কর নিদর্শনের কথাও আছে। সুরাটির ১৯ ও ২০ নম্বর আয়াতে দুটি সমুদ্রের মিলন এবং তাদের মাঝখানে অন্তরালের কথা বলা হয়েছে। অনেকেই এর উদাহরণ হিসেবে ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের সংযোগস্থল অর্থাৎ মরক্কো ও স্পেনের মধ্যবর্তী জিব্রাল্টার প্রণালির কথা উল্লেখ করেন। সেখানে পানির লবণাক্ততা, তাপমাত্রা ও ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন জলস্তরের বৈশিষ্ট্য আলাদা থাকতে পারে। এ ধরনের প্রাকৃতিক নিদর্শন মানুষকে সৃষ্টিজগতের বিস্ময় নিয়ে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে।
সুরা আর-রহমানের ফজিলত সম্পর্কে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সামনে সুরা আর-রহমানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করেছিলেন। পরে তিনি জানান, জিনদের সামনেও তিনি এই সুরা তিলাওয়াত করেছিলেন। তখন তারা "তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে"—এই আয়াতের জবাবে বলেছিল, "আমরা আমাদের রবের কোনো নিয়ামতকেই অস্বীকার করি না; সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই।" (তিরমিজি, হাদিস ৩২৯১)
এই বর্ণনা থেকে আল্লাহর নিয়ামতের স্বীকৃতি এবং তাঁর প্রশংসা করার গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়। সুরা আর-রহমানের অন্যতম বিশেষত্ব হলো এতে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর অসংখ্য নিয়ামতের বর্ণনা দিয়েছেন এবং একই প্রশ্ন বারবার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে মানুষকে কৃতজ্ঞ হতে আহবান জানিয়েছেন।
সুরাটি আমাদের শেখায়, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা শুধু মুখে প্রকাশ করলেই যথেষ্ট নয়; বরং তাঁর দেওয়া নিয়ামত সঠিকভাবে ব্যবহার করা, মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং ন্যায়ের পথে চলাও জরুরি। সৃষ্টিজগতের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ, সম্পদের অপচয় রোধ এবং অন্যের কল্যাণে এগিয়ে আসাও নিয়ামতের যথাযথ ব্যবহারের অংশ।
আরও পড়ুন: রায়পুরে বিএনপি নেতার আয়োজনে হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের পুরস্কার বিতরণ
পরিশেষে বলা যায়, সুরা আর-রহমান আল্লাহর রহমত, নিয়ামত ও মানুষের দায়িত্ব সম্পর্কে গভীর শিক্ষা দেয়। এর ছন্দোময় বর্ণনা, নিয়ামতের পুনঃ পুনঃ স্মরণ এবং পরকালীন জবাবদিহির বার্তা মানুষকে আত্মসমালোচনার সুযোগ করে দেয়। এর মর্ম উপলব্ধি করে ব্যক্তিজীবন ও সমাজে বাস্তবায়ন করতে পারলেই কৃতজ্ঞতার প্রকৃত প্রকাশ ঘটবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন