০৭:০০ পি.এম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য গত কয়েক দিন ছিল যথেষ্ট অস্বস্তিকর। যদিও তিনি প্রকাশ্যে তা স্বীকার করতে চান না, তবে একের পর এক ঘটনায় তাকে এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা তার রাজনৈতিক অবস্থান ও নেতৃত্বের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ওয়াশিংটনের একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নিয়ে আইনি বিতর্ক, অ্যাটর্নি জেনারেল পদে তার মনোনীত প্রার্থীর নিয়োগে জটিলতা এবং ইরান যুদ্ধের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ও সামরিক অনিশ্চয়তা- সব মিলিয়ে ট্রাম্পকে এমন সংকট মোকাবিলার সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে, যার অনেকগুলোই তার নিজের সিদ্ধান্তের ফল বলে বিশ্লেষকদের মতে মনে হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প বরাবরই বাস্তবতার চেয়ে নিজের অবস্থানকে জোরালোভাবে তুলে ধরতে অভ্যস্ত। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, বিরোধীদের নয়; বরং দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযোগী ও রিপাবলিকান মিত্রদের কাছ থেকেই তিনি প্রশ্ন ও আপত্তির সম্মুখীন হচ্ছেন।
আরও পড়ুন: ইসরাইলে নির্বাচন: ৮৫ শতাংশ ভোট গণনা শেষ, চূড়ান্ত ফলাফল দুই দিনে আসবে
ঘনিষ্ঠ সহযোগীর সিদ্ধান্তেও ট্রাম্প ক্ষুব্ধ। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল জিনিন পিরো ওয়াশিংটন মনুমেন্টের পাশে অবস্থিত রিফ্লেকটিং পুল ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগে সাবেক অলিম্পিয়ান ডেভিড হার্নের বিরুদ্ধে আনা ফৌজদারি অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন।
আদালতে দাখিল করা ২০ পৃষ্ঠার আবেদনে পিরো জানান, ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত ভাঙচুর ছিল না, বরং স্থাপনা সংস্কারের সময় ত্রুটিপূর্ণ কাজের কারণে ক্ষতি হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতেই প্রথমে মামলা করা হয়েছিল।
কিন্তু ট্রাম্প শুরু থেকেই ঘটনাটিকে ভাঙচুর হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। অভিযোগ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে তিনি প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানান। নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি পিরোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। পরে হোয়াইট হাউসেও একই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “তিনি ছাতার মতো ভেঙে পড়েছেন।”
বিশ্লেষকদের মতে, আদালতে টেকসই প্রমাণের অভাব থাকায় পিরোকে মামলা প্রত্যাহার করতে হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প এখনও তার আগের অবস্থানেই অনড়।
আরও পড়ুন: স্পেনে দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত ৬৮, আহত ৮০
অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগেও রিপাবলিকানদের আপত্তি। ট্রাম্পের আরেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সাবেক ব্যক্তিগত আইনজীবী টড ব্ল্যাঞ্চকে স্থায়ী অ্যাটর্নি জেনারেল করার উদ্যোগও বড় বাধার মুখে পড়ে।
রিপাবলিকান সিনেটর জন করনিন ও থম টিলিস ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ব্ল্যাঞ্চের মনোনয়নে আপত্তি জানান। তাদের দাবি ছিল, ব্ল্যাঞ্চকে লিখিতভাবে জানাতে হবে যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার শিকার হওয়ার দাবি করা ব্যক্তিদের জন্য প্রস্তাবিত ১৮০ কোটি ডলারের ক্ষতিপূরণ তহবিল পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ তিনি সমর্থন করবেন না।
বিশেষ করে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল ভবনে হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত ট্রাম্প-সমর্থকদের ক্ষতিপূরণ দিতে ওই তহবিল ব্যবহার হতে পারে- এমন আশঙ্কা থেকেই রিপাবলিকানদের একটি অংশ আপত্তি তোলে।
এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ব্ল্যাঞ্চকে তিনি ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবেই বহাল রাখবেন এবং ওই তহবিল অনুমোদনের জন্য কংগ্রেসে চাপ অব্যাহত রাখবেন। তিনি বলেন, “বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসবে এবং আমি এটি বাস্তবায়ন করব।”
আরও পড়ুন: কাতারের নতুন প্রস্তাব ইরানকে, যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা
তবে সিনেটে প্রয়োজনীয় সমর্থন না থাকায় শেষে ব্ল্যাঞ্চ আপত্তিকারী সিনেটরদের শর্ত মেনে দুটি লিখিত প্রতিশ্রুতিপত্র দেন। এরপর জন করনিন ও থম টিলিস জানান, তাদের উদ্বেগ দূর হয়েছে।
তবে ট্রাম্প কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে বলেন, তিনি ব্ল্যাঞ্চের দেওয়া নথি দেখেননি এবং কী বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, সেটিও তিনি জানতেন না।
ইরান যুদ্ধে জটিলতা আরও বাড়ছে। আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ইরান যুদ্ধ। রবিবার ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের অনুরোধ এবং কয়েকটি আরব দেশের মধ্যস্থতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক হামলা তিনি শেষ মুহূর্তে স্থগিত করেছিলেন।
কিন্তু পরদিনই ইরান নতুন কোনও সরাসরি আলোচনা হচ্ছে- এমন দাবি অস্বীকার করলে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, “তারা বৈঠক চায়, কেউ কেউ বলবে অনুনয় করে। আলোচনা শুরু হয়, আরও বৈঠকের সময় নির্ধারণ হয়। এরপর প্রকাশ্যে বলে তারা কোনও আলোচনাই করছে না।”
আরও পড়ুন: ইসরায়েলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা: সরকার গঠনের তিন সম্ভাব্য পথ
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে নতুন কোনও আলোচনা নির্ধারিত হয়নি। অন্যদিকে, এক ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, বর্তমানে ওমানের মাধ্যমে কেবল হরমুজ প্রণালিতে নৌপরিবহন-সংক্রান্ত বিষয়েই আলোচনা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ ও কূটনীতি ঘিরে এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সংঘাত নিরসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।
জনপ্রিয়তায়ও ধাক্কা। ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কমছে বলে সাম্প্রতিক জনমত জরিপে উঠে এসেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক জরিপে তার জনপ্রিয়তার হার ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। সিএনএন, কুইনিপিয়াক ও ইউগভের জরিপেও একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে।
আধুনিক মার্কিন ইতিহাসে দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া রিচার্ড নিক্সন ছাড়া আর কারও জনপ্রিয়তা এতটা নিচে নামেনি বলে বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করছেন। তবে ট্রাম্প এসব জরিপকে বরাবরের মতোই প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আরও পড়ুন: নির্বাচনে হারের মুখে আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ লিকুদ পার্টির
তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, “ভুয়া সংবাদমাধ্যমের বানানো জরিপ নয়, আমার প্রকৃত জনপ্রিয়তা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।”
মধ্যবর্তী নির্বাচনই হবে বড় পরীক্ষা। আর মাত্র তিন মাস পর যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতেও জনমত জরিপে পিছিয়ে থাকার পরও ট্রাম্প নির্বাচনী লড়াইয়ে শক্ত অবস্থান দেখিয়েছেন। তবে এবার ইরান যুদ্ধ, প্রশাসনিক বিতর্ক এবং রিপাবলিকানদের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তাদের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রত্যাশিত ফল না পেলে সেটিই হবে ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতা- যা শেষ পর্যন্ত অস্বীকার করা তার পক্ষেও কঠিন হয়ে পড়বে।
আরও পড়ুন: শামা ওবায়েদের স্পেন ও ইইউর সহযোগিতার প্রশংসা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায়
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন