০৫:৪০ পি.এম
দখল ও দূষণের কারণে খুলনার সরকারি তালিকাভুক্ত ৫৭২টি প্রবহমান খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং কৃষক ও কৃষির উপর পানি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় কৃষক এবং কৃষি দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, দখলদারদের উচ্ছেদ, নদী ও খালের শ্রেণি পরিবর্তন বন্ধ করা, বৈজ্ঞানিকভাবে ড্রেজিং, পুরনো পোল্ডার প্রকল্পের পুনর্মূল্যায়ন, প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পানি ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত পানি ও পলির মান পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, কৃষি ও প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এমন পরিস্থিতিতে, আগামী শুকনো মৌসুমে খননের জন্য সম্ভাব্য ১৬টি খাল তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এ জন্য যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
আরও পড়ুন: আলেমদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যকারীদের উদ্দেশে রফিকুল ইসলাম মাদানির বিস্ফোরক পোস্ট!
২০২৪ সালের জুলাইয়ে খুলনা অঞ্চলের কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং ফসলি জমির বর্তমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) একটি বিশেষ জরিপ পরিচালনা করে। ওই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা জেলায় প্রবহমান ও সরকারি তালিকাভুক্ত খালের সংখ্যা ৫৭২টি। এর মধ্যে ৪৪টি খাল লিজে থাকার কারণে কৃষিজমিতে সেচ বিঘ্নিত হচ্ছে। জেলার ৫২২টি খাল ভরাট হয়ে গেছে, যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় দুই হাজার ২০০ কিলোমিটার।
খুলনা কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহন কুমার ঘোষের নেতৃত্বে একটি দল বিশেষ জরিপ ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে তালিকাটি প্রস্তুত করে। এই তালিকায় ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা, দাকোপ, পাইকগাছা, তেরখাদা ও রূপসার বিভিন্ন খালের মধ্যে গুয়াগাছিয়া, চুকনগর, শৈলমারি শাখা, হরিণটানা, বাতি-বুটিয়ার, মোজাহারি, চাঁদখালী, নয়াই, গদাইপুর, শিবসা-সংযুক্ত শাখা, ভূঁইয়ার, আঠারোবেকী ও নন্দনপুরের খাল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এছাড়া, কয়রায় ২০ একরের নিচে ৯৯টি জলমহাল রয়েছে, যার মধ্যে চারটি খাল সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে গেছে। ১৭টির নাব্যতা না থাকায় ইজারা না দিয়ে খাস আদায় করা হচ্ছে। মামলার কারণে ১২টির ইজারা বন্ধ এবং তিনটি খালের ইজারা স্থগিত রয়েছে।
স্থানীয় কৃষক, কৃষি দপ্তর ও সংশ্লিষ্টরা জানান, এক সময় খুলনায় অসংখ্য ছোট-বড় খাল জালের মতো ছড়িয়ে ছিল। এসব জলপথ নদ-নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে কৃষিজমিতে পানি সরবরাহ ও পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো। কিন্তু পলি জমা, দখল, অপরিকল্পিত স্থাপনা ও মানবসৃষ্ট নানা কারণে অনেক খাল সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন: বরিশালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিবিএ আওয়ামী লীগপন্থী নেতা তুহিনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, সুদের কারবার নির্যাতনে দিশেহারা অসহায় মানুষ
কিছু খাল পুরোপুরি ভরাট হয়ে গেছে। জেলার ডুমুরিয়ায় নদী-খাল ভরাট এবং পানি ওঠানামার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে কয়েক দশক ধরে বিল ডাকাতিয়ায় তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, আগামী শুকনো মৌসুমে খুলনার ১৬টি খাল খননের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছে ত্রাণ পুনর্বাসন অধিদপ্তর।
এসব খালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ফুলতলা উপজেলার সায়েলের খাল ও দফাদার খাল; দাকোপ উপজেলার আনন্দনগর খাল; রূপসা উপজেলার শিয়ালী আঠারোবেকী নদী থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত খাল; বটিয়াঘাটা উপজেলার কাটিয়ানাংলা; কয়রা উপজেলার বামিয়া মাথাভাঙা ও আগরগারিয়া; দিঘলিয়া উপজেলার মাথাভাঙা এবং ডুমুরিয়া উপজেলার রূপরামপুর মাড়ুয়া-আমভিটা পর্যন্ত খাল ও ক্ষুদে খাল।
ডুমুরিয়ার কৃষক সমীর কুমার ও খর্ণিয়া গ্রামের বাসিন্দা আবু হানিফ মোড়ল বলেন, ‘প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে কৃষিকাজ করতে হয়। নদী-খালগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে শুকনো মৌসুমে তীব্র পানি সংকট দেখা দেয়। এজন্য গভীর নলকূপ থেকে পানি সরবরাহ করতে হচ্ছে। অথচ খাস খালগুলো পুনঃখনন করা হলে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ সম্ভব হয়। এতে কৃষিকাজে কৃষকের খরচ কমে।’
আরও পড়ুন: চৌমুহনী: অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত
পাইকগাছার বাকা গ্রামের আহাদ আলী গোলদার (৫৯) বলেন, এক সময় খাল দিয়ে বিলের পানি নদীতে নামতো। এখন নদী খনন করা হলেও খালের মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের বিপদের শেষ নেই। তিনি বলেন, ‘আমাদের বৃষ্টির সময় ডুবতে হয়। খালগুলো খোলা থাকলে আমরা ধান-পান কইরে বাঁচতে পারতাম। পানি নোনা কম হতো।’
এদিকে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, উজানের মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া এবং পোল্ডার ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা ক্রমেই উত্তরের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। মাটিতেও লবণাক্ততা বাড়ছে।
২০২৩ সালে ডুমুরিয়ার গুটুদিয়ায় ৪ দশমিক ৬, ফুলতলা-বটিয়াঘাটায় ৪ দশমিক ১, পাইকগাছার শিববাড়ীতে ১৪ ডিএস/মি পর্যন্ত লবণাক্ততার তথ্য রয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পানি সংকটে খরিপ ও রবি মৌসুমে ধান, পাট ও সবজির উৎপাদন ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার কারণে দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছার অনেক এলাকায় সবজি চাষ ব্যাহত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নারকেল পাড়াকে কেন্দ্র করে কিশোরকে কুপিয়ে হত্যা
অন্যদিকে, মৎস্য খাতে চিংড়ি, পাবদা, গজাল ও বোয়ালি বা বেলে জাতীয় মাছের প্রাপ্যতা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
খুলনার নদী ব্যবস্থার বিপর্যয়ের চিত্র আন্তর্জাতিক সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল চ্যালেঞ্জেস জি-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশ-বিদেশের পরিবেশ-ভুগোল বিশেষজ্ঞ দল জেলার মধ্যে কেবল ডুমুরিয়ার উপজেলায় এ গবেষণা করে।
গবেষণায় ১৯৮৭-২০২৪ সাল পর্যন্ত স্যাটেলাইট চিত্র, জলবিদ্যাগত তথ্য ও স্থানীয় জনগণের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, এ সময় উপজেলার মোট নদী নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য ৪৯২ দশমিক ৯ কিলোমিটার থেকে কমে ২০৩ দশমিক ৭ কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ৩৭ বছরে নদীর মোট দৈর্ঘ্য কমেছে প্রায় ৫৯ শতাংশ। গড়ে প্রতিবছর হারিয়েছে ৬ দশমিক ১৪ কিলোমিটার নদীপথ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার উপপরিচালক দপ্তরের কৃষি প্রকৌশলী দীপঙ্কর চন্দ্র বালা কালের কণ্ঠকে বলেন, নদী-খালের প্রবাহ বন্ধ হওয়ার প্রভাব কৃষিতে সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে খুলনাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চল হওয়ায় ভূ-গর্ভস্থ পানি তোলায় বড় বিপর্যয় নেমে আসছে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে লবণাক্ততা। তাই নদী-খালগুলোর অবাধ পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারিভাবে এনিয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। তবে এর জন্য সমন্বয় প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদের অর্ধদিবস সড়ক অবরোধ
কৃষি প্রকৌশলী দীপঙ্কর বালা জানান, কৃষি বিভাগ এনিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছে। বিগত সময়ে ৬০টির মতো খাল খনন করা হয়েছে। তালিকা প্রস্তুত করে নতুন করে খননের উদ্যোগ রয়েছে। তবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
খুলনা জেলা ত্রাণ পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, নদী-খাল খনন নিয়ে একাধিক সংস্থা কাজ করে থাকে। ইতিমধ্যে খুলনায় ১৭টি খালের সম্ভাব্য তালিকা হয়েছে। তবে এর মধ্যে একটি খালের নাম দুইবার আসায় খালের সংখ্যা ১৬টি।
এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার লাভ-ক্ষতি দেখে খালখনন প্রকল্প অনুমোদন পাবে। দ্রুত পলি পড়বে এমন খাল অনুমোদন পাবে না। খালগুলো খনন করা হলে কৃষি, মৎস্য এবং পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়বে।
আরও পড়ুন: খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে চলছে আধাবেলা সড়ক অবরোধ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন