০৩:৪৬ পি.এম
একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না।সড়ক দুর্ঘটনা শুধু তাজা প্রাণই কেড়ে নেয় না,বহু পরিবারকে চিরতরে ঠেলে দেয় চরম অনিশ্চয়তা ও ক্রাচে ভর দেওয়া এক যন্ত্রণাদায়ক বাস্তবে। কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার মো.রুহুল আমিনের(৪৫) গল্পটি তেমনি এক করুণ উপাখ্যান।
যে মানুষটি দীর্ঘদিন চিলমারী-ঢাকা রুটের নাইট কোচের হেলপার হিসেবে যাত্রীদের পথ চলার সঙ্গী হয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন,একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় আজ তার জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে একটি পা।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের এই দিনে,যখন চারদিকে নিরাপদ সড়কের দাবি উচ্চারিত হচ্ছে,ঠিক তখনই এক পায়ে ভর দিয়ে জীবিকার চাকা ঘোরাতে বাধ্য হচ্ছেন রুহুল আমিন।
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলাধীন কিষামতবানু নালারপাড় গ্রামের প্রয়াত রহিব আলী ও রহিতন বেগমের ছেলে রুহুল আমিন।দিন এনে দিন খাওয়া পরিবারটির সংসার চলত তাঁর নাইট কোচের হেলপারের সামান্য আয়ে।
গত মার্চ মাসে ঢাকা যাওয়ার পথে তাদের নাইট কোচটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।এতে রুহুল আমিনের বাম পায়ের গোড়ালি থেঁতলে যায়।আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে রংপুরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে পা-টি রক্ষা করতে টানা এক মাস চিকিৎসার পর চিকিৎসকেরা আর পা-টি রক্ষা করতে পারেননি। হাটুর নিচের অংশ কেটে বাদ দিতে হয়েছে।দীর্ঘ চিকিৎসার পর ঝরে পড়া এক পা আর ক্রাচে ভর দেওয়া শরীর নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরেন রুহুল আমিন। কিন্তু দুর্ঘটনার ক্ষত শুধুই পায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি বর্তমানে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ বাসা বেঁধেছে তাঁর শরীরে।
সব হারিয়ে বর্তমানে রুহুল আমিনের স্থাবর সম্পত্তি বলতে কেবল বসতভিটার মাত্র এক শতক জমি ছাড়া আর কিছুই নেই। অথচ তার কাধে পরিবারের চার সদস্যের জীবনযাপনের ভার। বড় মেয়েটি এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে।ছোট ছেলেটি পড়ছে পঞ্চম শ্রেণীতে।
সন্তানদের লেখা-পড়া,সংসার চালানো এবং চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে পরিবারটি এখন ঋণগ্রস্থ ও সহায় সম্বলহীন হয়ে পড়েছে। একদিকে পাহীন অসুস্থ শরীর আর ডায়াবেটিস-হৃদরোগের মতো জটিল ব্যাধি,সব মিলিয়ে রুহুল আমিনের জীবন আজ চরম অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
এত কিছুর পরও অন্যের করুণার পাত্র হতে চাননি রুহুল আমিন। এক পায়ের পঙ্গুত্ব আর শারীরিক হাজারো প্রতিবন্ধকতা সত্বেও জীবনযুদ্ধে হার মানেননি তিনি।নিরুপায় হয়ে গ্যারেজ থেকে ভাড়ায় একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা এনে এক পা দিয়েই তা চালিয়ে উপার্জনের চেষ্টা করছেন।
অশ্রুসজল চোখে রুহুল আমিন বলেন,ক্রাচে ভর দিয়ে গ্যারেজ থেকে রিকশা বের করি। এক পায়ে ব্রেক আর ব্যাটারির সাহায্যে গাড়ি চালাই। শরীর চলে না,হৃদরোগ আর ডায়াবেটিসের কারণে ঘন ঘন হাঁপিয়ে উঠি। কিন্তু ঘরে সন্তানদের পড়ালেখা আর পেটের ক্ষুধা তো থেমে থাকে না।আমি না খাটলে ওদের মুখে খাবার দেবে কে?
রুহুল আমিনের মতো দুর্ঘটনাকবলিত অসহায় মানুষগুলোর বেঁচে থাকার লড়াই আমাদের সড়ক সুরক্ষার ভয়াবহ চিত্রকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।চিলমারীর এই একপা হারানো মানুষটির আকুল আবেদন,অন্তত তাঁর সন্তানদের পড়াশুনা চালিয়ে নিতে এবং একটু চিকিৎসার জন্য যেন সমাজের বিত্তবান ও সরকারি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: বেগমগঞ্জে তরুণ কামরুল হাসানকে গুলি করে মোটরসাইকেল ছিনতাই
গোলাম মাহবুব
চিলমারী,কড়িগ্রাম
মোবাইলঃ ০১৭১৬-৫০৭৪৬৫
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন