১০:২১ এম
ভাটায় খনন, জোয়ারে পরিমাপের অভিযোগ; জ্বালানি তেলের হিসাব, খনন করা বালু-পলি অপসারণ, বেসরকারি ড্রেজার ভাড়া ও মেরামত ব্যয় ঘিরে গুরুতর প্রশ্ন—জবাবদিহির আওতায় আসবেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা?
দক্ষিণাঞ্চলের নদীপথ সচল রাখতে প্রতিবছর ড্রেজিংয়ে ব্যয় হচ্ছে সরকারি অর্থ। নদীতে চলছে ড্রেজার, হচ্ছে খননকাজ; কিন্তু ভোলা–লাহারহাট–বরগুনা–আমতলী–পটুয়াখালী–বরিশালসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নাব্যতা সংকট ও ডুবোচরের অভিযোগ কাটছে না। কোথাও নৌযানকে ভাটার সময় চলাচলে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে, কোথাও জোয়ারের অপেক্ষায় আটকে থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তাহলে ড্রেজিংয়ের নামে ব্যয় করা অর্থের সুফল কোথায়? খননকাজের পরিমাপ, জ্বালানি তেলের হিসাব, উত্তোলিত মাটি অপসারণ, বেসরকারি ড্রেজার ভাড়া এবং যন্ত্রপাতি মেরামতের ব্যয়—এসব খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হচ্ছে কি?
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বরিশাল কার্যালয়ের ড্রেজিং কার্যক্রম ঘিরে এমন একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যেগুলোর নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ড্রেজারের বাস্তব কার্যক্রম ও নথিতে দেখানো কাজের পরিমাণ, জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব এবং খনন করা বালু-পলি অপসারণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নিজস্ব ড্রেজার থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি ড্রেজার ভাড়া এবং মেরামত খাতে ব্যয় নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
আরও পড়ুন: অনিয়ম দুর্নীতিতে জর্জরিত বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশলঃ দুদকে অভিযোগ
এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজন প্রকল্পভিত্তিক নথি পরীক্ষা, ড্রেজিংয়ের আগে ও পরে নদীর গভীরতা পরিমাপ, জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব নিরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও অনুমোদনপ্রক্রিয়া পর্যালোচনা। কারণ, সরকারি অর্থ ব্যয় করে নদী খননের উদ্দেশ্য কাগজে কাজ সম্পন্ন দেখানো নয়; নৌপথে কার্যকর নাব্যতা নিশ্চিত করা।
ড্রেজিং কার্যক্রম নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোর একটি হলো, বাস্তবে খনন করা মাটির পরিমাণ এবং নথিতে দেখানো পরিমাণের মধ্যে অসংগতি থাকতে পারে। নৌযান সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘ভাটায় কাটেন, জোয়ারে মাপেন’—এমন পদ্ধতির কারণে খননকাজের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ লঞ্চমালিক সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজী ওয়াহিদুজ্জামান ড্রেজিংয়ের পরিমাপ ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, আগে ড্রেজিং কার্যক্রমে বিআইডব্লিউটিএর পাশাপাশি লঞ্চমালিকদের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হতো; বর্তমানে সেই অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রে নেই। ফলে কাজের পরিমাণ ও পরিমাপের স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
এখানে মূল প্রশ্ন—খননের আগে নদীর তলদেশের গভীরতা কত ছিল, খনন শেষে কত গভীরতা পাওয়া গেছে এবং সেই অনুযায়ী কত ঘনমিটার মাটি উত্তোলনের হিসাব দেখানো হয়েছে? কাজের পরিমাণ নির্ধারণে কোন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, পরিমাপ কে করেছেন এবং বিল অনুমোদনের আগে তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না—এসব তথ্য জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: চাঁদাবাজির কালো টাকায় কুয়াকাটায় আলিশান পাঁচতলা হোটেল: অন্তরালে থেকে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রে ব্যস্ত নিষিদ্ধ আ.লীগ নেতা শেখর চন্দ্র দাস
পরিমাপ বই, প্রাক্কলন, কাজ সম্পন্নের সনদ এবং ড্রেজিংয়ের আগে-পরে জরিপের তথ্যের মধ্যে অমিল পাওয়া গেলে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। সরকারি অর্থের বিনিময়ে যতটুকু কাজ করার কথা, বাস্তবে ততটুকু কাজ হয়েছে কি না—সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
ড্রেজিং প্রকল্পের ব্যয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত জ্বালানি তেল। একটি ড্রেজার দিনে কত ঘণ্টা চালানো হয়েছে, কত পরিমাণ পলি উত্তোলন করেছে এবং সেই অনুযায়ী কত জ্বালানি ব্যবহার হওয়ার কথা—এসব তথ্য লগবই, জ্বালানি ইস্যু রেজিস্টার, স্টক রেজিস্টার ও বিল-ভাউচারে থাকার কথা।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ড্রেজারের বাস্তব কার্যক্রম এবং জ্বালানি ব্যবহারের হিসাবের মধ্যে অসংগতি থাকতে পারে। এমনকি ড্রেজার কার্যত বন্ধ থাকার পরও সেটি চলেছে বলে নথিভুক্ত করা হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। তবে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নির্দিষ্ট তারিখের লগবই, জ্বালানি সরবরাহের রসিদ, মজুত ও বিতরণের হিসাব এবং ড্রেজারের কার্যক্রমের রেকর্ড মিলিয়ে দেখা জরুরি।
ড্রেজার কত ঘণ্টা চলেছে, সে সময় কত জ্বালানি সরবরাহ করা হয়েছে এবং বাস্তবে কত মাটি উত্তোলন হয়েছে—এই তিনটি তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, তা যাচাই করা গেলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
আরও পড়ুন: কাউখালীতে টেইলার্স ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি
ড্রেজিং বিভাগের একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অনিয়মের প্রতিবাদ করলে বদলি বা বিভাগীয় মামলার ভয় দেখানোর ঘটনাও ঘটতে পারে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন।
জ্বালানি তেলের হিসাব যদি স্বচ্ছ ও নির্ভুল হয়, তাহলে লগবই ও সরবরাহের নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে তা পরিষ্কার করা সম্ভব। আর কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে তার দায় কার, কীভাবে তা ঘটেছে এবং অনুমোদনের স্তরে কারা দায়িত্ব পালন করেছেন—সেসব প্রশ্নের উত্তরও বের করতে হবে।
নদী খননের পর উত্তোলিত বালু ও পলি কোথায় ফেলা হচ্ছে, সেটিও ড্রেজিং কার্যক্রমের কার্যকারিতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে খনন করা বালু বা পলি নির্ধারিত স্থানে অপসারণ না করে নদীর মধ্যেই ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এতে স্রোত ও জোয়ারের প্রভাবে পলি আবার খনন করা এলাকায় ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
যদি উত্তোলিত মাটি যথাযথভাবে অপসারণ করা না হয়, তাহলে একই এলাকায় পুনরায় পলি জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে আবার ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে এবং সরকারি অর্থের ব্যয়ও বাড়তে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে এমন ঘটনা ঘটেছে কি না, তা নির্ধারণে প্রকল্পের নির্ধারিত ডাম্পিং এলাকা, মাটি পরিবহনের রেকর্ড, মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ এবং নদীর তলদেশের জরিপ পরীক্ষা করা জরুরি।
আরও পড়ুন: ‘মায়ের কোলে শিশুরা যেমন নিরাপদ, তেমনি এ সরকারের আমলে সব ধর্মের মানুষ নিরাপদ’ প্রতিমন্ত্রী আহাম্মেদ সোহেল মঞ্জুর এমপি
এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, খনন করা মাটি কোথায় ফেলা হয়েছে, সেই স্থান প্রকল্পের নকশা ও নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না এবং খননের পর নৌপথে যে গভীরতা অর্জনের কথা ছিল, তা বাস্তবে বজায় রয়েছে কি না।
ড্রেজিংয়ের কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও যদি কিছুদিন পর একই স্থানে ডুবোচর ফিরে আসে, তাহলে তার কারণ নির্ধারণে কারিগরি তদন্ত প্রয়োজন। নদীর স্বাভাবিক পলি জমা ও স্রোতের প্রভাব বিবেচনায় নিয়েই খননকাজের মান এবং মাটি অপসারণের পদ্ধতি মূল্যায়ন করতে হবে।
বিআইডব্লিউটিএর নিজস্ব ড্রেজার বহর রয়েছে। এরপরও বিভিন্ন প্রকল্পে বেসরকারি ড্রেজার ভাড়া নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা, ভাড়ার হার এবং ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি ড্রেজার অচল থাকা বা মেরামতের প্রয়োজন দেখানোর কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেসরকারি ড্রেজারের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট সময়ে নিজস্ব ড্রেজারগুলোর কোনগুলো সচল ছিল, কোনগুলো অচল ছিল, অচল থাকার কারণ কী এবং মেরামতের জন্য কত সময় ও অর্থ ব্যয় হয়েছে।
আরও পড়ুন: দুর্গাপূজাকে ঘিরে কুয়াকাটায় লাখো পর্যটকের সম্ভাবনা, ৮০ শতাংশ হোটেল বুকিং
একই সঙ্গে বেসরকারি ড্রেজার ভাড়ার চুক্তি, দরপত্র বা প্রযোজ্য ক্রয়প্রক্রিয়া, কাজের সময়কাল, বাস্তব খননকাজের পরিমাণ, ভাড়ার হার এবং বিল পরিশোধের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কোনো ক্ষেত্রে কাজের বাস্তব পরিমাণের তুলনায় বেশি ঘনমিটার দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে কি না, সেটিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা উচিত।
নিজস্ব ড্রেজার থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি ড্রেজার ভাড়া নেওয়া নিজে থেকেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। কিন্তু কেন ভাড়া নেওয়া হয়েছে, বিকল্প হিসেবে সরকারি ড্রেজার ব্যবহার করা সম্ভব ছিল কি না এবং ব্যয়টি যৌক্তিক ছিল কি না—এসব প্রশ্নের জবাব নথি দিয়ে দিতে হবে।
ড্রেজার মেরামত, যন্ত্রাংশ কেনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কোনো ড্রেজার দীর্ঘ সময় অচল পড়ে থাকার পর মেরামতের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করা হয়। মেরামতের নামে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ কেনা, পুরোনো যন্ত্রাংশ সংস্কার করে নতুন হিসেবে দেখানো অথবা যন্ত্রাংশ কেনার যথাযথ প্রমাণ ছাড়াই বিল পরিশোধের অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে মেরামতের প্রাক্কলন, অনুমোদন, কার্যাদেশ, যন্ত্রাংশ কেনার চালান, গুদামের স্টক রেজিস্টার, কাজ সম্পন্নের সনদ এবং অর্থ পরিশোধের নথি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোন ড্রেজারে কী ধরনের ত্রুটি দেখা দিয়েছিল, কী যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করা হয়েছে, প্রকৃত ব্যয় কত এবং মেরামতের পর ড্রেজারটি কত দিন সচল ছিল—এসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যেমন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পাশে ছিলেন, তেমনি ২০২৪ সালের আন্দোলনেও তাঁরা পাশে ছিলেন : প্রতিমন্ত্রী সোহেল মনজুর
মেরামতের নামে অযৌক্তিক ব্যয় দেখানো হয়ে থাকলে তা সরকারি অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আবার বাস্তব কারিগরি প্রয়োজনের কারণে বড় ব্যয় হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত নথি ও প্রকৌশলগত ব্যাখ্যার মাধ্যমে তা পরিষ্কার করা।
সরকারি ড্রেজার সচল রাখা, সময়মতো মেরামত করা এবং ব্যয়ের যথাযথ হিসাব সংরক্ষণ করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে শুধু বিল অনুমোদনের নথি নয়, মেরামতের বাস্তব ফলাফলও যাচাই করা জরুরি।
দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথের নাব্যতা সংকট শুধু কারিগরি বিষয় নয়; এটি যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ভোলা–লাহারহাট–বরগুনা–আমতলী–পটুয়াখালী–বরিশাল সদরসহ বিভিন্ন রুটে ডুবোচর ও অগভীরতার অভিযোগ থাকায় ড্রেজিং কার্যক্রমের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ লঞ্চমালিক সমিতির সভাপতি আক্কাস সিকদার অভিযোগ করেছেন, প্রতিবছর ড্রেজিং চললেও দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বিষয়টি তদন্ত করে কর্তৃপক্ষের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
নৌযান সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ভাটার সময় পানির গভীরতা কমে যাওয়ায় কোনো কোনো রুটে চলাচলে সমস্যা হয়। কোথাও নৌযানকে জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, কোথাও ডুবোচরের কারণে চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এসব সমস্যা যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ানোর পাশাপাশি নৌযান পরিচালনার সময় ও ব্যয়েও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে নদীতে ডুবোচর দেখা দিলেই তা দুর্নীতির প্রমাণ নয়। নদীর স্বাভাবিক পলি জমা, স্রোত, মৌসুমি পরিবর্তন ও ভৌগোলিক অবস্থাও নাব্যতার ওপর প্রভাব ফেলে। তাই ড্রেজিংয়ের ফলাফল মূল্যায়নে খননের আগে ও পরে নদীর গভীরতা, নির্ধারিত নকশা, প্রকল্পের লক্ষ্য এবং পরবর্তী সময়ে পলি জমার তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
মূল প্রশ্নটি হলো—যে অর্থ ব্যয় করে নৌপথ সচল রাখার কথা, সেই অর্থের বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে কি না। যদি না পাওয়া যায়, তাহলে প্রকল্পের পরিকল্পনা, কাজের মান, তদারকি ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাই করতে হবে।
ড্রেজিং প্রকল্পের পরিকল্পনা, কাজের তদারকি, পরিমাপ, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, মেরামত, বিল যাচাই ও অর্থ ছাড়ের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা যুক্ত থাকতে পারেন। তাই অভিযোগের দায় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা এবং অনুমোদনের নথি যাচাই করা জরুরি।
কে ড্রেজিংয়ের কাজ তদারকি করেছেন, কে খননকৃত মাটির পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন, কে পরিমাপের প্রতিবেদন অনুমোদন করেছেন, কে জ্বালানি ও মেরামত ব্যয়ের বিল যাচাই করেছেন এবং কার অনুমোদনে অর্থ ছাড় হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া দায় নির্ধারণ করা যায় না।
কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। কিন্তু দায়িত্ব পালনকালে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন সামনে আসবে। একইভাবে অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নথিভিত্তিক ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগও থাকা উচিত।
এ কারণে ড্রেজিং কার্যক্রমের প্রকল্পভিত্তিক আর্থিক নিরীক্ষা, ড্রেজারভিত্তিক জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব যাচাই, বেসরকারি ড্রেজার ভাড়ার চুক্তি পর্যালোচনা এবং ড্রেজিংয়ের আগে-পরে নদীর গভীরতা স্বাধীনভাবে পরিমাপের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বর্তমান কার্যক্রম স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগে কী হয়েছে সে বিষয়ে তিনি অবগত নন; ভবিষ্যতে ড্রেজিং কার্যক্রমে বিআইডব্লিউটিএ ও লঞ্চমালিকদের একজন করে প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, বরিশাল নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক জানিয়েছেন, বিভিন্ন স্থানে ডুবোচরের বিষয়ে লঞ্চমালিকরা তাঁদের অবহিত করেছেন এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। শিগগির এসব স্থানে ড্রেজিংয়ের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলেও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তবে ড্রেজিংয়ের পরিমাপ, জ্বালানি তেলের হিসাব, মাটি অপসারণ, বেসরকারি ড্রেজার ভাড়া ও মেরামত ব্যয় নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর প্রতিটির বিষয়ে বিস্তারিত লিখিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, প্রকল্পের নথি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা পাশাপাশি যাচাই করা গেলে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে নদীপথ কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন, যাত্রী চলাচল এবং দৈনন্দিন যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। তাই নৌপথ সচল রাখতে সরকারি অর্থ ব্যয় হলে তার বাস্তব সুফল নিশ্চিত করা জরুরি।
ড্রেজিংয়ের পরও যদি একই এলাকায় বারবার ডুবোচর দেখা দেয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কার্যকারিতা ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, আর্থিক ও কারিগরি নিরীক্ষা, জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব পরীক্ষা, ড্রেজার ভাড়ার চুক্তি পর্যালোচনা এবং খননের আগে-পরে নদীর গভীরতা প্রকাশ।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি—ড্রেজিং কার্যক্রমের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক; আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে নথি ও তথ্যের মাধ্যমে তা পরিষ্কার করা হোক।
শেষ প্রশ্ন একটাই—ড্রেজিংয়ে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে নাব্যতা সংকট কেন থেকে যাচ্ছে? কাজের পরিমাণ, জ্বালানি ব্যয়, মাটি অপসারণ, বেসরকারি ড্রেজার ভাড়া ও মেরামতের হিসাব কতটা স্বচ্ছ? এসব প্রশ্নের জবাব দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
তালাশ বিডি—সত্যের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন