১২:৫৮ পি.এম
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অভিব্যক্তি জানিয়েছেন, রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে নিজস্ব অর্থায়ননির্ভর অর্থনীতিতে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। তিনি উল্লেখ করেন, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করতে হলে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতির যৌক্তিকীকরণ, কর ফাঁকি ও পরিহার রোধ এবং পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন নিশ্চিত করা হবে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এ দেওয়া বক্তব্যের অংশ হিসেবে তিনি এসব বলেছেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব সম্মেলন কেবল রাজস্ব আদায়ের হিসাব-নিকাশের সম্মেলন নয়, বরং এটি জাতীয় ঐকমত্য গঠনের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে। কীভাবে নিজস্ব অর্থায়নে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা যায়, সেই পথ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আরও পড়ুন: ঢামেকে অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘটে মরদেহ পরিবহনে বিপাকে স্বজনরা, রোগীরাও ভোগান্তিতে
তিনি চিন্তাভাবনা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার অন্যতম বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হলো অত্যন্ত কম কর-জিডিপি অনুপাত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। এই হার বিশ্বের অন্যতম নিম্ন। ২০২৩ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে গড় কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশের মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ ছিল।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ বিষয়ে আরো বলেন, অর্থনীতির আকার বেড়ে গেলেও রাষ্ট্রের রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা সে অনুযায়ী বেড়ে উঠেনি। এই ব্যবধান দূর করার জন্য শুধুমাত্র বিদ্যমান করদাতাদের ওপর করের বোঝা বাড়ানো হবে না, বরং করের আওতা বাড়াতে হবে, কর অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণ হবে, কর ফাঁকি ও পরিহার বন্ধ হতে হবে এবং অটোমেশনের মাধ্যমে করদাতাদের কমপ্লায়েন্স বাড়াতে মনোযোগ দিতে হবে।
রাজস্ব প্রশাসনে সরকারের নেওয়া সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুরোনো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অর্থাৎ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ভেঙে দুইটি স্বতন্ত্র এবং স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথম প্রতিষ্ঠান হবে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং দ্বিতীয়টি হবে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব নীতি বিভাগটি সরকারের একটি ‘থিংক ট্যাংক’ হিসেবে কাজ করবে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের দ্বারা একটি ভারসাম্যপূর্ণ, প্রতিযোগিতামূলক ও উন্নয়নবান্ধব কর কাঠামো তৈরি হবে। এরপর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ একটি ‘অ্যাকশন টিম’ হিসেবে রাজস্ব আদায় করবে এবং দেশপ্রেমিক নাগরিকদের দায়িত্ব পালন করবে।
তিনি আরো জানালেন, কর প্রদান প্রক্রিয়াকে সহজ করা এবং আইন প্রয়োগের যথাযথ দায়িত্ব পালনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। নীতি প্রণয়নে অর্থনীতিবিদ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, গবেষক এবং শিল্প-বাণিজ্য সংগঠনের বিশেষজ্ঞদের মতামত গুরুত্বের সাথে নেওয়া হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে আমির খসরু বলেন, এ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ৪৬ শতাংশ বেশি। এই লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী হলেও তা ইচ্ছাকৃতভাবে ধার্য করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে এগোতে চাচ্ছে। উন্নয়নের অর্থায়ন নিজেদের সম্পদ দিয়েই করতে হবে।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারে তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানিয়ে তিনি বলেন, এগুলো হলো আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ ও অংশীদারিত্ব। এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া করদাতাদের কর্মকর্তাদের কাছে যাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করা হবে।
তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো একটি সম্পূর্ণ ‘কন্টাক্ট-ফ্রি’ এবং ‘ফেসলেস’ রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলা। ইতোমধ্যে ই-ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট, আসিকুডা ওয়ার্ল্ড, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো এবং আধুনিক স্ক্যানিং পদ্ধতির মতো বিভিন্ন ব্যবসাবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ও কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ রসায়নের অংশ। সরকার ব্যবসায়ীদের জন্য রাস্তা নয়, বরং প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে চায়। তবে ব্যবসায়ীদের সময়মতো কর ও ভ্যাট পরিশোধ করে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহযোগিতা করতে হবে।
তিনি সতর্ক করেন যে, যারা রাজস্ব পরিহারের সংস্কৃতিতে থাকবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ করা হবে। এর ফলস্বরূপ সৎ করদাতারা যাতে নিরুৎসাহিত না হন, সেটাও নিশ্চিত করা হবে।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাসের চাপায় সিএনজি যাত্রী নিহত, আহত ৪
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাহসী নেতৃত্বের মাধ্যমে রাজস্ব খাতের এই সংস্কার সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ আর ঋণের ওপর নির্ভরশীল দেশ থাকবে না, বরং নিজস্ব অর্থায়নে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, ২০২৯ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের চ্যালেঞ্জ অতিক্রম ও ২০৩৪ সালে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ সফল হবে, ইনশাআল্লাহ।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন