সোমবার, ১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং
০৯:১৭ পি.এম
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রধান কার্যালয় রাজস্ব ভবনে বহিরাগতদের প্রবেশ বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এনবিআর ভবনে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দাপ্তরিক পরিচয়পত্র ব্যবহার করে প্রবেশের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) এনবিআরের বোর্ড প্রশাসন (এস্টেট শাখা) থেকে এই বিষয়ে জরুরি নোটিশ জারি করা হয়। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) থেকে এই নির্দেশনা কার্যকর হবে।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্ব ভবনে বহিরাগতদের প্রবেশের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি করেছে। এই অবস্থায়, এনবিআর এবং ভবনের অন্যান্য দপ্তরে কর্মরত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে রাজস্ব ভবনে প্রবেশের জন্য দাপ্তরিক পরিচয়পত্র ব্যবহার করতে হবে।
রাজস্ব ভবনে এনবিআরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ও দপ্তরের অফিস রয়েছে। এর মধ্যে সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি), আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট, বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ), আন্তর্জাতিক কর ইউনিট এবং বিভিন্ন কর আপিল অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই ভবনে এনবিআরের বাইরের কিছু দফতর ও ট্রাইব্যুনালের অফিসও অবস্থিত।
নোটিশ অনুযায়ী, রাজস্ব ভবনে কর্মরত এসব দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ভবনে প্রবেশ করতে হবে। এনবিআর মনে করছে, এর মাধ্যমে কর্মকর্তাদের এবং বহিরাগতদের আলাদা করে চিহ্নিত করা সহজ হবে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বিভিন্ন পরিচয়ে বহিরাগতদের রাজস্ব ভবনে প্রবেশের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ভবনে আসছেন, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় জটিলতা সৃষ্টি করছে।
এনবিআরের নতুন চেয়ারম্যান আহসান হাবিব দায়িত্ব গ্রহণের পর তাকে শুভেচ্ছা জানাতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের ভিড়ের কারণে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। চেয়ারম্যানকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর প্রবণতাও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
এছাড়া, বিভিন্ন ব্যাচের এনবিআর কর্মকর্তাদের একসঙ্গে এসে চেয়ারম্যানকে শুভেচ্ছা জানানোর বিষয়টিও বন্ধ করা হয়েছে। অফিস চলাকালে অনুমতি ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থল ত্যাগ না করার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
তবে এসব পদক্ষেপের পরও রাজনৈতিক বা অন্যান্য পরিচয় ব্যবহার করে বহিরাগতদের প্রবেশ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জন্যও পোশাক বা বাহ্যিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বহিরাগতদের আলাদা করে চিহ্নিত করা সব সময় সম্ভব হচ্ছিল না।
এই পরিস্থিতিতে, রাজস্ব ভবনে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাপ্তরিক পরিচয়পত্র ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব (এস্টেট) মো. রমিজ উদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত নোটিশটি এনবিআরের সকল সদস্য, বিভিন্ন কর অঞ্চল ও ইউনিটের প্রধান, আপিল ট্রাইব্যুনাল, সিআইসি, বৃহৎ করদাতা ইউনিট, আন্তর্জাতিক কর ইউনিটসহ রাজস্ব ভবনে থাকা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে পাঠানো হয়েছে।
নোটিশের অনুলিপি এনবিআর চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব, সদস্য (বোর্ড প্রশাসন) এবং প্রথম সচিব (বোর্ড প্রশাসন)-এর কাছেও পাঠানো হয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ময়মনসিংহের দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার জমি সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিরোধের ফলস্বরূপ মো. মোজাম্মেল হোসেন (২৪) নামের এক যুবককে শ্বাসরোধ ও অ-কোষে আঘাত করে হত্যা করার অভিযোগ তার পরিবার করেছে। এই ঘটনা ঘটে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে, উপজেলার দত্তেরবাজার ইউনিয়নের বিরই নদীরপাড় এলাকায়।
পুলিশ এবং নিহতের পরিবারের সূত্র অনুযায়ী, একই গ্রামের প্রতিবেশী মো. আব্দুস সাত্তার ও মো. সোহরাব গংদের সঙ্গে মো. মোজাম্মেলের পরিবারের জমিজমা এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। সেই বিরোধের কারণে রোববার রাতে মো. মোজাম্মেলকে তার বসতঘরে শ্বাসরোধ করে এবং শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। নিহতের চাচা মো. হালিম উদ্দিন জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বিরই তালুকদার বাড়ির সংলগ্ন এলাকায় মো. আব্দুস সাত্তার গংরা মো. মোজাম্মেলের বাবা মো. আজিম উদ্দিনকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে আহত করে।
এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ করা হলেও এখনও মামলা রুজু হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। পাগলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, নিহতের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের ৮ম তলায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টার দিকে এ আগুনের সূত্রপাত ঘটে।
আগুন লাগার পর হাসপাতালের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের স্বজনরা দ্রুত তাদের হাসপাতালের বাইরে বের করে আনতে থাকেন। এ সময় পুরো হাসপাতাল ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়।
ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। জানা গেছে, ফায়ার সার্ভিসের ৪টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে আগুন লাগার তাৎক্ষণিক কারণ সম্পর্কে জানা যায়নি।
আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার পর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
পিরোজপুরের নাজিরপুরে ১২ বছর বয়সী নিজের সন্তানকে ধর্ষণের অভিযোগে ৪০ বছর বয়সী অহিদুল মোল্লা নামের এক বাবাকে স্থানীয় জনতা গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে।
এটি সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নাজিরপুর উপজেলার মাটিভাঙ্গা ইউনিয়নের বইবুনিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘটে। অভিযুক্ত অহিদুল মোল্লা পেশায় অটোচালক। তিনি বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার ডোবাতলা গ্রামের ফজর আলীর ছেলে, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বইবুনিয়া সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পে তার পরিবারসহ বসবাস করছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অহিদুলের প্রথম স্ত্রী কয়েক বছর আগে আত্মহত্যা করেন। সেই সংসারে তার জমজ দুই ছেলে এবং ১২ বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে। মেয়েটি স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়াশোনা করছে। অহিদুল পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিয়ে করলেও তার দ্বিতীয় স্ত্রী বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। ফলে তিন সন্তানকে নিয়ে তিনি একাই ওই ঘরে থাকতেন।
অভিযোগ উঠেছে, গত ৬ মাস ধরে অহিদুল ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজের সন্তানকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে আসছিলেন। দুই মাস আগে বিষয়টি তার দাদীকে জানানো হলেও তিনি চেপে যেতে বলেন এবং অহিদুল মেয়েটিকে প্রাণনাশের হুমকি দেন। নির্যাতনের মাত্রা সহ্য করতে না পেরে সোমবার সকালে শিশুটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের কাছে সব খুলে বলে। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। দুপুরে অহিদুল বাড়ি ফিরলে স্থানীয়রা তাকে চাপ দিলে সে নিজের অপরাধ স্বীকার করে। এর ফলে উপস্থিত জনতা তাকে গণধোলাই দেয়।
খবর পেয়ে নাজিরপুর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত অবস্থায় অহিদুলকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। একই সাথে ভুক্তভোগী শিশুটিকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে নাজিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম জানান, অভিযুক্তকে চিকিৎসা শেষে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং ভুক্তভোগী শিশুকে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে এবং দোষীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
রাজশাহীর আম, টাঙ্গাইলের শাড়ি, সিলেটের চা, রংপুরের শতরঞ্জি, কুমিল্লার খাদি কিংবা সিলেট-ঝালকাঠির শীতলপাটি—বাংলাদেশের গ্রাম ও জনপদের নামের সঙ্গে মিশে আছে এসব পণ্যের গৌরবময় পরিচয়। প্রজন্মের পর প্রজন্মের দক্ষতা, মেধা, ঐতিহ্য আর সৃজনশীলতায় গড়ে ওঠা এসব পণ্য শুধু মানুষের জীবিকা নয়, দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ। তবে, সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনেক পণ্য এখনো স্থানীয় বাজারের গণ্ডি পেরোতে পারেনি। দুর্বল বাজারব্যবস্থা, আধুনিক নকশা ও মান নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি, অপর্যাপ্ত প্যাকেজিং-ব্র্যান্ডিং, অর্থায়ন সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দুর্বল সংযোগের কারণে উৎপাদকরা পাচ্ছেন না ন্যায্য মূল্য। এবার সেই বাস্তবতা বদলাতে গ্রামকে শুধু উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, উদ্যোক্তা, শিল্প, সৃজনশীলতা ও বাজারের সমন্বিত অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ মডেলটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্থানীয় পণ্যের পুরোনো পরিচয়কে নতুন ব্র্যান্ডে, গ্রামীণ কারিগরকে উদ্যোক্তায় এবং গ্রামের উৎপাদনকে জাতীয় ও বিশ্ববাজারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রথমবারের মতো সৃজনশীল অর্থনীতিকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে এ কর্মসূচিকে বৃহত্তর ক্রিয়েটিভ ইকোনমি কাঠামোর অংশ করা হয়েছে। সরকারি পরিকল্পনায় ঐতিহ্যবাহী ও সৃজনশীল পণ্য চিহ্নিত করে সেগুলোর মানোন্নয়ন, আধুনিক ডিজাইন, বাজার সম্প্রসারণ ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বাজেটে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির জন্য সরাসরি ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে কর্মসূচির পাইলট পর্যায়ে শীতলপাটি, শতরঞ্জি, তাঁত, মৃৎশিল্প ও বুনন শিল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ধাপে ধাপে দেশের বিভিন্ন গ্রামের সম্ভাবনাময় একটি পণ্যকে ব্র্যান্ডে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, কর্মসূচিটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় প্রায় ৭৫ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেনের দৃষ্টিতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানকে যুক্ত করা জরুরি। অর্থাৎ ‘এক গ্রাম এক পণ্য’কে শুধু কারুশিল্পের প্রকল্প হিসেবে না দেখে প্রান্তিক মানুষের আয়, কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতার বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করাই হবে এর বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির অবদান জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ নামে একটি জাতীয় ব্র্যান্ড গড়ে তোলার লক্ষ্যও রয়েছে। তিনি বলেন, কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো ভ্যালু চেইন কতটা শক্তিশালী করা যায় তার ওপর। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে আন্তর্জাতিক মানের কাঁচামাল, পণ্যের নকশা, মান সনদ, প্যাকেজিং, জিআই ও কপিরাইট সুরক্ষা, ই-কমার্স, নির্ভরযোগ্য লজিস্টিকস এবং সরাসরি বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ উদ্যোগটি শিগগিরই চালু করার কাজ চলছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্র এখন শুধু ঢাকা বা বড় শহর নয়; গ্রামকেও অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করে তোলাই লক্ষ্য। তিনি বলেন, একটি গ্রামের প্রকৃত উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা বা অবকাঠামো তৈরি নয়—প্রতিটি পরিবারের কল্যাণ, শিশুদের শিক্ষা, যুবকদের কর্মসংস্থান, নারীর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য এবং পরিবারের স্থায়ী আয়-রোজগারের সুযোগ তৈরি করা।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন—‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ মানে শুধু একটি পণ্য উৎপাদন নয়; একটি স্থানীয় অর্থনৈতিক পরিচয়কে টেকসই ব্যবসায়িক শক্তিতে রূপান্তর করা। তাঁর বিশ্লেষণে, বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে কাঁচামাল, দক্ষতা, ঐতিহ্য ও উৎপাদনের ভিত্তি আগে থেকেই রয়েছে। সমস্যা হচ্ছে এগুলো বিচ্ছিন্ন। কোথাও একজন তাঁতি কাপড় তৈরি করছেন, অন্যজন রং করছেন, কেউ প্যাকেজিং করছেন, আবার অন্য কেউ বাজারে বিক্রি করছেন। ফলে উৎপাদক কম দাম পাচ্ছেন, অথচ ভোক্তাকে দিতে হচ্ছে বেশি।
সাকিফ শামীমের মতে, এ ব্যবধান কমাতে পণ্যভিত্তিক ক্লাস্টার গড়ে তুলতে হবে। একই এলাকায় কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ, পরিবহণ ও বিপণনকে একটি ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে। স্থানীয় উৎপাদক ও উদ্যোক্তাকে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রেখে সরকারকে সহায়ক ভূমিকা নিতে হবে। তাঁর প্রস্তাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো- ডিজিটাল অর্থনৈতিক পরিচয়। উৎপাদন, বিক্রি, লেনদেন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের তথ্যের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার বিকল্প ক্রেডিট প্রোফাইল তৈরি করা গেলে জামানতনির্ভর ঋণের বাইরে গিয়ে ক্যাশ ফ্লো ভিত্তিক অর্থায়নের সুযোগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। সাকিফ শামীম আরও বলেন, 'এক গ্রাম এক পণ্য’ তাই কোনো সাধারণ প্রকল্প নয়। এটি সফল হলে গ্রাম শুধু কৃষি বা শ্রমের উৎস থাকবে না; গ্রাম হয়ে উঠবে উৎপাদন, উদ্যোক্তা, ডিজাইন, প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও বাজারের সমন্বিত অর্থনৈতিক কেন্দ্র। গ্রামের শীতলপাটি, শতরঞ্জি, তাঁত, মৃৎশিল্প কিংবা বুনন যদি ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ পরিচয়ে বিশ্ববাজারে জায়গা করে নেয়, তাহলে তার সুফল শুধু একটি পণ্যের বিক্রিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাড়বে আয়, তৈরি হবে কর্মসংস্থান, সংরক্ষিত হবে ঐতিহ্য এবং নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রাম হয়ে উঠবে সম্ভাবনার জায়গা। গ্রাম থেকে বাজার, বাজার থেকে জাতীয় ব্র্যান্ড, আর জাতীয় ব্র্যান্ড থেকে বিশ্ববাজার—এই পথ তৈরি করাই এখন ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ কর্মসূচির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করতে ফাউন্ডেশন ইতোমধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাধিক চুক্তি করেছে। রিভলভিং ফান্ডের মাধ্যমে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উদ্যোক্তারা ১ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পেতে পারেন, সুদের হার ৮ শতাংশ। নারী, প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ বাস্তবায়নে এসএমই ফাউন্ডেশনের বিদ্যমান অর্থায়ন কাঠামোকে গ্রামভিত্তিক উৎপাদন ক্লাস্টারের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে উদ্যোক্তাদের বড় একটি বাধা দূর হতে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে-এ পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত অংশ হলো পূর্বাচলে ১৬০ একর জমিতে একটি বিশ্বমানের সেন্ট্রাল ক্রিয়েটিভ হাব প্রতিষ্ঠা। এর পাশাপাশি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আঞ্চলিক ক্রিয়েটিভ হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব হাবে পণ্যের প্রদর্শনী, বিপণন, প্রশিক্ষণ, ডিজাইন উন্নয়ন ও বাজারসংযোগের সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে।
এক গ্রাম, এক পণ্য নিয়ে সিএসইআর-এর বিশ্লেষণ। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর) এর চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ সাকিফ শামীম "এক গ্রাম এক পণ্য" নিয়ে সম্প্রতি সংস্থাটির বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। ওই বিশ্লেষণে তিনি বলেন, রাজশাহীর আম, টাঙ্গাইলের শাড়ি, সিলেটের চা, নরসিংদীর তাঁতবস্ত্র, রংপুরের শতরঞ্জি, কুমিল্লার খাদি কিংবা বগুড়ার দই—বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের পরিচয় বহুদিনের। এসব পণ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, দক্ষতা এবং মানুষের জীবিকা। কিন্তু বিচ্ছিন্ন এই স্থানীয় পরিচয়গুলো এখনো একটি সমন্বিত জাতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়নি। ফলে যে পণ্য একটি গ্রামের মানুষের জীবিকার ভিত্তি হতে পারে, সেটিই বৃহত্তর বাজারে গিয়ে অনেক সময় হারিয়ে যায় দুর্বল বিপণন, অনুন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ, মধ্যস্বত্বভোগী এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে। প্রশ্ন হলো, এই স্থানীয় পরিচয়গুলোকে আমরা কতটা বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে পেরেছি? প্রায় একই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিল জাপানও। ১৯৭৯ সালে জাপানের ওইতা প্রিফেকচারে গভর্নর মোরিহিকো হিরামাতসু ‘One Village, One Product’ বা OVOP আন্দোলন শুরু করেন। লক্ষ্য ছিল স্থানীয় মানুষকে তাদের নিজস্ব সম্পদ, দক্ষতা ও ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে এমন পণ্য ও উদ্যোগ গড়ে তোলা, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বৃহত্তর বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
OVOP-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল একটি স্থানীয় অর্থনৈতিক পরিচয়কে টেকসই ব্যবসায়িক শক্তিতে রূপান্তর করা। স্থানীয় মানুষ সিদ্ধান্ত নেবে তাদের এলাকার সম্ভাবনা কোথায়, আর সরকার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সহায়তা করবে দক্ষতা উন্নয়ন, অর্থায়ন, অবকাঠামো, ব্র্যান্ডিং ও বাজার সংযোগে। অর্থাৎ উৎপাদনের ভিত্তি থাকবে স্থানীয়, কিন্তু বাজারের দৃষ্টিভঙ্গি হবে বৈশ্বিক। এই ধারণা পরবর্তী সময়ে জাপানের বাইরেও বিভিন্ন দেশে অনুসরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এর শিক্ষা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আমাদের গ্রামগুলোতে ইতিমধ্যে রয়েছে অসংখ্য পণ্য, কারিগরি দক্ষতা, কৃষিভিত্তিক সম্পদ ও ঐতিহ্য। আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ নতুন করে সম্ভাবনা তৈরি করা নয়; বরং বিদ্যমান সম্ভাবনাকে সংগঠিত করে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই OVOP-এর প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বিদ্যমান। ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ মানে প্রশাসন বসে প্রতিটি গ্রামের জন্য একটি পণ্য নির্ধারণ করে দেবে, এমন ব্যবস্থা হলে এর মূল দর্শনই নষ্ট হয়ে যাবে। কোন এলাকায় কী উৎপাদনের দক্ষতা রয়েছে, কী ধরনের কাঁচামাল সহজলভ্য, স্থানীয় বাজারের চাহিদা কী, উৎপাদনের ঐতিহ্য কতটা শক্তিশালী এবং বৃহত্তর বাজারে সেই পণ্যের সম্ভাবনা কতটা—এসব বিবেচনায় নিয়ে পণ্য নির্বাচন করতে হবে। সিদ্ধান্তের কেন্দ্র হতে হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও উদ্যোক্তা; সরকারকে হতে হবে সহায়ক শক্তি।
এই পদ্ধতির প্রয়োজন বাংলাদেশের বাস্তবতায় আরও বেশি। আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি এখনো বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র উৎপাদক ও উদ্যোক্তার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এদের বড় অংশ বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করেন। একজন তাঁতি কাপড় তৈরি করেন, অন্য কেউ রং করেন, কেউ প্যাকেজিং করেন, আরেকজন বাজারে বিক্রি করেন। কৃষিপণ্যেও একই চিত্র দেখা যায়। উৎপাদন আছে, কিন্তু উৎপাদনের সঙ্গে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ, ব্র্যান্ডিং, লজিস্টিকস ও বাজার সংযোগের সমন্বিত ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল।
গ্রামের উৎপাদক তার পণ্যের তুলনামূলক কম মূল্য পান, অথচ চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে সেই পণ্য অনেক বেশি দামে পৌঁছায়। উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝের এই মূল্য ব্যবধানের বড় অংশ তৈরি হয় দুর্বল value chain-এর কারণে। ফলে ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ উদ্যোগের লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট পণ্য উৎপাদন বাড়ানোতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; লক্ষ্য হতে হবে সেই পণ্যের পুরো value chain-কে শক্তিশালী করা।
একটি পণ্যকে কেন্দ্র করে কার্যকর cluster তৈরি করা গেলে এই পরিবর্তন সম্ভব। একই এলাকায় কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। এতে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি পণ্যের মান, সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও বাড়ানো সম্ভব। তবে উৎপাদন ও বাজারের মাঝের এই ব্যবধান দূর করতে অর্থায়ন ব্যবস্থারও পরিবর্তন প্রয়োজন। গ্রামের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন এখনো বড় বাধা। প্রচলিত ব্যাংক ঋণ অনেক সময় জামানত, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং পূর্ববর্তী আর্থিক ইতিহাসের ওপর নির্ভরশীল। অথচ একজন ক্ষুদ্র উৎপাদক বা নারী উদ্যোক্তার হয়তো বড় সম্পদ নেই, কিন্তু তার নিয়মিত উৎপাদন রয়েছে, বিক্রি রয়েছে এবং বাজারে তার পণ্যের চাহিদা রয়েছে।
এখানে উৎপাদন ও লেনদেনের তথ্যভিত্তিক বিকল্প credit assessment গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একজন উদ্যোক্তার ডিজিটাল অর্থনৈতিক পরিচয়ের মাধ্যমে তার উৎপাদন, বিক্রি, লেনদেন, প্রশিক্ষণ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে ধীরে ধীরে তার একটি বিকল্প credit profile তৈরি হতে পারে। এর ভিত্তিতে জামানতনির্ভর ঋণের বাইরে গিয়ে কার্যক্রম ও cash flow-ভিত্তিক অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
তবে ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরি করলেই অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হবে না। গ্রামের অনেক উদ্যোক্তার এখনো পর্যাপ্ত ডিজিটাল দক্ষতা, স্মার্টফোন বা নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ নেই। ফলে ডিজিটাল অর্থনীতির দরজা খুলতে হলে তার সঙ্গে প্রশিক্ষণ, স্থানীয় সহায়তা কেন্দ্র এবং সহজ ব্যবহারযোগ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি যেন নতুন কোনো প্রবেশ বাধা তৈরি না করে, সেটিও নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রাখতে হবে।
এই কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিপুলসংখ্যক নারী ঘরে বসে পোশাক, হস্তশিল্প, খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত। কিন্তু তাঁদের বড় অংশ আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক কাঠামোর বাইরে থাকেন। উৎপাদন করেন, কিন্তু উদ্যোক্তা হিসেবে নিবন্ধিত হন না; আয় করেন, কিন্তু সেই আয়ের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংকিং সুবিধা বা ব্যবসায়িক ঋণ পাওয়ার সুযোগ সীমিত।
‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ কাঠামোর মধ্যেই নারীদের জন্য একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক স্তর তৈরি করা যেতে পারে। নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠিত করতে গ্রামভিত্তিক Women Economic Yard বা অনুরূপ সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে প্রশিক্ষণ, উৎপাদন সংগঠন, সংগ্রহ, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং, ব্যাংকিং সংযোগ এবং ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকতে পারে।
তবে নারীদের জন্য আলাদা একটি প্রকল্প তৈরি করে জাতীয় OVOP কাঠামোর বাইরে রাখা সমাধান নয়। বরং একই ডিজিটাল পরিচয়, একই বাজার অবকাঠামো এবং একই value chain-এর মধ্যে নারীদের জন্য বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে একই উদ্যোক্তার জন্য একাধিক নিবন্ধন ও আলাদা তথ্যভাণ্ডার তৈরির ঝুঁকি কমবে এবং জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত উদ্যোক্তা ডেটাবেস গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদনের চেয়ে বাজারে বেশি। একটি ভালো পণ্য তৈরি করলেই তার ক্রেতা তৈরি হয় না। আধুনিক packaging, product design, branding, certification, ডিজিটাল বিপণন এবং নির্ভরযোগ্য delivery system প্রয়োজন। একটি স্থানীয় পণ্যকে জাতীয় ব্র্যান্ডে পরিণত করতে হলে এসব বিষয়কে উৎপাদন ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এখানে দেশের বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, খুচরা বিক্রেতা, e-commerce platform, রপ্তানিকারক এবং corporate buyer-দের সঙ্গে গ্রামীণ producer cluster-এর সরাসরি সংযোগ তৈরি করা যেতে পারে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি উৎপাদক দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতা ও বাজার সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা পাবেন। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি private sector-এর বাজার, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সক্ষমতাকে কাজে লাগানো গেলে OVOP-এর অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
রপ্তানির ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। ‘Village to Global’ একটি আকর্ষণীয় ধারণা হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে হলে পণ্যের মান, নিরাপত্তা, সার্টিফিকেশন, প্যাকেজিং, সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং ক্রেতার আস্থা নিশ্চিত করতে হয়। কোনো পণ্য স্থানীয় বাজারে জনপ্রিয় হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে রপ্তানিযোগ্য হয়ে যায় না। তাই রপ্তানির প্রস্তুতি শুরু করতে হবে উৎপাদনের প্রথম ধাপ থেকেই। এই কারণে প্রথম পর্যায়েই দেশের হাজার হাজার গ্রামকে নিবন্ধনের আওতায় আনার চেয়ে সম্ভাবনাময় কয়েকটি cluster-কে গভীরভাবে গড়ে তোলা বেশি কার্যকর হতে পারে। কোন পণ্য কোথায় ভালো করছে, কোথায় কাঁচামালের সুবিধা রয়েছে, কোথায় উদ্যোক্তার ভিত্তি শক্তিশালী এবং কোন পণ্যের জাতীয় বা আন্তর্জাতিক বাজার সম্ভাবনা রয়েছে, তা যাচাই করে pilot cluster নির্বাচন করা যেতে পারে। সেই অভিজ্ঞতা ও ফলাফল বিশ্লেষণ করে ধাপে ধাপে দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা উচিত।
এখানে আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন আসে নেতৃত্ব ও সমন্বয় নিয়ে। ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতের ভূমিকা থাকবে। কিন্তু অংশীদারের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব অস্পষ্ট হয়ে গেলে প্রকল্পের গতি কমে যেতে পারে। তাই শুরুতেই একটি সুস্পষ্ট national governance framework প্রয়োজন। কে নীতি নির্ধারণ করবে, কে বাস্তবায়ন করবে, কে অর্থায়ন করবে এবং কে ফলাফল পরিমাপ করবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।
সরকারের ভূমিকা এখানে উদ্যোক্তার জায়গা নেওয়া নয়, বরং একটি enabling environment তৈরি করা। সরকার প্রতিটি গ্রামের ব্যবসা পরিচালনা করবে না। বরং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ, অর্থায়নের সুযোগ, বাজার সংযোগ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করবে। পণ্য ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের মালিকানা থাকবে স্থানীয় উদ্যোক্তা ও জনগোষ্ঠীর হাতে। একই সঙ্গে private sector-কে এই উদ্যোগের কেন্দ্রীয় অংশীদার করতে হবে। ব্যাংক অর্থায়ন দিতে পারে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি করতে পারে, বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাজার দিতে পারে, রপ্তানিকারক আন্তর্জাতিক ক্রেতার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারে এবং logistics প্রতিষ্ঠান সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারে। এভাবে OVOP সরকারি উদ্যোগ থেকে বেরিয়ে একটি public-private economic platform-এ পরিণত হতে পারে।
সাফল্যের মাপকাঠিও তাই নতুনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কতটি গ্রাম নিবন্ধিত হয়েছে, কতজন উদ্যোক্তা database-এ যুক্ত হয়েছেন কিংবা কতটি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, এসব সংখ্যা কার্যক্রমের পরিমাণ বোঝায়; অর্থনৈতিক সাফল্য নয়। প্রকৃত সাফল্য মাপতে হবে উদ্যোক্তার আয় কতটা বেড়েছে, কতটি স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, কতটি cluster দীর্ঘমেয়াদে টিকে আছে, কতটি পণ্য জাতীয় বাজারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কতজন উদ্যোক্তা নিয়মিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এসেছেন এবং কতটি পণ্য রপ্তানির পর্যায়ে পৌঁছেছে তার মাধ্যমে।
বাংলাদেশের সামনে এখন এমন একটি সময় এসেছে যখন গ্রামীণ অর্থনীতিকে কৃষি ও ক্ষুদ্র উৎপাদনের বিচ্ছিন্ন পরিসর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গ্রামকে উৎপাদন, উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও বাজারের একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক ইউনিট হিসেবে দেখতে হবে। একটি গ্রামের নিজস্ব পণ্যকে ঘিরে যদি একটি পূর্ণাঙ্গ economic ecosystem তৈরি করা যায়, তাহলে সেখানে কর্মসংস্থান, আয় এবং স্থানীয় বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য শহরমুখী হওয়ার চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামের জন্য একই ধরনের নীতি কাজ করবে না। কোনো গ্রাম কৃষিপণ্যে শক্তিশালী, কোনো গ্রাম তাঁত বা হস্তশিল্পে, কোনো গ্রাম খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে, আবার কোনো গ্রাম পর্যটন বা সেবাভিত্তিক অর্থনীতিতে সম্ভাবনাময় হতে পারে। তাই OVOP-এর বাংলাদেশি সংস্করণকে হতে হবে নমনীয়, স্থানীয় বাস্তবতাভিত্তিক এবং বাজারমুখী।
‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ তাই কোনো স্লোগান বা স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর সম্ভাবনা নষ্ট হবে। এটি হতে পারে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করার একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো। এর সাফল্য নির্ভর করবে আমরা কতটা স্থানীয় মালিকানা নিশ্চিত করতে পারছি, কতটা কার্যকর value chain গড়ে তুলতে পারছি এবং কত দ্রুত উৎপাদককে অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে পারছি তার ওপর। জাপানের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে, একটি গ্রামের নিজস্ব শক্তিকে কেন্দ্র করে একটি টেকসই অর্থনৈতিক পরিচয় তৈরি করা সম্ভব। বাংলাদেশের কাজ হবে সেই ধারণাকে হুবহু অনুকরণ করা নয়; বরং দেশের নিজস্ব সম্পদ, জনশক্তি, উদ্যোক্তা সংস্কৃতি এবং বাজার বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে একটি কার্যকর বাংলাদেশি OVOP model তৈরি করা।
গ্রাম থেকে বাজার, বাজার থেকে জাতীয় ব্র্যান্ড এবং জাতীয় ব্র্যান্ড থেকে বিশ্ববাজার—এই পথ তৈরি করতে হলে প্রথমে উৎপাদককে শক্তিশালী করতে হবে। ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ সফল হলে এর সবচেয়ে বড় অর্জন হবে কোনো একটি পণ্যের বিক্রি বাড়া নয়; বরং বাংলাদেশের গ্রামীণ মানুষকে উৎপাদক থেকে উদ্যোক্তা এবং স্থানীয় কারিগরকে জাতীয় অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদারে রূপান্তর করা।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরবর্তী অধ্যায় যদি আরও বিস্তৃত, কর্মসংস্থাননির্ভর এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হয়, তবে সেই অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে আমাদের গ্রাম। আর প্রতিটি গ্রামের নিজস্ব শক্তিকে অর্থনৈতিক পরিচয়ে রূপ দেওয়ার একটি কার্যকর পথ হতে পারে, এক গ্রাম, এক পণ্য।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ