০৪:৫৭ পি.এম
ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখন হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন একটি সংকটে পড়েছে। খুব দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এ সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং রসদ সংকট নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হয়েছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, গত সপ্তাহে ভিয়েতনামের দা নাং বন্দর ছেড়ে গেছে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন। একটি ক্রুজার ও একটি ডেস্ট্রয়ারসহ রণতরিটিকে পরে সিঙ্গাপুর প্রণালি অতিক্রম করতে দেখা গেছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতিতে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, জর্জ ওয়াশিংটন এখন প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরকে সংযুক্তকারী মালাক্কা প্রণালিতে অবস্থান করছে। এটিকে ভারত মহাসাগরের দিকে পাঠানো হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ক্যালিফোর্নিয়ায় দাবানল, ৬ হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরানো হচ্ছে
এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে মোতায়েন থাকা দুটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরির মধ্যে একটি জায়গা নেবে জর্জ ওয়াশিংটন। বর্তমানে ওই অঞ্চলে থাকা আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন এবং নাবিকদের মনোবল নিয়ে উদ্বেগের পরিস্থিতির মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তিনি সেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবেন।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বিষয়ে জানা যায়, সাধারণত মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলো ছয় থেকে নয় মাসের জন্য মোতায়েন থাকে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই সময়সীমা বাড়াও হতে পারে। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন চলতি সপ্তাহে সমুদ্রে ২৬০ দিনের বেশি সময় কাটিয়েছে, যা আধুনিক ইতিহাসে কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরির দীর্ঘতম মোতায়েনের একটি।
জাহাজটিতে থাকা প্রায় ৫ হাজার নাবিকের মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোবল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাদের পরিবার এবং মার্কিন আইনপ্রণেতারা। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান এবং বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: কলকাতায় পূজামণ্ডপ ভেঙে প্রাণহানি, শোক জানালেন মোদি ও মমতা
এবং আসলে আব্রাহাম লিংকন ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছায়। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধ শুরু হয়।
মার্কিন নৌবাহিনী স্বীকার করেছে, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে প্রচলিত রসদ সরবরাহ কেন্দ্রগুলো সামরিক অভিযানে বিঘ্নিত হয়েছে। এর ফলে রণতরিটিতে প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও ডাক সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘নেতৃত্ব মিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে—প্রথমে খাবার, এরপর স্বাস্থ্যবিধির সামগ্রী, তারপর ডাক।’ তবে বর্তমানে নাবিকদের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে বলেও জানা গেছে।
যদিও আব্রাহাম লিংকনে খারাপ পরিস্থিতির খবর নাকচ করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি এসব প্রতিবেদনকে ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেছেন।
আরও পড়ুন: শ্রীলঙ্কায় দেশব্যাপী বিদ্যুৎ বিপর্যয়, জাতীয় গ্রিডে ত্রুটি
পানামা সফরের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে হেগসেথ বলেন, প্রতিটি জাহাজ, নাবিক ও কমান্ডারকে প্রয়োজনীয় সবকিছু সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। দীর্ঘ মোতায়েন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কিছু মোতায়েন অন্যগুলোর চেয়ে দীর্ঘ হয়ে থাকে। এসব নাবিকের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা অন্য সবার চেয়ে বেশি।’
এর পূর্বে সামরিকবিষয়ক দুই সংবাদমাধ্যম নেভি টাইমস ও স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস জাহাজটির নাবিকদের মনোবল কমে যাওয়ার এবং গুরুতর মানসিক চাপের খবর প্রকাশ করেছে।
হেগসেথের মন্তব্যের পর আব্রাহাম লিংকনে নাবিকদের পরিস্থিতি নিয়ে পেন্টাগনের জবাবদিহি দাবি করেছেন কয়েকজন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা। তারা বিষয়টি তদন্ত, আরও তথ্য প্রকাশ এবং জাহাজটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।
সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সদস্য কানেকটিকাটের সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল নৌবাহিনীর নেতৃত্বকে লেখা এক চিঠিতে বলেছেন, লিংকনের দীর্ঘায়িত মোতায়েন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের মধ্যেই ঘটছে এবং ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলে আরও দীর্ঘ সময় উল্লেখযোগ্য মার্কিন নৌবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন হতে পারে।
আরও পড়ুন: দেশের অর্থনীতি তিন কাঠামোগত ফাঁদে আটকে, দারিদ্র্য ও বিনিয়োগে স্থবিরতা
অ্যারিজোনার সিনেটর ও সাবেক মেরিন রুবেন গ্যালেগো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, তিনি দুই দলের আইনপ্রণেতাদের নিয়ে জাহাজটি পরিদর্শনের পরিকল্পনা করেছেন। নাবিকদের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করা হচ্ছে, তা ‘শুধু নিন্দনীয় নয়, বিপজ্জনকও।’
ইরান যুদ্ধের কারণে দীর্ঘায়িত মোতায়েন নিয়ে মার্কিন সেনাদের দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি জাহাজ ও সামরিক সরঞ্জামের ওপর বাড়তি চাপ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন