০৪:৫৮ পি.এম
হালকা সবুজ রঙের দেয়াল, যেখানে বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি টানানো হয়েছে।
মেঝেতে কিছু টেবিল রয়েছে। পাশে পাঠকদের বসার জন্য আরামদায়ক চেয়ার। তিনটি কাঠের আলমারিতে সাজানো রয়েছে বই এবং টেবিলে রয়েছে ১০টি জাতীয় পত্রিকা।
আরও পড়ুন: নাব্যতা সংকটে হবিগঞ্জের সুতাং নদী মরা খালে পরিণত
চারপাশের দেয়ালে নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, জসীমউদ্দিন, সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, স্বামী বিবেকানন্দ, এস এম সুলতান, মসলেম উদ্দিনসহ বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি।
এভাবে সাজানো নড়াইল সদর উপজেলার মাইজপাড়া ইউনিয়নের মাইজপাড়া ভবেশচন্দ্র গণপাঠ নিকেতন। জেলা শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ পাঠাগারটি গড়ে তোলা হয়েছিল ১৯৮৮ সালে। তার মানে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বয়স ৩৮ বছর হতে চলেছে।
শেষ বিকেলে কিছু প্রবীণ পাঠক পাঠের নিবিষ্টতায় মগ্ন রয়েছেন।
তারা খবরের কাগজ পড়ছেন। সেলিম শেখ, যিনি এসব পাঠকের একজন, তিনি বলেন, ‘জীবনের শেষ বেলায় এই জায়গা একটু শান্তি দেয়। এখানে নিরিবিলি বসে পেপার পড়ি। মাঝে মাঝে বইও পড়ি। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে বিকেলে, যখন আমার বয়সী অনেকে এখানে আসেন।’
আরও পড়ুন: বরিশালে দুই যুবককে মারধরের অভিযোগ বিএনপি নেতা ফারুকের বিরুদ্ধে
তিনি পাঠাগারে সময় কাটানোর প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আমরা এখানে একসঙ্গে সময় কাটাই। কখনও কখনও মনে হয়, আমি আবার আঠারো বছর বয়স ফিরে পেয়েছি।’ পাঠাগারটির নানা সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পুরনো এই পাঠাগারটির এখনো সংস্কার হয়নি। অনেক জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, এখানে কোনো শৌচাগার নেই। এছাড়াও, যদি পাঠাগারটিতে বইয়ের সংখ্যা বাড়ানো হতো, তাহলে পাঠকের সংখ্যা আরও বাড়তে পারত।’
সোমবার (২২ জুন) বিকেলে পাঠাগারটিতে গিয়ে দেখা যায়, একটি টিনশেড ঘরে কার্যক্রম চলছে। একটি মাত্র কক্ষে আলমারি, পাঠকদের জন্য চেয়ার-টেবিল রয়েছে। সঙ্গে একটি টেলিভিশনও আছে। ভেতরে যারা পাঠ করছেন, তাদের অধিকাংশই ষাটোর্ধ্ব। ছায়াঘেরে প্রতিষ্ঠানে পত্রিকা পড়তে নিয়মিত এসেছেন তারা।
কিছু পাঠক জানিয়েছেন, বিদ্যালয়ের টিফিনের সময় শিক্ষার্থীদের ভিড় এখানে জমে।
পাঠাগারটিতে শিশু কিশোরদের জন্য আলাদা বইয়ের সংগ্রহ রয়েছে। এখানে এসে বই পড়া ছাড়াও, সদস্যরা সাত থেকে ১০ দিনের জন্য বই বাড়িতে নিয়ে পড়তে পারেন। পাঠাগারের গ্রন্থাগারিকের দায়িত্ব পালন করেন তুহিন মোল্যা। তিনি বলেন, সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পাঠাগারের কার্যক্রম চলে। অধিকাংশ সময়ই তিনি সেখানে উপস্থিত থাকেন।
আরও পড়ুন: ডাকাতিয়ায় সেতু না থাকায় স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁশের সাঁকো নির্মাণ
ভবেশচন্দ্র গণপাঠাগার নামকরণের ইতিহাস জানতে চাইলে পাঠাগারটির সাবেক লাইব্রেরিয়ান বিকাশ মল্লিক বলেন, এলাকায় শিক্ষার আলোকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য স্থানীয় শিক্ষানুরাগীরা তখনকার মাইজপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের বারবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ভবেশচন্দ্রের স্মরণে তার নামেই পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
পাঠাগারটির বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৬৫০। প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে প্রায় ১৩০০ বই। নিয়মিত ১০টি জাতীয় পত্রিকা রাখা হয়। প্রায় চার দশক ধরে বই পড়া ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু তাই নয়, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নানা সেবামূলক কাজও পরিচালনা করছে এখানকার কমিটি।
বিকাশ বলেন, তখনকার সময়ে সদস্যরা মাসিক দুই টাকা চাঁদা দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালাতেন। এখানকার সুধী সমাজ এক হয়ে গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিলে জমি দান করেন স্থানীয় বাসিন্দা গৌরাঙ্গ সাহা। পাঠাগারটি সাজিয়ে তুলতে নানা উদ্যোগ নেয় প্রতিষ্ঠানটির কমিটি।
কমিটির সাধারণ সম্পাদক আনিচুজ্জামান সোহাগ বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পাঠাগারমুখী করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তারা যেন মোবাইল ফোনের পর্দা থেকে সরে এসে পাঠাগারমুখী হয়, সে জন্য আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের বই, খাতা, কলমসহ শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ করার উদ্যোগ নিয়েছি।’
আরও পড়ুন: গাইবান্ধায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগ, আতঙ্কে এলাকাবাসী
বিকেলে বয়স্করা যে পত্রিকা পড়ার জন্য এখানে আসেন এবং একসঙ্গে তারা সময় কাটান, এই বিষয়টি নজরকাড়া। যা অন্য অনেক জায়গায় দেখা যায় না। তিনি এ সময় পাঠাগারটির পুরনো ভবনটির পূর্ণ নির্মাণের জন্য সরকারি সহযোগিতা কামনা করেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন