ঢাকা শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬খ্রিষ্টাব্দ ১৪ই কার্তিক, ১৪৩৩বঙ্গাব্দ ১৯ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিজরী
শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ইং ১৪ই কার্তিক, ১৪৩৩বাং

অক্টোবরের চার সপ্তাহে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স ২৬৬ কোটি ডলার


অক্টোবরের চার সপ্তাহে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স ২৬৬ কোটি ডলার

চলতি মাসের প্রথম ২৮ দিনে দেশে এসেছে ২৬৫ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। এই হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে ৯ কোটি ৪৮ ডলার রেমিট্যান্স।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এই তথ্য প্রকাশ করেছেন।

তিনি উল্লেখ করেন, চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম ২৮ দিনে দেশে এসেছে ২৬৫ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। গত বছরের একই সময়ে যা এসেছিল ২৩৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, বছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে।

আরও পড়ুন: ব্যাংক খাত অত্যন্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে: মাহবুব উল্লাহ

বর্তমান ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ১২৪ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা এসেছিল ৯৯২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। বছরে যা বেড়েছে ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ।

এর আগে গত সেপ্টেম্বরে দেশে এসেছে ২৭৬ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার। এছাড়া, গত আগস্ট ও জুলাই মাসে যথাক্রমে দেশে এসেছিল ২৯৬ কোটি ৭৫ লাখ ৩০ হাজার ও ২৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

ময়মনসিংহে যুবদল নেতার বিরুদ্ধে নারীকে ধর্ষণচেষ্টার মামলা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৭:৪৭ এম


ময়মনসিংহে যুবদল নেতার বিরুদ্ধে নারীকে ধর্ষণচেষ্টার মামলা

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় এক নারীর প্রতি কুপ্রস্তাব, জোরপূর্বক শারীরিক হেনস্তা এবং ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে পুটিজানা ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হযরত আলী মন্ডলের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী জাহানারা খাতুন (৪৫) ফুলবাড়ীয়া থানায় অভিযোগ করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।

অভিযোগের সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের বৈলাজান গ্রামের কর্মকার বাড়িতে এই ঘটনা ঘটে। জাহানারা খাতুনের স্বামী দুলাল মিয়া বিদেশি মুদ্রা লেনদেনের একটি মামলায় কারাগারে ছিলেন। তিনি প্রায় দেড় মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান। অভিযোগ অনুযায়ী, দুলাল মিয়াকে দ্রুত জামিনে মুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে জাহানারা খাতুনের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন হযরত আলী মন্ডল।

জাহানারা খাতুন অভিযোগ করেছেন যে, তিনি শারীরিকভাবে হেনস্তার চেষ্টা এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শের শিকার হন। এ সময় তিনি বাধা দেন এবং নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে ওই নেতা তাকে বিভিন্নভাবে বিরক্ত করে আসছেন। উল্লেখ্য, তিনি অতীতে সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।

ভুক্তভোগীর পুত্রবধূ বলেন, যুবদল নেতা হযরত আলী তার শাশুড়ির সঙ্গে অনৈতিক আচরণের চেষ্টা করেছেন। মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে তাকে জোরপূর্বক হেনস্তার চেষ্টা করা হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। গত দুই দিন ধরে তার শাশুড়ি বাড়িতে নেই এবং তিনি থানায় অভিযোগ করেছেন। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীর বিচার দাবি করেন তিনি।

জাহানারা খাতুনের মা খাদিজা বলেন, তার মেয়ের সঙ্গে হযরত আলী জোরপূর্বক অনৈতিক কাজের চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করেন।

এদিকে পুটিজানা ইউনিয়নের শিবগঞ্জ এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা হযরত আলীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, একজন নারী ভালো বা মন্দ, সেটি আলাদা বিষয়। তার কাছে গিয়ে কেন জোরপূর্বক এমন আচরণের চেষ্টা করা হবে? তারা অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করে দেখার এবং দোষী প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন, হযরত আলীর কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকায় আগে থেকেই নানা আলোচনা রয়েছে।

হযরত আলীর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উপজেলা যুবদলের সভাপতি কামরুজ্জামান মীর আজাদ বলেন, এ বিষয়ে জেলা নেতাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। আগামীকাল তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সাংগঠনিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফুলবাড়ীয়া থানার ওসি রাশিদুল হাসান বলেন, রাতে থানায় নিয়মিত মামলা হয়েছে। আসামিকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

এসআরবির অভিযানের সময় তরুণ মারুফের মৃত্যু, তদন্তের দাবি এইচআরএসএসের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৭:৪৭ এম


এসআরবির অভিযানের সময় তরুণ মারুফের মৃত্যু, তদন্তের দাবি এইচআরএসএসের

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধলপুর এলাকায় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) অভিযানের সময় ১৮ বছর বয়সী তরুণ মারুফ ওরফে দুখু মিয়ার গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং নিহতের পরিবারের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়।

এইচআরএসএস বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও শোক প্রকাশ করে। সংগঠনটির দাবি, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং তাদের নিজস্ব অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে গুরুতর অসংগতি পাওয়া গেছে। একদিকে অভিযানের সময় আত্মরক্ষার্থে ফাঁকা গুলি ছোড়ার দাবি করা হয়েছে, অন্যদিকে এসআরবির একটি ক্যাম্প থেকে ওই এলাকায় কোনো দল পাঠানোর কথা অস্বীকার করা হয়েছে। এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও মারুফ কার গুলিতে নিহত হয়েছেন, তা নিশ্চিত করতে পারেননি।

এইচআরএসএসের অনুসন্ধানে জানা যায়, নিহতের স্বজনদের দাবি, হট্টগোলের শব্দ শুনে মারুফ পাশের রাস্তায় গেলে কিছুক্ষণ পর তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাওয়া যায়। অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, নিজেদের র‍্যাব/এসআরবি সদস্য পরিচয় দেওয়া কয়েকজন ব্যক্তি তিনজনকে হাতকড়া পরানোর সময় ইটের টুকরা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এ সময় দুজন সদস্য গুলি চালান বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

সংগঠনটি বলছে, স্বজন, প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যের মধ্যে থাকা এসব অসংগতি নিরসন এবং ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন এর আগের দিন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) সরকার অনুমতি দিলে ‘ক্রসফায়ার’ করার প্রস্তুতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের বক্তব্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

এইচআরএসএসের মতে, র‍্যাবের নাম পরিবর্তন করে এসআরবি করা হলেও বাহিনীর কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। মানবাধিকার সংগঠনটি মনে করিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) ৬ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক মানুষের জীবনের অধিকার সুরক্ষিত করা হয়েছে। জাতিসংঘের নীতিমালা অনুযায়ী, আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার অবশ্যই কঠোরভাবে প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে।

এইচআরএসএস বলছে, আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর অভিযানে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে কার্যকর, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এইচআরএসএসের সাত দফা দাবি

ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সাত দফা দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। দাবিগুলো হলো—

১. সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বাইরে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করে তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

২. ব্যালিস্টিক পরীক্ষার ফল, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড এবং অভিযানসংক্রান্ত সব নথি সংরক্ষণ করে তদন্তে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

৩. তদন্তের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করতে হবে।

৪. নিহতের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

৫. ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং নিহতের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও কার্যকর প্রতিকার দিতে হবে।

৬. বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিতবাহী বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি সাদা পোশাকে অভিযান পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পরিচয় প্রদর্শন এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

৭. এসআরবির কাঠামোগত সংস্কার, স্বাধীন তদারকি এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

বিবৃতিতে এইচআরএসএস আরও বলেছে, জীবনের অধিকার রক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়া এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব নয়। তাই মারুফের মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংস্কারেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিকের দুর্দশা ও রাষ্ট্রের দায় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৭:৫৮ এম


মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিকের দুর্দশা ও রাষ্ট্রের দায় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ

বাংলাদেশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান। ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে সৌদি আরব, কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূমিকা অপরিহার্য। লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক তাদের শ্রম, ঘাম ও ত্যাগের মাধ্যমে এসব দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি মূল ভিত্তি। তবে এই অর্থনৈতিক সম্পর্কের অন্তরালে রয়েছে বৈষম্য, শোষণ, অমানবিক আচরণ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার হরণের এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা। কুয়েতে সামরিক কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক ভ্রমণের সুযোগে সেখানকার সমাজব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংস্কৃতি, মানুষের আচরণ ও বিদেশিদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পর্যবেক্ষণের সুযোগ হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতার মধ্যে কিছু ইতিবাচক, আবার কিছু অত্যন্ত তিক্ত, বিস্ময়কর ও হতাশাজনক ছিল।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এসব দেশের সমাজ ও প্রশাসনের কিছু অংশে পশ্চিমা নাগরিকদের প্রতি বিশেষ সমীহ এবং বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশের নাগরিকদের প্রতি অবজ্ঞাপূর্ণ মনোভাব বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে মানুষের যোগ্যতা, সততা ও মানবিক মর্যাদার পরিবর্তে তার জাতীয়তা, অর্থনৈতিক অবস্থান এবং পাসপোর্টের গুরুত্বই আচরণের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়। তবে সব আরব নাগরিক কিংবা সরকারি কর্মকর্তার আচরণ একরকম নয়। অনেক মানবিক, উদার ও ন্যায়পরায়ণ মানুষের সঙ্গেও পরিচয় হয়েছে। কিন্তু কিছু ব্যক্তির ইতিবাচক আচরণ দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও শ্রমিক নির্যাতনের বাস্তবতা আড়াল করা যায় না।

মধ্যপ্রাচ্যের কিছু সমাজে বিদেশি নাগরিকদের প্রতি আচরণে একটি অঘোষিত শ্রেণীবিন্যাস লক্ষ্য করা যায়। পশ্চিমা দেশের নাগরিকরা অনেক ক্ষেত্রে অধিক সম্মান, সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা পান। অন্যদিকে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল কিংবা আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলো থেকে আসা শ্রমিকরা কখনো কখনো অবজ্ঞা, বৈষম্য এবং অসম আচরণের শিকার হন। এই বৈষম্য শুধুমাত্র ব্যক্তিগত মনোভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা মজুরি, কর্মপরিবেশ, আবাসন, বিচারপ্রাপ্তি এবং প্রশাসনিক সেবায়ও প্রতিফলিত হয়।

বিশেষ করে গৃহকর্মী, নির্মাণশ্রমিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও স্বল্প আয়ের অভিবাসীরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। তাদের অনেকেই ভাষা জানেন না, স্থানীয় আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই এবং নিয়োগকর্তার ওপর অর্থনৈতিক ও আইনগতভাবে নির্ভরশীল। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কি অন্য দেশের দরিদ্র মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার অধিকার দেয়? অবশ্যই নয়। মানুষের মর্যাদা তার জাতীয়তা, ধর্ম, বর্ণ কিংবা অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে না।

বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীদের অসহায়ত্ব

বিদেশে গৃহকর্মে নিয়োজিত অনেক নারী সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। বাংলাদেশের অসংখ্য নারী সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় বহন, পরিবারের ঋণ পরিশোধ, বৃদ্ধ মা-বাবার চিকিৎসা কিংবা একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় বিদেশে যান। তাদের অনেকেই নিজের জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু বিদেশে পৌঁছানোর পর কেউ কেউ এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, যেখানে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা, শ্রমের ন্যায্যমূল্য এবং মৌলিক মানবাধিকার বিপন্ন হয়ে পড়ে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনের ২০২৫ সালের মে মাসের অনুসন্ধানে সৌদি আরবে কর্মরত ৭০ জনের বেশি নারী গৃহকর্মীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, চলাফেরায় বাধা, পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া, মজুরি আটকে রাখা এবং শারীরিক, মৌখিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠে আসে। সাক্ষাৎকারদাতাদের অনেকেই দৈনিক অন্তত ১৬ ঘণ্টা কাজ করার কথা জানিয়েছেন। তাদের গড় মাসিক মজুরি ছিল প্রায় ৯০০ সৌদি রিয়ালÑঅর্থাৎ আনুমানিক ২৪০ মার্কিন ডলার। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত অ্যামনেস্টির আরেকটি অনুসন্ধানে সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা ১৯ জন ফিলিপিনো নারীর অভিজ্ঞতায় দৈনিক ১৪ থেকে ২১ ঘণ্টা কাজ, সাপ্তাহিক বিশ্রামের অভাব এবং নির্যাতনের অভিযোগ উঠে আসে।

এসব অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সাক্ষাৎকারদাতাদের অভিজ্ঞতাভিত্তিক; সব নিয়োগকর্তা কিংবা সব গৃহকর্মীর অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে না। কিন্তু অভিযোগগুলোর গুরুত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সমস্যাটি নতুন নয়। ২০১৯ সালের মার্চে রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে ব্র্যাকের তথ্যের ভিত্তিতে জানানো হয়, ২০১৮ সালে প্রায় ১ হাজার ৩০০ বাংলাদেশি নারী সৌদি আরব থেকে ফিরে নির্যাতন বা শোষণের অভিযোগ করেছিলেন। এই ঘটনাগুলো আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে : বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে দ্বিতীয় স্থানে রাখতে পারে?

মধ্যপ্রাচ্যের অভিবাসী শ্রমিকদের দুর্দশার অন্যতম কাঠামোগত কারণ কাফালা বা স্পনসরশিপব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার বিভিন্ন রূপে একজন বিদেশি শ্রমিকের অভিবাসন-সংক্রান্ত অবস্থান নিয়োগকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত থাকে। ফলে কর্মস্থল পরিবর্তন, নিরাপদে চাকরি ছেড়ে দেওয়া কিংবা নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার ক্ষেত্রে শ্রমিক নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে পারেন। বিশেষত, ব্যক্তিগত বাসাবাড়িতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের পরিস্থিতি আরো জটিল। তাদের কর্মস্থল অনেক সময় বাইরের পর্যবেক্ষণ ও নিয়মিত শ্রমপরিদর্শনের আওতার বাইরে থাকে।

যে নারী একই পরিবারের ওপর বেতন, বাসস্থান ও নিরাপত্তার জন্য নির্ভরশীল, তার পক্ষে সেই পরিবারের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করা অত্যন্ত কঠিন। সৌদি আরবে শ্রমনীতি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অনুসন্ধানে গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতির কথা উঠে এসেছে।

কুয়েতের ২০১৫ সালের গৃহকর্মী আইনে সাপ্তাহিক ছুটি, বছরে ৩০ দিনের বেতনসহ ছুটি এবং বিশ্রামসহ সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার কর্মদিবসের বিধান রয়েছে। কিন্তু আইন প্রণয়ন এবং বাস্তবে তার প্রয়োগ এক বিষয় নয়। আইনের কার্যকারিতা বিচার করতে হবে শ্রমিক কতটা স্বাধীনভাবে অভিযোগ করতে পারেন, বিপজ্জনক কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারেন এবং ন্যায়বিচার পানÑ এর ভিত্তিতে।

সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা ও বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়েও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশটিতে অন্তত ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩৪৫। সংস্থাটির উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রাণহানিবিহীন মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ২৪০ জনের মধ্যে ১৮৮ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক।

এই পরিসংখ্যান সব ধরনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য; এগুলোকে গৃহকর্মীদের মামলা বা শিরশ্ছেদের পৃথক হিসাব হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ায় ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, আইনগত সহায়তার অভাব কিংবা যথাযথ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না থাকলে ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

বাংলাদেশের উচিত আটক প্রত্যেক নাগরিকের জন্য দ্রুত কনস্যুলার সহায়তা, দক্ষ আইনজীবী, দোভাষী এবং ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করা। ধর্মীয় বা আইনগত ব্যাখ্যা কখনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, স্বচ্ছ বিচার এবং মানবাধিকারের বিকল্প হতে পারে না।

ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন বিদেশে গৃহকর্মীদের সুরক্ষার প্রশ্নে বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক পাঠানো স্থগিত এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পথ অনুসরণ করেছে। ইন্দোনেশিয়া ২০১৫ সালে সৌদি আরবে কর্মী পাঠানোর ওপর স্থগিতাদেশ দেয়। পরে সুরক্ষাব্যবস্থা পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে সহযোগিতা আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফিলিপাইনও সৌদি আরবে কর্মী পাঠানো সাময়িকভাবে স্থগিত করে ২০২২ সালের নভেম্বরে নতুন সুরক্ষাসংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে পুনরায় কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নেয়।

এসব অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, শ্রমিক পাঠানো সাময়িক স্থগিত রাখা কূটনৈতিক দর-কষাকষির একটি উপায় হতে পারে। তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে বিকল্প কর্মসংস্থান, অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ এবং কার্যকর নজরদারি থাকতে হবে।

বাংলাদেশের অভিবাসননীতিতে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন কিংবা কত বৈদেশিক মুদ্রা এলোÑএগুলোই সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না।

প্রথমত, সৌদি আরব ও কুয়েতে ব্যক্তিগত বাসাবাড়িতে থেকে গৃহকর্মে নিয়োজিত হওয়ার জন্য নতুন নারী কর্মী পাঠানো একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত, যতক্ষণ না স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত হয়।

দ্বিতীয়ত, দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে কর্মীর পাসপোর্ট ও ফোন নিজের কাছে রাখা, নিয়মিত মজুরি প্রদান, বিশ্রাম, ছুটি এবং নিরাপদে চাকরি পরিবর্তনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং শক্তিশালী করতে হবে। পর্যাপ্ত কর্মকর্তা, নারী সুরক্ষা কর্মকর্তা, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র, বাংলায় অভিযোগ গ্রহণ এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

চতুর্থত, প্রতারণামূলক নিয়োগ, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, চুক্তি পরিবর্তন এবং বিপজ্জনক নিয়োগকর্তার কাছে জেনেশুনে কর্মী পাঠানোর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

পঞ্চমত, নির্যাতিত নারীদের দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, আইনগত প্রতিকার, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

ষষ্ঠত, কর্মী পাঠানো, নির্যাতনের অভিযোগ, জরুরি প্রত্যাবর্তন, মৃত্যু, বকেয়া মজুরি আদায় এবং বিচারিক ফলাফল সম্পর্কে নিয়মিত নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান প্রকাশ করতে হবে।

সপ্তমত, নারীদের জন্য দেশ ও বিদেশে নিরাপদ, দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব তাদের ঝুঁকিপূর্ণ চাকরি গ্রহণে বাধ্য না করে।

বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরব, কুয়েত এবং অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বন্ধুত্বের অর্থ অন্যায়কে নীরবে মেনে নেওয়া নয়। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার নাগরিকদের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্মান রক্ষা করা। অর্থনৈতিক স্বার্থ কিংবা কূটনৈতিক সৌজন্যের কারণে সেই দায়িত্ব থেকে সরে আসা যায় না।

বাংলাদেশকে মনে রাখতে হবে, প্রবাসী শ্রমিকরা কোনো করুণার পাত্র নন। তারা পরিশ্রমের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। তাই তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকেও উপলব্ধি করতে হবে, আধুনিক অবকাঠামো, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদার প্রকৃত মূল্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষটিও ন্যায়বিচার ও মানবিক আচরণ পান।

শেষ কথা

কুয়েতে একজন বাংলাদেশি কূটনীতিক হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের পর্যবেক্ষণ আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধির দিকে নিয়ে গেছেÑঅর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সবসময় মানবিক উৎকর্ষের নিশ্চয়তা দেয় না। একটি রাষ্ট্র কতটা উন্নত, তার বিচার শুধু সম্পদ, আকাশচুম্বী ভবন কিংবা আন্তর্জাতিক প্রভাব দিয়ে করা যায় না। প্রকৃত সভ্যতার পরিচয় পাওয়া যায় দুর্বল, দরিদ্র ও বিদেশি মানুষের প্রতি তার আচরণে।

বাংলাদেশকে তাই আত্মমর্যাদাশীল, বাস্তববাদী ও মানবিক কূটনীতি অনুসরণ করতে হবে। বিদেশে কর্মসংস্থান অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা কোনোভাবেই নাগরিকের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সম্মানের বিনিময়ে হতে পারে না। রাষ্ট্রের কাছে একজন প্রবাসী নারীর জীবন ও মর্যাদার মূল্য যেকোনো শ্রমবাজার কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের চেয়ে বেশি হতে হবে। কারণ মানুষ অর্থনীতির জন্য নয়; অর্থনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য।

[email protected]

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

ধর্ম ও বিশ্বাস: বিতর্কিত মন্তব্যের প্রেক্ষিতে আলোচনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৭:৫৯ এম


ধর্ম ও বিশ্বাস: বিতর্কিত মন্তব্যের প্রেক্ষিতে আলোচনা

এক ছাত্রের পাঠানো একটি বয়ান শুনে কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের (১৮৬৩-১৯১৩) বিখ্যাত কবিতা ‘নতুন কিছু করো’র কিছু পঙ্‌ক্তি মনে পড়ে গেল।

নতুন কিছু করো,

একটা নতুন কিছু করো।

নাকগুলো সব কাটো,

কানগুলো সব ছাঁটো;

পাগুলো সব উঁচু করে,

মাথা দিয়ে হাঁটো;

হামাগুড়ি দাও, লাফাও,

ডিগবাজি খাও, ওড়ো;

কিংবা চিৎপাত হয়েÑ

পাগুলো সব ছোঁড়ো;

ঘোড়াগাড়ি ছেড়ে এখন

বাইসিকেলে চড়ো।

কিংবা সবাই ওঠো, টাউন হলে জোটো;

ধর্ম প্রচার করতে আমেরিকায় ছোটো;

আমরা যেন নেহাতই খাটো

হয়ে না যাই দেখো,

খুব খানিক চেঁচাও কিংবা খুব খানিক লেখো;
ছাড়ো, আবার ভাগবত পড়ো।

Ñনতুন কিছু করো, একটা নতুন কিছু করো।

কলিকালে কত কিছুই নতুন দেখতে ও শুনতে পাচ্ছি। এই বয়ানেও তেমনই অদ্ভুত কিছু পেলাম। অন্যান্য সঠিক, সাহসী ও অপ্রিয় বক্তব্যের মধ্যে তিনি বলেন ভয়ংকর এক ভ্রান্ত কথা—‘ধর্মে বিশ্বাস বলে কিছু নেই!’

প্রেরিত বয়ানটি শ্রদ্ধেয় অগ্রজপ্রতিম মার্কসীয় চিন্তাধারার বুদ্ধিজীবী বলেই প্রতীয়মান এমন একজনের একটি চিত্রায়িত উপস্থাপন (ইউটিউব) পাঠান, যিনি সম্প্রতি একজন আধুনিক বাউল ধর্মগুরু বলেও আবির্ভূত। সাধারণত এ ধরনের চিত্রায়িত উপস্থাপন (ইউটিউব) দেখার বা শোনার অভ্যাস নেই। একজন আধা বাঙালি আধা জার্মান বালকের কিছুদিন আগে আবিষ্কৃত ‘ইউটিউব’ নামের এই ভয়ংকর অদ্ভুত জন্তু বা যন্ত্রের মাধ্যমে জ্ঞানরাজ্যে যে অভাবিত নৈরাজ্যের অরাজকতার দুয়ার অবারিত হয়েছে, তার পৃষ্ঠপোষকতায় অনাগ্রহেই এমন। কিন্তু মাঝে মাঝে ব্যতিক্রম ঘটে, আর এই বিশেষ ক্ষেত্রেও প্রেরিত চিত্রায়িত উপস্থাপনাটি (ইউটিউব) মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। বক্তার মার্কসীয় দর্শন, সামাজিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা আর সমাজে ধর্মের অনস্বীকার্য গুরুত্ব সম্পর্কে তার উপলব্ধির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই উপস্থাপনাটি মনোযোগ দিয়ে শুনলাম, যদিও আমি নিজে মার্কসবাদী নই, ধর্মান্ধতারও ভক্ত নই। আর বয়ানটি চিন্তাশীল স্নেহাস্পদ ছাত্রটি পাঠিয়েছিল বলেও আরো মনোযোগ দিয়ে দেখলাম বা শুনলাম।

বিবিধ গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনি বলেছেন, যথার্থ সাহসিকতার সঙ্গে। তার জন্য সাধুবাদ। কিন্তু মার্কসীয় দর্শন ধর্মীয় বলে চালানো যে কূপমণ্ডূকতা বিনাশে আগ্রহী, তার বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে একপর্যায়ে ধর্ম নিয়ে ওই যে এমন একটি অদ্ভুত নতুন কথাও বলে ফেলেন, যার যথাসাময়িক সংশোধনী দরকার মনে করেই কলম ধরলাম।

দুদিন হলো মার্কসীয় দর্শনের এশীয় প্রেক্ষিতে প্রয়োগের প্রচেষ্টার মহানায়ক মাও সে তুংয়ের চীন থেকে এসেছি—চীনের সে মাও সে তুংও ধর্মসংক্রান্ত এই নতুন অদ্ভুত কথাটিতে হয়তো তাজ্জব হতেন। স্বয়ং মার্কসও! ধর্মের পাশ্চাত্য সমাজবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের পাণ্ডিত্যের পণ্ডিত, আর ধর্মানুরাগী ধর্মগুরুদের কথা তো রইলই!

ওই বিশেষ গুরুজনপ্রতিম চিন্তাবিদ পর্যায়ের বুদ্ধিজীবী না হলে হয়তো বলেই ফেলতাম, এমন অদ্ভুত নতুন কথাটি বলে ফেলা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ওই ‘নতুন কিছু করো’র মতো ধর্মসংশ্লিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক স্টান্টবাজির মাধ্যমে কিছু দর্শক-শ্রোতাকে বিমোহিত করে আকর্ষিত করার চেষ্টার অংশই মাত্র; অনুজপ্রতিম হিসেবে সে বেয়াদবি এখানে করব না। দার্শনিকের দর্শনদৃষ্টির কিঞ্চিৎ ভ্রান্তিই ধরে নিয়ে আমাদের মতো সাধারণ্যেসহ সব সত্যাগ্রহীর জন্য তার সংশোধনী দেওয়ার চেষ্টা করব।

বিশ্বাসই ধর্মের বীজ, আর তার কেন্দ্রসম সারবত্তা। একে বাদ দিয়ে ধর্ম হয় না; কোনো ধর্মই হয় না। বলা হয়, বৌদ্ধধর্মে নাকি কোনো বিশ্বাস নেই, আছে শুধু দর্শন। কোনো এক সময় শ্যামদেশে (‘থাইল্যান্ড’-এ) বৌদ্ধ দর্শনে নিযুক্ত ‘আচার্ন’ (‘আচার্যন’ / ‘আচার্যম’, বা ‘আচার্য’) হিসেবে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান থেকেই বলতে পারি, কথাটি ঠিক নয়। বৌদ্ধ দর্শনটি বৌদ্ধধর্ম থেকেই প্রবাহিত ঠিক সেভাবেই, যেমনটি খ্রিষ্টীয় দর্শন প্রবাহিত খ্রিষ্টধর্ম থেকে। কিন্তু ধর্ম আর দর্শন এক নয়, দর্শন ধর্ম থেকে প্রবাহিত হলেও। উদাহরণস্বরূপ, আমার নিজের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিষ্টীয় পণ্ডিতদের মাধ্যমে পড়াশোনার ভেতর দিয়ে খোদ যিশুখ্রিষ্ট থেকে ধারাবাহিক সনদপরম্পরায় খ্রিষ্টীয় দর্শনে সনদ থাকলেও আমি খ্রিষ্টধর্মের ওই পর্যায়ের পাণ্ডিত্য ধারণ করি না। একইভাবে বৌদ্ধ সমাজে বৌদ্ধ দর্শন পড়ানোর জন্য নিযুক্ত আচার্ন বা আচার্য হলেও বৌদ্ধধর্মের পণ্ডিত নই সে পর্যায়ে। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই ধর্মোৎসারিত দর্শনের যৎসামান্য জ্ঞান থেকেই বলতে পারি, দর্শন উৎসারিত যে ধর্ম থেকে, তা তার মৌলিক ধর্মবিশ্বাস থেকেই। দর্শনের পরিভাষায় দর্শনের ভিত্তিরূপ এমন কিছু মৌলিক বিশ্বাস, যা প্রমাণোর্ধ্ব, তাকে স্বতঃসিদ্ধ, সিদ্ধান্ত বা মূলতত্ত্ব বলা হয়। এর সবই কোনো না কোনো ধর্মবিশ্বাস থেকে উৎসারিত।

ইউরোপের জনসাধারণ এবং সত্যসন্ধানী পণ্ডিত ও বিপ্লবীরা ধর্মব্যবসায়ী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ভণ্ডামি ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে তাদের প্রধান ধর্ম, তথা খ্রিষ্টধর্মকে পরিত্যাগে উদ্যত হলে ধর্মকেই বাদ দিয়ে তার বিকল্প হিসেবে দর্শনকে তুলে ধরতে গেলে, তার ভিত্তিরূপ ‘স্বতঃসিদ্ধ’ সন্ধানে প্রবৃত্ত হলে, তার উৎস হিসেবে ইউরোপে প্রচলিত ধর্ম খ্রিষ্টবাদ, ও তার প্রতিপক্ষ হিসেবে ইউরোপীয়দেরই প্রতিপক্ষ হিসেবে মনে করা ইহুদি ও ইসলাম ধর্ম—এসব বাদ দিয়ে, তারও পেছনে, প্রাচীনতর ইউরোপের ধর্ম, তথা গ্রিক পৌত্তলিক ধর্মের বিশ্বাস ও জগদ্দৃষ্টির (Weltanschauung) দ্বারস্থ হয়ে তারই পুনরুজ্জীবনে (Renaissance) প্রবৃত্ত হয়। দর্শনের নামে প্রাচীন গ্রিক ও তার উৎস, ব্যাবিলনীয় ও প্রাচীন মিসরীয় পৌত্তলিক, শয়তান-উপাসনামূলক জাদুবিদ্যাভিত্তিক ধর্মবিশ্বাস, চর্চা ও দৃষ্টিভঙ্গির ‘পুনরুজ্জীবন’কে ‘নবজাগরণ’ বলেও তাকে প্রচলিত ধর্মের বিকল্প হিসেবে প্রচলিত করে সেই সদুদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিন্তু পথভ্রষ্ট বিপ্লবী ও তাদের অনুগামী। মধ্যযুগের ক্রুসেড যুদ্ধে এসে ইউরোপীয় যোদ্ধাদের অনেকে মধ্যপ্রাচ্যে সংগোপনে সংগঠিত শয়তানপূজারি জাদুবিদ্যাভিত্তিক ধর্মচর্চার গোপন নিয়ম শিখে, তার চর্চাকারীদের গোপন সংগঠন গড়ে তোলে ইউরোপময়, আর ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতা বিস্তারের ভেতর দিয়ে বিশ্বের অন্যান্য জায়গায়, বিশেষ করে সমাজপতি ও শাসক শ্রেণিগুলোর ভেতর।

এদের প্রভাবে প্রাচীন গ্রিক, ব্যাবিলনীয় ও মিসরীয় জাদুবিদ্যাভিত্তিক শয়তানপূজারি পৌত্তলিক ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারে ‘নবজাগরণ’-এর প্রবক্তারা প্রচলিত ধর্মগুলোর গণগ্রহণীয়তা ও জনপ্রিয়তার শেকড় কাটতে ধর্ম বিষয়টিরই বিরোধিতার ভান করে তার পরিবর্তে বিকল্প হিসেবে দর্শন, ও তার অন্যতম শাখা বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠার কথা বলে, যদিও তার আড়ালে নানা মোড়কে, তাদের নিজেদের প্রাচীনতর ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি, আচার-আচরণ ও চর্চার প্রসার করে। অন্যদিকে তারা প্রচলিত ধর্মের কোনো একটা চর্চার ভান করে, ভেতর থেকে তার শেকড় কাটতে তার বিশ্বাসগুলোকে হয় অস্বীকার বা পরিবর্তনের কার্যক্রম করে। এরই প্রভাবে বিভিন্ন সমাজে নানা ‘নবজাগরণ’-ধারার বুদ্ধিজীবী, সমাজের প্রচলিত ধর্মচর্চা করে তার গুরু সেজে বসে সে ধর্মের নিয়মনীতি, দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিচ্ছে—তার অংশ হিসেবে, কখনো কখনো তার বিশ্বাসমালাকেই হয় বদলে দিচ্ছে, না হয় আমূল অস্বীকারই করে ফেলার প্রচার করছে—নিজেরা যে এর জন্য ব্যবহৃত হচ্ছেন, সেটা না জেনে না বুঝেই।

মস্তিষ্কবিজ্ঞান অনুযায়ী কোনো জীবের মস্তিষ্কই কোনোরূপ বিশ্বাসমালা ছাড়া কার্যকর হতে বা থাকতে পারে না; মানুষের তো নয়ই। মস্তিষ্কমাত্রই দ্বিমিক (binary), অর্থাৎ তা কার্যকরই হয় সব সময়ই দুই সম্ভাব্য করণীয়ের ভেতর একটি বেছে নিয়ে তার ওপর কার্যকর হয়। দুই সম্ভাবনার ভেতর এভাবে একটি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে, মস্তিষ্ক যেই সম্ভাবনাকে সঠিক বিশ্বাস করে, তাকেই বেছে নেয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো একটি পরিস্থিতিতে একজন চুরি করবে, না করবে না, তা ঠিক করার জন্য মস্তিষ্ক চুরি করা ঠিক বলে বিশ্বাস করলে, চুরি করার সিদ্ধান্ত নেবে। কোনো একটি পরিস্থিতিতে একজন মিথ্যা বলবে, না বলবে না, তা ঠিক করার জন্য মস্তিষ্ক মিথ্যা বলা ঠিক বলে বিশ্বাস করলে, মিথ্যা বলার সিদ্ধান্ত নেবে। কোনো একটি পরিস্থিতিতে একজন ঘুস খাবে, না খাবে না, তা ঠিক করার জন্য মস্তিষ্ক ঘুস খাওয়া ঠিক বলে বিশ্বাস করলে ঘুষ খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে।

এ রকম নানা বিশ্বাসের সমষ্টি নিয়ে বিশ্বাসমালা দিয়েই মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি পরিচালনা ব্যবস্থা রূপায়িত হয়। একটি কম্পিউটার যেভাবে তার ‘ডিস্ক অপারেটিং সিস্টেম (DOS)’ দ্বারা তার অজ্ঞাতেই পরিচালিত হয়—মস্তিষ্কও সেভাবে এই বিশ্বাসমালার দ্বারা, সাধারণত তার সচেতনতা ছাড়াই পরিচালিত হয়।

ধর্ম মূলত এরূপ একটি বিশ্বাসমালা ও তার নির্দেশানুগ আচার-আচরণ এবং তদনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির সমষ্টি। দর্শনও এরূপ একটি বিশ্বাসমালা ও তদনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির সমষ্টি সংশ্লিষ্ট আচার-অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে। কিন্তু কিছু স্বতঃসিদ্ধ বলে মেনে নেওয়া বিষয়ের ওপর বিশ্বাস বাদ দিয়ে না কোনো ধর্ম, না কোনো দর্শন বা তার শাখারূপ বিজ্ঞান সম্ভব।

তাই ধর্মে বিশ্বাস বলে কিছু নেই, কথাটি ধর্মমতেই শুধু নয়, বৈজ্ঞানিক বিচারেও একেবারেই অযৌক্তিক ও অসম্ভব। এমন কথা এমন এক নতুন অদ্ভুত কথা, যা শুধু দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের উদ্ধৃত কবিতাটিতে উল্লিখিত নতুন কিছু করা বা বলার জন্য বলার মতো উদ্ভট কিছু বৈ নয়।

তাহলে বুদ্ধিমান বুদ্ধিজীবী কোন বুদ্ধিতে এমন কথা বলেন? ভাষাবিভ্রাটে এমন হয়েছে।

বক্তা বলেন, ধর্ম হলো ‘ঈমান’, আর ‘ঈমান’ অর্থ ‘সমর্পণ’, তাই এখানে বিশ্বাসের কোনো বিষয় নেই।

কিন্তু ‘ঈমান’-এর আক্ষরিক অর্থ ‘সমর্পণ’ নয়, ‘বিশ্বাস’। ‘ঈমান’-এর শব্দমূল ‘অ-ম-ন’-এর অর্থ ‘নিরাপত্তা’, সেখান থেকে নিরাপত্তাজনিত ‘শান্তি’, আর সেখান থেকে নিরাপত্তা ও শান্তির ভিত্তি, তথা নিরাপত্তাজাত শান্তিদায়ক ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ এবং তারই চূড়ান্ত রূপ হলো ‘আমান’, তথা ‘ঈমান’।

তাহলে ‘ধর্ম হলো সমর্পণ’—কথাটি কোত্থেকে এলো? তার উৎস অন্য একটি শব্দ, ‘ইসলাম’, যার অর্থ ‘সমর্পণ’। প্রাচীন সেমিটিক ভাষা, তথা আরব্য ভাষা ও সংস্কৃতি, যাতে সব ধর্মেরই আদি উৎস নিহিত, তাতে ধর্মের নাম হলো ‘ইসলাম’। যেমনটি কোরআন শরিফে বলা আছে, মোটামুটি ভাষান্তরে, ‘খোদার নিকট ধর্ম হলো ইসলাম।’ আর ‘জিবরাইলের হাদিস’ বলে পরিচিত হাদিস শরিফ মতে, ধর্মের তিন বলয়—তার একটি ‘ইসলাম’, অর্থাৎ ‘সমর্পণ’; দ্বিতীয়টি ‘ঈমান’, অর্থাৎ বিশ্বাস; আর তৃতীয়টি ‘ইহসান’, অর্থাৎ ‘সুন্দরায়ণ’, অর্থাৎ বিশ্বাসভিত্তিক সমর্পণকে সুন্দর করে তোলা।

ধর্ম তাহলে অবশ্যই সমর্পণ, তথা ‘ইসলাম’, কিন্তু তা শুধুই সমর্পণ নয়, বিশ্বাসের বিকল্প হিসেবেও নয়, বরং বিশ্বাসে সমর্পণ, তাও সুন্দরভাবে। তার মাধ্যমে বিশ্বস্ততা অর্জন ও তার মাধ্যমে নিরাপত্তামূলক শান্তি অর্জন ও প্রতিষ্ঠা।

ধর্মকে বিশ্বাসের বিকল্পে বিশ্বাসবিহীন সমর্পণ হিসেবে উপস্থাপনের সুবাদে বুদ্ধিজীবী নির্বুদ্ধিমূলক আরেকটি ভ্রান্তির অবতারণা করে বলেন, ধর্ম হিসেবে ‘সমর্পণ’ হবে ‘গায়েব’-এ, যার ভয়ংকর ভ্রান্ত ‘অনুবাদ’ করেন তিনি অস্তিত্বহীন বলে। অর্থাৎ, তার মতে, ধর্ম হবে বিশ্বাসহীন এক সমর্পণ অস্তিত্বহীনের। ধর্মের আবহমানকালের চিরায়ত ধারণায় আসলে তো ধর্ম হলো সমর্পণ আল্লাহ, ‘গড’ বা ঈশ্বরের। এই নতুন কিছু করো মার্কা নতুন উদ্ভট ধারণায় ধর্ম যদি হয় অস্তিত্বহীনের সমর্পণ, তাহলে কি তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন যে, আল্লাহ, গড বা ঈশ্বর অস্তিত্বহীন? এ কি ধর্মের নামে নাস্তিকতার উপস্থাপন ও পসরা? তার এ ভ্রান্তিরও উৎস ভাষাবিভ্রাট! কোরআন শরিফে ধর্ম শিক্ষা দিতে গিয়ে যে বলা হয়েছে, ‘গায়েব’-এ ‘ঈমান’-এর কথা, তার ‘গায়েব’-এর চরম ভুল ‘অনুবাদ’ করেছেন তিনি ‘অস্তিত্বহীন’ বলে, অথচ আরবি ‘গায়েব’ শব্দের অর্থ আদৌ অস্তিত্বহীন নয়, বরং পঞ্চেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুধাবনের বাইরে যা, তা-ই। একটি লোক বহু দূরে দেখা যাচ্ছে না, তার কোনো শব্দও শোনা যাচ্ছে না, তার ঘ্রাণও পাওয়া যাচ্ছে না, স্পর্শ দিয়ে তাকে অনুভবও করা যাচ্ছে না, চেটে তার স্বাদও নেওয়া যাচ্ছে না—সে অবস্থায় সে ‘গায়েব’; তাই বলে সে অস্তিত্বহীন নয়।

‘গায়েব’-এ ঈমানের অর্থ তাই অস্তিত্বহীনের সমর্পণ নয়, পঞ্চেন্দ্রিয়াতীত অস্তিত্বমানে বিশ্বাস, আর ধর্ম, তথা ‘ইসলাম’ হলো সেই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই তাতে আত্মসমর্পণ।

বুদ্ধিজীবীর বুদ্ধি এভাবে অদৃশ্য বিশ্বাসে সমর্পণ করতে পারলে দেহ বেঁচে খাওয়া দেহজীবীতুল্য বুদ্ধি বেঁচে খাওয়া বুদ্ধিজীবী থেকে বোদ্ধাতে উত্তীর্ণ হয়ে ভ্রান্তির মায়াজাল থেকে মোহমুক্ত হতে পারেন। আমাদের মতো সাধারণ মানুষও। আর তার ফলে ইউটিউবের এসব ফেতনা থেকেও আমরা সবাই মুক্ত হতে পারি।

লেখক: প্রফেসর, ঢাকা ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশ ও বিদেশের বিবিধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূতপূর্ব শিক্ষক। যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি থেকে তুলনামূলক মার্কসবাদ, ধর্মীয় সংস্কৃতি, দর্শন ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ পদ্ধতির ওপর পড়াশোনাপূর্বক পিএইচডি অর্জন করেন।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

আর্কাইভ

Please select a date!

নামাজের সময়সূচী

তারিখঃ ১৯ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিঃ
ফজর ০৪:৪৬
জোহর ১১:৪৩
আসর ০৩:৪৪
মাগরিব ০৫:২১
ইশা ০৬:৩৩
সূর্যোদয় : ০৬:০৩ সূর্যাস্ত : ০৫:২১
অনলাইন জরিপ
ফলাফল
থার্টি-ফার্স্ট নাইটে তরুণদের জন্য প্রকাশ্যে পানি-টানি খাওয়ার বিরুদ্ধে আহ্বান। আপনার মন্তব্য দিন
হ্যা
100%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%