১০:২৫ পি.এম
ঝিনাইদহ জেলা ও উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির বিরুদ্ধে সরকারি নীতিমালা স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন, জালিয়াতি এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিতদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে সার ডিলারের তালিকা প্রস্তুত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর ২০২৬) দুপুরে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে নতুন ডিলারদের তালিকা প্রকাশের পরপরই পুরো জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনোনীতদের রাজনৈতিক পরিচিতি ও কর্মকাণ্ডের ছবি ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
প্রকাশিত তালিকা ও নীতিমালার বৈপরীত্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সার ডিলার নিয়োগের সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কোনো এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মরত শিক্ষক/কর্মচারী কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের নিকটাত্মীয় ডিলারশিপের অযোগ্য বলে গণ্য হবেন। কিন্তু হরিণাকুণ্ডু উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নে সালেহা বেগম মহিলা কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষক আনিচুরের স্ত্রী আনোয়ারা নাসরিনকে (যার মেয়ে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট) ডিলারশিপ প্রদান করা হয়েছে, যা নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রাজশাহীবাসী: রাসিক প্রশাসক
এছাড়া মনোনীত অধিকাংশ ডিলারের নিজস্ব কোনো উপযুক্ত সারের গুদাম বা ব্যাংকিং স্বচ্ছলতা নেই। ভুয়া ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট ও ভুয়া তথ্য দিয়ে এ তালিকা প্রস্তুতের অভিযোগ উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, সদর উপজেলার হলিধানী ইউনিয়নের আমির হোসেনের নিজস্ব কোনো গুদাম ও আর্থিক সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও জালিয়াতির আশ্রয়ে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে পাগলাকানাই ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া রাকিব হাসান বন্ধন সক্রিয় ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে পরিচিত। এ বিষয়ে ইবি ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক শাহেদ আহমেদ মন্তব্য করেছেন। আবার হরিণাকুণ্ডুর চাঁদপুর ইউনিয়নে ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলেও অলৌকিকভাবে ৮ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ডিলার নিয়োগের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বিএনপি পরিবারের সদস্য সাকিব হোসেন।
মনোনীতদের রাজনৈতিক পরিচিতি বিশ্লেষণ করে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদের ভাই আব্দুল লতিফ এবং জোড়াদহ ইউনিয়নে ওএমএস ডিলার লাল্টু মিয়া ডিলারশিপ পেয়েছেন।
মহেশপুর উপজেলা যুবলীগের সভাপতি হাসানের ভাই ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনার শ্যালক এহসান রেজা, পৌর এলাকায় স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ির কেয়ারটেকার হাবিবুর রহমান বুল্লা, যাদবপুর ইউনিয়নে আওয়ামী পরিবারের সদস্য সবুর খান এবং বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নে শাকিল রিয়াজ শুভর নাম রয়েছে তালিকায়।
আরও পড়ুন: অপ্রতিম হত্যা মামলার চার্জশিট শিগগিরই দাখিল হবে: কুমিল্লা পুলিশ সুপার
কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নে জেলা বিএনপি সভাপতির শ্যালকের স্ত্রী সুরমা হাসান এবং শিমলা-রোকনপুর ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সভাপতির চাচাতো শ্যালক নাজমুল হক মিশুর নাম অন্তর্ভুক্ত থাকায় এলাকায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাধুহাটী ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে জেলা বিএনপি সভাপতির কর্মচারী আনোয়ার হোসেনকে (যিনি আওয়ামী পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত) ডিলার করা হয়েছে।
নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তুলে মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দবির হোসেন উদ্দীন বিশ্বাস আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমার কাছে ৫ জন প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন। আমি সুনির্দিষ্ট নিরপেক্ষ তথ্য দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি আমরা যেন আবার সেই ‘নৌকার তলে’ চাপা পড়েছি! এভাবে চললে বিএনপি রাজনীতি করার কোনো মানে হয় না। জেলা পর্যায় থেকে সব নিয়ন্ত্রণ করার কারণে ত্যাগী নেতাকর্মীদের স্বজনরা বাদ পড়েছেন, এমনকি আমার ছেলের নামও তালিকায় রাখা হয়নি।”
স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করে ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনা বলেন, “আমার শ্যালক নিজে জেলা বিএনপির দায়িত্বশীল পদে রয়েছে, তাই সে আওয়ামী পরিবারের সদস্য—এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আর পুরো জেলার তালিকা কীভাবে বা কার মাধ্যমে হয়েছে, সে সম্পর্কে আমার কিছু জানা নেই।”
অভিযোগের তির হরিণাকুণ্ডু উপজেলা কৃষি অফিসার শরীফ মোহাম্মদ তিতুমীরের দিকে উঠলেও হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) প্রদীপ্ত রায় দীপন জানান, “আমার কাছে কোনো সার ডিলারের চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট পৌঁছায়নি। বিষয়টি নিয়ে আমি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সাথে কথা বলে বিস্তারিত জেনে জানাচ্ছি।”
আরও পড়ুন: বাকেরগঞ্জে প্রান্তিক পেশাজীবীদের ১০ দিনের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন, সনদ বিতরণ
এদিকে সার ডিলার তালিকায় নজিরবিহীন এই অনিয়ম, জালিয়াতি ও ক্ষোভের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি নোমান হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে কথা বলতে রাজি হননি। এছাড়া তালিকা প্রকাশের পর থেকেই বিএনপির নেতাকর্মীরা ফোন রিসিভ করা বন্ধ করে দেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন