০৪:৪৩ পি.এম
মাত্র ৩২ সেকেন্ডের একটি ফ্লাইট ভারতের এভিয়েশন খাতকে বদলে দিয়েছে। গোটা বিশ্বের এভিয়েশন খাতেও এয়ার ইন্ডিয়ার এআই-১৭১ ফ্লাইটের ৩২ সেকেন্ডের উড্ডয়নটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
গত বছরের ১২ জুন, অর্থাৎ ঠিক একবছর আগে, ভারতের আহমেদাবাদের সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের গ্যাটউইকের উদ্দেশ্যে উড্ডয়ন গ্রহণের ৩২ সেকেন্ডের মধ্যে পাশের বিজে মেডিকেল কলেজের হোস্টেল ও ক্যান্টিনের ওপর আছড়ে পড়েছিল। এই ঘটনায় সেদিন একজন যাত্রী ছাড়া পাইলট, যাত্রী, ক্রহকদের নিয়ে মোট ২৪১ জন এবং আছড়ে পড়া স্থানের ১৯ জনসহ মুুটো ২৬০ জন মানুষ প্রাণ হারান।
এয়ার ইন্ডিয়ার দুর্ঘটনা যেন অনেকের মনে ধুলার আস্তর জমিয়েছে। কিন্তু ২৬০টি পরিবার এখনও দিন কাটায় স্বজন হারানোর সেই ক্ষত নিয়ে।
আরও পড়ুন: ভারতে মুসলিম গরু ব্যবসায়ীদের ওপর হিন্দুত্ববাদীদের হামলা, উল্টো ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেই মামলা
সিতাবেন পাটানি একজন ঠেলাগাড়ি চালক, যিনি একটি ভ্রাম্যমাণ চায়ের স্টল চালাতেন। তার ১৫ বছরের কিশোর ছেলে আকাশ পাটানি মায়ের জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে এসেছিল। ঠিক সেই সময়েই ড্রিমলাইনার ৭৮৭ এয়ারক্র্যাফটটি তাদের মাথার ওপর ভেঙে পড়েছিল। কিশোর আকাশ তখন আকাশের তারা হয়ে যায়। সিতাবেন শরীরে থার্ড ডিগ্রি বার্ন নিয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন। নিজে যন্ত্রণায় কাতর হলেও তিনি বারবার সন্তানের খবর নিচ্ছিলেন। কিন্তু তখন তাকে সত্যিটা জানানো হয়নি।
প্রিয় নাতি আকাশের মৃত্যু শোক সহ্য করতে না পেরে ২০ দিন পর তার দাদা বাবুভাই পাটানি মারা যান। সন্তানের মৃত্যু, হাসপাতালে স্ত্রীর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই, সবকিছু মিলিয়ে অটোরিকশাচালক সুরেশভাই পাটানির জীবন এলোমেলো হয়ে যায়।
সেই দুঃখ বুকে চাপা দিয়ে তিনি স্ত্রীর চিকিৎসা চালিয়ে গেছেন। অসুস্থ শরীরে সিতাবেন শোকের ধাক্কা নিতে পারবেন না ভেবে তার কাছে কিছুই জানানো হয়নি। ছেলের মৃত্যুর এক মাস পর সিতাবেন জানতে পারেন। ছেলেকে শেষবারের মতো দেখতে না পারার বেদনা তাকে এখনও কুড়ে কুড়ে খায়। প্রতিদিন ছেলের কথা ভেবে তিনি চোখের জল ফেলেন।
কাঁদতে কাঁদতেই সাংবাদিকদের তিনি বললেন, ‘আমি শেষবারের মতো ছেলেটাকে দেখতেও পারিনি। আমার স্মৃতিগুলো ১২ জুনেই থমকে গেছে, যখন আকাশ বেঁচে ছিল। এরপর থেকে আমার স্মৃতি আর সামনে এগোয়নি এবং আমি মনে করি না কোনোদিন এগোবে।’
আরও পড়ুন: আইআরজিসির দাবি, হরমুজে দুটি তেলবাহী ট্যাংকার আটক
সিতাবেনের মতো ২৬০টি পরিবারে নিত্যদিনের হাহাকার বজায় রয়েছে। সরকারের ক্ষতিপূরণে আর্থিক সঙ্কট মিটেছে, তবে প্রিয়জনের বিনিময় কখনোই টাকায় মাপা সম্ভব নয়।
এআই-১৭১ দুর্ঘটনার পর ভারতের দ্রুত বড় হতে থাকা এভিয়েশন খাত বড় ধাক্কা খায়। এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম পড়ে যায়। তবে ২৬০ জন মানুষের জীবন দিয়ে ভারতের এভিয়েশন খাতের বড় উপকারও হয়েছে। নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি সতর্কতা আরো নিখুঁত হয়েছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সত্যিকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ‘সেফটি ফার্স্ট’ যেন কথার কথা হয়ে না যায়, সে চেষ্টাও চলছে। তবে ৩২ সেকেন্ডের একটি ফ্লাইটের দুর্ঘটনার তদন্ত একবছরেও শেষ না হওয়ায় অনেকেই ক্ষুব্ধ।
এআই-১৭১ ফ্লাইটটি আছড়ে পড়েছিল বিমানবন্দরের পাশের বিজে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের হোস্টেল ও ক্যান্টিনের ওপর। সেই সময়ের পর থেকে ভবন দু’টি হয়ে উঠেছে পরিত্যক্ত, যেন অভিশপ্ত কোনো ভৌতিক বাড়ি। তবে দুর্ঘটনার একবছর পর গুজরাটের স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল পানসারিয়া সেই পরিত্যক্ত ছাত্রাবাস ও ক্যান্টিন নিয়ে পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন।
নিহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি দুর্ঘটনার ক্ষত সারিয়ে সেখানেই সম্ভাবনার ফুল ফোটানোর ঘোষণা দেন। ৫৪৭ কোটি টাকা খরচ করে বিজে মেডিকেল কলেজের ক্যাম্পাস পুনর্নিমাণ করা হবে।
আরও পড়ুন: মাদক ও বেকারমুক্ত বান্দরবান গড়ার আহ্বান সাচিং প্রু জেরীর
তিনি বলেন, ‘বিজে মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসকে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যা মেডিকেল পড়ুয়াদের নতুন আশা দেবে।’ পুরানো ভাঙা ও পোড়া ভবনগুলো সরিয়ে ফেলা হবে। যে জায়গায় বিমানটি আছড়ে পড়েছিল, সেখানে প্যারাপ্লেজিয়া স্পাইন হাসপাতাল তৈরি হবে।
এর পাশে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার, ফিজিওথেরাপি কলেজ ও হোস্টেল তৈরি করা হবে। ১ লাখ ৭১ হাজার ১০০ স্কোয়ার মিটার জমিতে শিক্ষকদের জন্য ছয়টি কোয়ার্টার তৈরি করা হবে, যেখানে ১২০টি ফ্ল্যাট থাকবে। এছাড়া স্নাতক স্তরের পড়ুয়াদের জন্য দু’টি হোস্টেল ব্লক তৈরি করা হবে, সেখানে ৩৬৪টি রুম হবে। স্নাতকোত্তর স্তরের বিবাহিত শিক্ষার্থীদের জন্য ১৬১টি ইউনিট বরাদ্দ থাকবে। তাছাড়া মেস, ক্যান্টিনও থাকবে। নতুন ক্যাম্পাসে গুজরাটের ফার্মাসিউটিক্যাল টেস্টিংয়ের জন্য বিশ্বমানের ফুড অ্যান্ড ড্রাগস ল্যাবরেটরি তৈরি করা হবে।
বিজে হাসপাতালের নতুন ক্যাম্পাস এবং মেডিকেল হাবেই হয়তো বেঁচে থাকবে ২৬০ জনের স্মৃতি। এই হাসপাতালে সেবাগ্রহীতারা ভালো সেবা পেলে নিশ্চয়ই শান্তি পাবে দুর্ঘটনায় নিহত ২৬০ জনের আত্মাও।
আরও পড়ুন: সরকার আরো ১ লাখ এতিম-দুস্থ শিশুকে সহায়তা দেবে: সমাজকল্যাণমন্ত্রী
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন