০২:২১ পি.এম
ঢাকা, ৮ নভেম্বর, ২০২৬ : জাপানের পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লো, যা ‘সাশ্রয়ী মূল্যের প্রতীক’ হিসেবে পরিচিত, গত মাসে তাদের সাধারণ মোজার দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে ক্রেতাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত আগের অবস্থানে ফিরে আসতে বাধ্য হয়।
এটি জানানো হয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি’র মাধ্যমে।
ইতালীয় ধাঁচের পারিবারিক রেস্তোরাঁ চেইন সাইজেরিয়া তাদের জনপ্রিয় খাবার ‘মিলানিজ ডোরিয়া’র দাম ২০ ইয়েন (প্রায় ১৩ সেন্ট) বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রায় ক্ষমা চাওয়ার সুরে বিবৃতি দেয়। প্রতিষ্ঠানটি একই সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির জন্য নিজেদের যথেষ্ট চেষ্টা না করার বিষয়টিও স্বীকার করে।
আরও পড়ুন: মার্কিন রাষ্ট্রদূত: ইরান যুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের ‘শয়তান নিয়ন্ত্রণ করছে’
বিশ্বের অন্যতম পরিচিত পোশাক ব্র্যান্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রকাশ্য অস্বস্তি থেকে বোঝা যায়, মূল্যস্ফীতির কারণে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জাপানের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কতটা চাপের মধ্যে রয়েছে। কয়েক দশকের মূল্যহ্রাসের অভিজ্ঞতায় দেশটির ক্রেতাদের মধ্যে পণ্যের দাম বাড়ানোর বিষয়ে একধরনের অনীহা তৈরি হয়েছে।
গত মাসে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ব্যাংক অব জাপান) ঘোষণা দেয়, দেশটির মূল্যস্ফীতির হার নির্ধারিত ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছেছে। এর আগে টানা ১৩ বছর দেশটিতে অত্যন্ত শিথিল মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হয়েছে।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের ২০১৩ সালে ঘোষিত অর্থনৈতিক পদক্ষেপ এবং পরবর্তী সরকারগুলোর অব্যাহত প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য ছিল ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে চলতে থাকা দীর্ঘমেয়াদি মূল্যহ্রাসের প্রবণতা কাটিয়ে ওঠা।
তবে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানিসংকট তৈরি হওয়ার পর জাপানে মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। জাপান আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, কারণ দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত।
আরও পড়ুন: পোকেমন কার্ড কিনতে ৬ বছরের মেয়েকে একা রেখে যাওয়ায় বাবা গ্রেপ্তার
পরবর্তী সময়ে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি কমে যায়। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব পড়ে। ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
- ক্রেতাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ-
বিশ্বের অধিকাংশ দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্যের দাম বাড়াতে পারলেও জাপানের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। দেশটিতে পণ্যের দাম বাড়ানোকে অনেক ক্রেতা এখনো নেতিবাচকভাবে দেখছেন।
ক্রেতাদের অসন্তুষ্টির আশঙ্কায় বড় ও ছোট—সব ধরনের প্রতিষ্ঠানই প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্যের দাম বাড়াতে দ্বিধায় রয়েছে।
আরও পড়ুন: মার্কিন রাজ্য নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ে ৪ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিজয়ী
বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা অনেকাংশে দীর্ঘদিনের নিয়মিত ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল।
জাপানের পশ্চিমাঞ্চলীয় ওকায়ামা এলাকার ৬৮ বছর বয়সী রামেন দোকানের মালিক সাচি উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় ক্রমাগত বাড়লেও এখনো খাবারের দাম বাড়াননি।
সম্প্রতি টোকিও সফরকালে এএফপিকে তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে যদি ২০০ ইয়েন দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিই, তাহলে বছরের পর বছর ধরে যাঁরা আমার দোকানকে সমর্থন দিয়ে আসছেন, তাদের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হবে। তাদের কাছে দুঃখিতও মনে হবে।’
তিনি বলেন, ‘তাই আমার চিন্তা হলো, আমি নিজেই কষ্ট করে পরিস্থিতি সামলে নেব। আমার ধারণা, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীই এভাবে চিন্তা করেন।’
আরও পড়ুন: করাচির রেস্তোরাঁয় রোবটের মাধ্যমে খাবার পরিবেশন, ভোজনরসিকরা পাচ্ছেন ভবিষ্যতের স্বাদ
স্থানীয় গণমাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যের ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেদের ভাবমূর্তি ধরে রাখতেই ইউনিক্লো মোজার দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
অন্যদিকে, সাইজেরিয়া তাদের জনপ্রিয় ডোরিয়াসহ মেন্যুর প্রায় সব খাবারের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে এমন একটি বিবৃতি দেয়, যাকে অনেকেই নিজেদের প্রতি অতিরিক্ত কঠোর সমালোচনা হিসেবে দেখেছেন।
এমনকি প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট এক সংবাদ সম্মেলনে ভবিষ্যতে দাম আবার কমানোর সম্ভাব্য সব উপায় খুঁজে দেখার অঙ্গীকার করেন। তার এ বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের বিস্মিত করে।
তবে প্রতিষ্ঠানটি অন্যান্য কিছু পণ্যের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে। এর মধ্যে প্রতি গ্লাস মাত্র ১০০ ইয়েনের ওয়াইনও রয়েছে। এ বিষয়ে সাইজেরিয়ার জনসংযোগ বিভাগ এএফপিকে জানায়, ‘আমরা চাই মানুষ যেন সহজেই এটি উপভোগ করতে পারেন।’
আরও পড়ুন: নিউজিল্যান্ডের নির্বাচনে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, ২৭ নভেম্বর চূড়ান্ত ফলাফল
‘অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে’
নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় জাপানের পরিবারগুলোর হাতে অন্যান্য পণ্য কেনা কিংবা রেস্তোরাঁয় খাওয়ার জন্য আগের তুলনায় কম অর্থ থাকছে। অন্যদিকে, এসব খাতের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও শ্রমিকের মজুরি ও কাঁচামালের বাড়তি ব্যয়ের চাপে রয়েছে।
যদিও দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জাপানে প্রকৃত মজুরি টানা আট মাস ধরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে।
টোকিওর এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী কাজুহিকো সাতো বলেন, ‘খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। তাই এখন আমাকে বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর আগের চেয়ে বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। কারণ, দেশে উৎপাদিত পণ্যের দাম আরও বেশি।’
আরও পড়ুন: ক্যানসার অস্ত্রোপচারের পর পোপ লিও: ‘বেশ ভালো আছি’
তিনি বলেন, ‘এ কারণে বাইরে খাওয়াদাওয়াও কমিয়ে দিয়েছি।’
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত। দেশটিতে ঋণের সুদের হার ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভবিষ্যতে তা আরও বাড়তে পারে।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সুতোমু ওয়াতানাবে বলেন, ‘মজুরি বৃদ্ধি এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তাছাড়া এ সুবিধা সবাই পাচ্ছেন না।’
তিনি এএফপিকে বলেন, জি-৭-এর অন্যান্য দেশেও মূল্যস্ফীতির হার জাপানের সমান কিংবা তার চেয়ে বেশি। তবে সেসব দেশে মজুরি তুলনামূলকভাবে যথেষ্ট বেড়েছে। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও ব্যয় করার প্রবণতা তেমন দুর্বল হয়নি।
অর্থনীতিবিদের মতে, জাপানের সঙ্গে অন্য দেশগুলোর মূল পার্থক্য এখানেই। কয়েক দশকের মূল্যহ্রাসের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে দেশটির অর্থনীতি।
তিনি বলেন, জাপানে পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখনো ক্রেতাদের মনোভাবই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয়।
ওয়াতানাবে মনে করেন, মজুরি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতিকে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে জাপানের ক্রেতাদের মানসিকতা পরিবর্তনে আরও তিন থেকে চার বছর সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, ‘টানা ৩০ বছর মূল্যহ্রাসের পরিস্থিতিতে থাকার পর সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অভ্যস্ত হতে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা সময় প্রয়োজন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন