১১:৪১ এম
ঢাকা, ৩০ আগস্ট, ২০২৬ : ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ উত্তোলন ও ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রকে সুযোগ দিয়ে যে নতুন চুক্তি করা হয়েছে, তা নিয়ে দেশটির জনগণের মধ্যে সংশয় ও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। তবে, বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে, অনেকে চুক্তিটিকে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা হিসেবেও দেখছেন।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার চুক্তিটিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ পাবে।
আরও পড়ুন: রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় পুলিশের অভিযানে ২৮ জন গ্রেফতার, আইনগত ব্যবস্থা চলমান
কারাকাসের দাবি, এই চুক্তির মাধ্যমে বেসরকারি খাতে প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হবে। এর ফলে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রমাণিত তেলসম্পদের দেশ ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ শনিবার বলেন, চুক্তিটির লক্ষ্য হলো ভূগর্ভে পড়ে থাকা ‘নিষ্ক্রিয় ও অব্যবহৃত’ সম্পদকে কাজে লাগিয়ে তা ভেনেজুয়েলার জনগণের ‘সামাজিক ও অর্থনৈতিক কল্যাণের উৎসে’ পরিণত করা।
তবে, চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ না করায় ভেনেজুয়েলাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমনকি সরকারের সমর্থকদের মধ্যেও এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা, ভেনেজুয়েলার কম লাভ পাওয়ার সম্ভাবনা এবং এর রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
৬৮ বছর বয়সী নিরাপত্তাকর্মী যিশুস সালাজার বলেন, ‘এতে কার লাভ হবেÑভেনেজুয়েলার, নাকি যুক্তরাষ্ট্রেরÑআমরা জানি না।’
আরও পড়ুন: ক্যালিফোর্নিয়ায় সেলফ ড্রাইভিং টেসলার ধাক্কায় ৭১ বছর বয়সী বৃদ্ধ নিহত
তিনি আরও বলেন, ‘আমার সন্দেহ আছে। তবে কী হয়, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’
জানুয়ারিতে দীর্ঘদিনের শাসক নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত ও আটক করার পর থেকেই ভেনেজুয়েলা ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে।
মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে এর শর্ত হিসেবে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাসীন দল শনিবার জানিয়েছে, তারা এমন অর্থনৈতিক পদক্ষেপকে সমর্থন করে, যা ‘জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে এবং এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, একতরফা চাপমূলক ব্যবস্থা ও অন্যায্য অবরোধের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে।’
আরও পড়ুন: নাসিমা আক্তার: আসামিরা আমার সামনেই বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়
ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি ধসে পড়ার জন্য দেশটির সরকার দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করে আসছে।
রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলার খনিজ ও জ্বালানি খাতে একাধিক সংস্কার এনেছেন। এর মাধ্যমে আগে কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা এসব খাত বেসরকারি মূলধন ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটন মাদুরো সরকারের আমলে ভেনেজুয়েলার তেল খাতের ওপর আরোপ করা কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে।
গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ভেনেজুয়েলায় তেল উৎপাদন ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে দৈনিক ১২ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। তবে, প্রায় ২৫ বছর আগে দেশটি যে দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করত, বর্তমান উৎপাদন এখনো তার তুলনায় অনেক কম।
আরও পড়ুন: মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসনবিরোধী ধরপাকড়, আতঙ্কে প্রবাসীরা
নতুন মার্কিন চুক্তির লক্ষ্য উৎপাদনকে আবার সেই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ লক্ষ্য অর্জনে সময় লাগবে।
কারাকাসের ইনস্টিটিউট অব হায়ার স্টাডিজ ইন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইইএসএ)-এর অধ্যাপক ও প্রকৌশলী অসওয়ালদো ফেলিজোলা বলেন, ‘উৎপাদন বাড়ার প্রভাব দেখতে অন্তত তিন থেকে চার বছর সময় লাগবে।’
ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ‘গ্যারান্টার’ হিসেবে ভূমিকা রাখার উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। কারণ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারেনি।
তিনি বলেন, এটি না হলে আগামী ১০ বা ১৫ বছরে এই ক্ষেত্রগুলোর উন্নয়ন হবে না। কারণ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পেট্রোলিওস দে ভেনেজুয়েলা (পিডিভিএসএ) কাছে এ কাজ করার মতো পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা নেই।
আরও পড়ুন: মার্কিন নির্বাচনে রেকর্ড ১৮ হাজার কোটি টাকার অনুদান, শীর্ষে ইলন মাস্ক
এত বড় একটি উদ্যোগ ভেনেজুয়েলার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে ত্বরান্বিত করতে পারে। ২০১৪ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশটির অর্থনীতি ভয়াবহভাবে ৮০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছিল। এতে লাখ লাখ ভেনেজুয়েলাবাসী দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যান।
দেশটির অনেক মানুষ এখন মাসে মাত্র ১৬ সেন্টের সমপরিমাণ ন্যূনতম মজুরি দিয়ে জীবনযাপন করেন। এর সঙ্গে সরকারি ভর্তুকি হিসেবে মাসে সর্বোচ্চ ২৪০ ডলার পর্যন্ত পাওয়া যেতে পারে। তারপরও পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার কিনতে আনুমানিক ৭৩০ ডলার প্রয়োজন।
সংশয়ের পাশাপাশি আশাবাদও
৭৪ বছর বয়সী সরকারি কর্মকর্তা কার্লোস বাকো আশা করছেন, নতুন চুক্তির মাধ্যমে তেল থেকে আয় আসা শুরু হবে। তবে গত কয়েক মাসে তেল উৎপাদন বাড়লেও তার ব্যক্তিগত জীবনে এর কোনো সুফল তিনি দেখতে পাননি।
আরও পড়ুন: তাইজ শহরে হুথিদের অবরোধ: ৮ লাখ মানুষ খাদ্য ও পানির সংকটে
তিনি বলেন, ‘ভোগ্যপণ্য ও খাবারের দাম বেড়েই চলেছে, ডলারের দাম বাড়ছে, আর এর সঙ্গে পণ্যের দামও বাড়ছে। এখানে জীবনযাপন অসম্ভব।’
রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, নতুন চুক্তি থেকে সরকার ২০ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বেশি কর রাজস্ব পেতে পারে। তবে কীভাবে এই রাজস্ব আসবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
অরিনোকো থিংকট্যাংকের বিশ্লেষক এলিয়াস ফেরারও চুক্তিটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, যদিও এর বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এটি আগের অবস্থার চেয়ে ভালো। আগে এই তেল উত্তোলন করা হচ্ছিল না। কেউ তেল উত্তোলন না করলে রয়্যালটি দেয় না, লাভও হয় না।’
ভেনেজুয়েলার সাবেক জ্বালানি উপমন্ত্রী ও আইনজীবী ডলোরেস ডোবারো বলেন, ‘সবকিছু সঠিকভাবে করা হলে এটি ভেনেজুয়েলার তেল খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন