০৪:৫৭ এম
সাধারণত কাশির কারণে গলা বা বুকে সাময়িক অস্বস্তি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি প্রতিবার কাশির সঙ্গে মাথায় তীব্র ঝটকা বা ব্যথা অনুভূত হয়? আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হলেও, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় কাশি, হাঁচি, হাসা বা অতিরিক্ত শারীরিক কসরতের সময় মাথাব্যথা হওয়াকে ‘কফ হেডেক’ বা কফজনিত মাথাব্যথা বলা হয়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই মাথাব্যথা সাময়িক এবং ক্ষতিকারক নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, কখনো কখনো এটি শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অত্যন্ত গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার পূর্বলক্ষণ হতে পারে।
আরও পড়ুন: শীতের ছুটিতে ঘুরে আসুন বাংলাদেশের ৮ দর্শনীয় স্থান
ভারতের বসন্ত কুঞ্জের ফোর্টিস হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের পরিচালক ড. মনোজ শর্মা বলেন, কাশি দিলে যদি নিয়মিত মাথাব্যথা হয়, তবে তা অবহেলা করা উচিত নয়—বিশেষ করে যখন ব্যথা তীব্র হয় অথবা সঙ্গে অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেয়।
কফজনিত মাথাব্যথা আসলে কি?
কাশি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বা মাথার ভেতরের চাপ বাড়িয়ে দেয় এমন কোনো কাজ (যেমন: হাঁচি দেওয়া, উচ্চস্বরে হাসা, সামনের দিকে ঝুঁকে পড়া বা মলত্যাগের সময় চাপ দেওয়া) করার ঠিক পরপরই যে মাথাব্যথা শুরু হয়, তাকে কাফ হেডেক বলা হয়।
ড. শর্মা ব্যাখ্যা করেন, ‘কফজনিত মাথাব্যথা মূলত দুই প্রকার। প্রথমটি হলো প্রাইমারি কফ হেডেক, যা সাধারণত ক্ষতিকারক নয়। কাশি বা অতিরিক্ত চাপের কারণে মাথার খুলির ভেতরে হঠাৎ রক্ত ও তরলের চাপ বেড়ে যাওয়ার ফলে এই ব্যথা হয়। এটি মাত্র কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিটের মধ্যে স্থায়ী হতে পারে।’ এই ব্যথা যদিও অত্যন্ত তীব্র বা হঠাৎ ফেটে পড়ার মতো অনুভূতি তৈরি করে, তবে সাধারণভাবে এর পেছনে কোনো গুরুতর রোগ থাকে না।
আরও পড়ুন: মেঘমুক্ত আকাশে পঞ্চগড় থেকে দৃশ্যমান কাঞ্চনজঙ্ঘা, উচ্ছ্বসিত প্রকৃতিপ্রেমীরা
ব্যথার পেছনের মূল কারণ:
যখন কোনো ব্যক্তি জোরে কাশি দেন, তখন বুক এবং পেটের ভেতরের চাপ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই আকস্মিক চাপ মাথার খুলির ভেতরের রক্তপ্রবাহ এবং তরল গতিবিদ্যার ওপর সাময়িক প্রভাব ফেলে। এর ফলে হঠাৎ করে মাথায় তীব্র, ধারালো বা ছুরিকাঘাতের মতো ব্যথা অনুভূত হয়। আনন্দের কথা, এই ব্যথা কয়েক মিনিটের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায় এবং এজন্য দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।
কখন এটি গুরুতর রূপ নিতে পারে?
সব কাশির মাথাব্যথা কিন্তু নিরীহ নয়। চিকিৎসকরা প্রাইমারি মাথাব্যথার পাশাপাশি সেকেন্ডারি কফ হেডেককে আলাদাভাবে চিহ্নিত করেন, যা শরীরের অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট রোগের কারণে ঘটে থাকে।
আরও পড়ুন: বুধবার ১২ রাশির অর্থভাগ্যে সতর্কতা, জেনে নিন রাশিফল
ড. শর্মা বলেন, ‘সেকেন্ডারি কফ হেডেকের পেছনে মস্তিষ্ক বা এর চারপাশের কাঠামোগত সমস্যা দায়ী থাকতে পারে। যেমন—সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (মস্তিষ্কের তরল) প্রবাহে বাধা, মস্তিষ্কের গঠনে কোনো ত্রুটি কিংবা বিরল ক্ষেত্রে ব্রেন টিউমার।’
এই ধরনের রোগীদের মধ্যে কাশি মূলত মূল রোগটিকে সামনে নিয়ে আসার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, কাশি নিজে ব্যথার মূল কারণ নয়।
যেসব উপসর্গ দেখলে অবিলম্বে সতর্ক হবেন:
সেকেন্ডারি কফ হেডেক সাধারণত প্রাইমারি হেডেকের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হয়ে থাকে এবং দীর্ঘ সময় স্থায়ী হতে পারে। এর সঙ্গে কিছু স্নায়বিক বা নিউরোলজিক্যাল উপসর্গ দেখা দেয়, যা বিপদের লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত:
আরও পড়ুন: ৫৩ বছরেও ফিট থাকার জন্য শচীন ছেড়ে দিলেন দুই বদঅভ্যাস
মাথা ঘোরানো
হাঁটতে সমস্যা হওয়া বা শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারা
দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হওয়া বা দ্বৈত দৃষ্টি
হাত বা পায়ে দুর্বলতা অনুভব করা
আরও পড়ুন: ২৮ অক্টোবর: ইতিহাসের এই দিনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনা
শরীরে অবশ ভাব বা সুই ফোটার মতো অনুভূতি
অনবরত বমি হওয়া
মানসিক বিভ্রান্তি বা হ্যালুসিনেশন
হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
আরও পড়ুন: ‘পর্যটন মেলা, ২০২৬’ বৃহস্পতিবার শুরু, প্রযুক্তি ও টেকসই পর্যটন নিয়ে আলোচনা
উপরের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিৎ।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?
কাশি দেওয়ার পর মাঝেমধ্যে হালকা মাথাব্যথা হওয়া উদ্বেগের কারণ না হলেও ড. শর্মার মতে নিচের পরিস্থিতিগুলোতে অবিলম্বে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি:
১. জীবনে প্রথমবার কাশির সঙ্গে এমন মাথাব্যথা হলে।
২. ব্যথা যদি অত্যন্ত তীব্র হয় এবং দিন দিন বাড়তে থাকে।
৩. মাথাব্যথা যদি কয়েক মিনিটের চেয়ে বেশি সময় স্থায়ী হয়।
৪. ব্যথার সঙ্গে যদি জ্বর থাকে।
৫. বিভ্রান্তি বা অজ্ঞান হওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে।
৬. চোখের দৃষ্টিতে সমস্যা দেখা দিলে।
চিকিৎসক প্রথমে রোগীর পূর্ববর্তী স্বাস্থ্য ইতিহাস এবং লক্ষণগুলো পর্যালোচনা করবেন। কোনো সন্দেহজনক লক্ষণ পাওয়া গেলে, ড. শর্মার ভাষ্য অনুযায়ী, মস্তিষ্কের কোনো কাঠামোগত ত্রুটি বা তরল প্রবাহের সমস্যা আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে এমআরআই বা সিটি স্ক্যান করার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।
চিকিৎসা:
প্রাইমারি কফ হেডেকের ক্ষেত্রে: লক্ষণ ও ব্যথার তীব্রতা কমানোর জন্য নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যা নিজেই ঠিক হয়ে যায়।
সেকেন্ডারি কাফ হেডেকের ক্ষেত্রে: এর চিকিৎসা পুরোপুরি নির্ভর করে মূল রোগটি কী, তার ওপর। রোগ নির্ণয়ের পর ব্যক্তিগত ওষুধ, বিশেষায়িত নিউরোলজিক্যাল কেয়ার কিংবা প্রয়োজনভেদে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের শেষ পরামর্শ:
কাশি দিলেই মাথায় ব্যথা হওয়া কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। বিশেষ করে এটি যদি নতুন শুরু হয় এবং তীব্র হয়, তবে ঘরে বসে নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার মাধ্যমে সম্ভাব্য বড় ধরনের বিপদ এড়ানো সম্ভব এবং এতে মানসিক স্বস্তিও ফেরে।
সূত্র: এনডিটিভি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন