১২:৩৮ পি.এম
লেবাননে ইসরাইলি হামলার ফলে হরমুজ প্রণালী আবারও বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সদ্য হওয়া ভঙ্গুর সমঝোতা নতুন সংকটে পড়েছে।
একই সময়ে, দুই দেশের প্রতিনিধিরা সুইজারল্যান্ডে আলোচনায় বসতে রওনা হয়েছেন।
শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে পরবর্তী দফার আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইসরাইলের চার সেনা নিহত হওয়ার পর, লেবাননে প্রাণঘাতী হামলা চালানোর ফলে শেষ মুহূর্তে সেই বৈঠক স্থগিত করা হয়।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এই খবর জানিয়েছে। এরপর শুক্রবার, ওয়াশিংটন নতুন করে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়। এটি ছিল ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতার একটি শর্ত।
কিন্তু শনিবার আবারও দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি সেনা ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘চুক্তি ভঙ্গ’ ও ‘দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধবিরতি অব্যাহতভাবে লঙ্ঘনের’ অভিযোগ এনে ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড ঘোষণা করে, ‘হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকবে।’
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ ইউনিটও জাহাজগুলোকে ওই জলপথের কাছাকাছি না যেতে সতর্ক করে। তারা জানায়, সেখানে গেলে জাহাজগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে।
আরও পড়ুন: আজ ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ, ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮
বিশ্বের তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী। যুদ্ধ চলাকালে এটি দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনেক বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
চলতি সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ার মধ্যে হওয়া প্রাথমিক সমঝোতার অংশ হিসেবে তেহরান প্রণালীটি পুনৰায় খুলতে রাজি হয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে জাহাজ চলাচলও স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
কিন্তু ইরানের নতুন ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, আন্তর্জাতিক এই নৌপথে নিরাপদ চলাচল এখনো বজায় রয়েছে। মার্কিন বাহিনী সেখানে উপস্থিত এবং সতর্ক অবস্থানে আছে।
পরে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন যে, আলোচকরা যদি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হন, তাহলে ওয়াশিংটন নিজস্ব টোল আরোপ করতে পারে।
আরও পড়ুন: নেতানিয়াহুর জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, তবু ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা
ট্রুথ সোস্যালে তিনি লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আরোপিত না হলে কোনো টোল থাকবে না।’
-সুইজারল্যান্ডমুখী প্রতিনিধিদল-
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, শনিবার বিকেলে একটি প্রতিনিধি দল সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। এতে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি রয়েছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেন, সমঝোতায় অন্য পক্ষের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি জানাবে ইরান। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘তা না হলে, পুরো সমঝোতাই ঝুঁকির মুখে পড়বে।’
আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে কারাগারে ফিরলেন সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হক, পলক ও মামুন
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও শনিবার বিকেলে সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে ওয়াশিংটন ছাড়েন। তিনি বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি এক বা দুই দিনের বেশি থাকতে পারব না। আশা করছি, পারমাণবিক ইস্যুতে অগ্রগতি হবে।’
ভ্যান্স আরও বলেন, লেবাননের যুদ্ধবিরতির বিষয়েও অগ্রগতি হবে। এ দুটিই আমাদের প্রধান আলোচ্য বিষয়। ইরানও নিশ্চয়ই তাদের কিছু বিষয় তুলে ধরবে।
তিনি বলেন, মার্কিন আলোচক জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ ইতোমধ্যে সেখানে অবস্থান করছেন। তারা কৌশলগত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছেন এবং তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী আলোচনা ইতিবাচকভাবেই এগোচ্ছে।
মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান জানিয়েছে, রোববার সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে কৌশলগত পর্যায়ের আলোচনা হবে। এতে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
আরও পড়ুন: নেতানিয়াহুর দাপট কমে, ইসরাইলে ক্ষমতার চাবি ফিলিস্তিনিদের হাতে
প্রাথমিক সমঝোতায় অমীমাংসিত থেকে যাওয়া বিষয়গুলো, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই মাসব্যাপী আলোচনার সূচনা করাই এই বৈঠকের লক্ষ্য। সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নিশ্চিত করেছে যে, বিদেশি প্রতিনিধিরা সংলাপ অব্যাহত রাখতে কাজ করছেন।
-লেবাননে যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন উত্তেজনা-
শনিবারও ইসরাইল ও হিজবুল্লাহ পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চালিয়ে যায়। দক্ষিণাঞ্চলে সংঘর্ষও অব্যাহত থাকে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, যুদ্ধে তাদের এক সেনা নিহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা হওয়ার পর এটি পঞ্চম সেনা মৃত্যুর ঘটনা।
আরও পড়ুন: মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় হানিফসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে আজ রায়
পরে এক ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশে সেনাবাহিনীকে যুদ্ধবিরতি মানতে বলা হয়েছে। বাহিনী কোনো আগ্রাসী হামলা চালাচ্ছে না এবং নিরাপত্তা অঞ্চলের ভেতরে শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ অভিযোগ করে, যুদ্ধবিরতির আড়ালে ইসরাইল নাবাতিয়েহ শহরের ওপর নজর রাখা কৌশলগত আলি তাহের পাহাড়ের দিকে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়। তাদের যোদ্ধারা ‘উপযুক্ত অস্ত্র’ দিয়ে জবাব দিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দেশটির প্রায় ২০টি স্থানে ইসরাইলি বিমান হামলা হয়েছে। দেশটির সিভিল ডিফেন্স সংস্থা জানিয়েছে, নাবাতিয়েহ এলাকায় ১৬ জন নিহত হয়েছেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাইদনের কাছে এক হামলায় আরও সাত জন নিহত এবং ১৩ জন আহত হয়েছেন। চলমান সংঘাতে মোট মৃতের সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়েছে বলেও তারা জানিয়েছে।
হিজবুল্লাহর আইনপ্রণেতা হাসান ফাদলাল্লাহ বলেছেন, শত্রুপক্ষ হামলা চালালে, তার জবাব দেওয়ার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়েল লেইটার দাবি করেছেন যে যুদ্ধবিরতি ভেঙেছে হিজবুল্লাহ। ইসরাইল শুধুমাত্র সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করছে।
তবে হিজবুল্লাহ বলছে, ঘটনার সম্পূর্ণ দায় ইসরাইলের। দক্ষিণ লেবাননের তাইর দেব্বা শহর থেকে পালিয়ে যাওয়া ফাদি জায়াত বলেছেন, ‘পুরো দক্ষিণাঞ্চলে এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে।’
৫৩ বছর বয়সী এই বাসিন্দা বলেন, ‘কয়েক দিন আগে আমরা গ্রামে ফিরেছিলাম। কিন্তু আবার পালানোর জন্য ব্যাগ গুছিয়ে প্রস্তুত রেখেছি।’
মার্চের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় হিজবুল্লাহ ইসরাইলের দিকে রকেট ছোড়ে। এর মধ্য দিয়েই সংগঠনটি বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
এপ্রিল মাসে লেবাননে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল এমন একটি যুদ্ধবিরতিও বাস্তবে কখনো কার্যকর হয়নি। উভয় পক্ষই প্রতিপক্ষের কথিত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে হামলা চালিয়ে গেছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন