১১:৫৪ এম
ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর জাপোরিঝঝিয়াতে রাশিয়ার হামলা নতুন একটি মাত্রা পেয়েছে। সামনের যুদ্ধরেখা থেকে মাত্র ২৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শহরটিতে এখন নিয়মিতভাবে হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে স্কুল, সরকারি অফিস, গণপরিবহন, জ্বালানি স্টেশন ও আবাসিক ভবন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে এবং প্রতিটি দিন এখন আতঙ্কের মধ্যেই কাটছে।
ভোর পাঁচটার একটু আগে জাপোরিঝঝিয়ার বাসিন্দা আন্না হলোভচেঙ্কোর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে রুশ বাহিনীর গ্লাইড বোমার বিস্ফোরণের শব্দে। শহরের উপকণ্ঠে একের পর এক বোমা আঘাত হানার পর মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে শুরু হয় ড্রোন হামলার নতুন একটি দফা। ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ড্রোনগুলো ভূপাতিত করার চেষ্টা চালালেও বিস্ফোরণের শব্দে পুরো শহর কেঁপে ওঠে।
আন্না তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, এরপর আর ঘুমানোর সুযোগ ছিল না। তিনি দ্রুত কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। কিছুক্ষণ পরে একটি ইরানি নকশার শাহেদ ড্রোন তার কর্মস্থলের কাছেই বিস্ফোরিত হয়। আরেকটি ড্রোন বিদ্যুতের তারে আঘাত করলে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
আরও পড়ুন: অক্টোবর মাসে হুথিদের ওপর ৪০ হাজার হামলা, নিহত ও আহত ২০ হাজার
তার কথায়, “জাপোরিঝঝিয়ায় এখন এটাই স্বাভাবিক একটি দিনের চিত্র।”
গত কয়েক সপ্তাহে শহরের বিভিন্ন স্কুল, সরকারি অফিস, জ্বালানি স্টেশন, গণপরিবহনের বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং বহু আবাসিক ভবনে হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী।
জাপোরিঝঝিয়ার ভারপ্রাপ্ত মেয়র রেজিনা খারচেঙ্কো জানিয়েছেন, একদিনের তীব্র হামলার সময় তিনি আশ্রয়কেন্দ্রে না গিয়ে নিজের বাসার বাথরুমে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তিনি মন্তব্য করেছেন, “শত্রুপক্ষ এখন বেসামরিক মানুষ, পৌর পরিবহন, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস, আবাসিক ভবন, এমনকি শিশুদেরও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।”
ক্রমবর্ধমান হামলার মুখে জাপোরিঝঝিয়া সিটি কাউন্সিলকে সম্প্রতি ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে বৈঠক করতে হয়েছে, যেখানে শহরের নিরাপত্তা জোরদারে নতুন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ড্রোন প্রতিরোধী জাল বসানো এবং স্কুল, হাসপাতাল ও সরকারি ভবনের জানালায় বিস্ফোরণ-প্রতিরোধী বিশেষ সুরক্ষা ফিল্ম লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: ১০০ টাকার জন্য কলেজছাত্রী পিংকির মর্মান্তিক মৃত্যু
মেয়র খারচেঙ্কো জানিয়েছেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবেও খুব ভয় পাই। রাতে অনেক সময় নিজের অ্যাপার্টমেন্টের করিডরের মেঝেতে ঘুমাই। আমি সাধারণ একজন মানুষ, আমার ব্যক্তিগত কোনও বাঙ্কার বা দেহরক্ষী নেই।”
ইউক্রেনীয় বাহিনী কিছু এলাকায় রুশ সেনাদের শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার পিছিয়ে দিতে সক্ষম হলেও হামলা কমেনি; বরং বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম কারণ হলো এখন রাশিয়া ছোট আকারের কিন্তু অত্যন্ত প্রাণঘাতী ফার্স্ট-পার্সন-ভিউ (এফপিভি) ড্রোন ব্যবহার করছে, যা আগে এত দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারত না।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট-এর সামরিক বিশ্লেষক স্যাম ক্র্যানি-ইভানস জানিয়েছেন, রুশ বাহিনী এখন দীর্ঘপাল্লার ‘মাদারশিপ’ ড্রোন ব্যবহার করছে, যেগুলো বহন করে নিয়ে যায় একাধিক ছোট ড্রোন। পরে সেগুলো আলাদা হয়ে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।
তিনি আরও যোগ করেছেন, রাশিয়া এখন ‘মেশ নেটওয়ার্কিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যেখানে একটি ড্রোন অন্য ড্রোনের মাধ্যমে রেডিও সংকেত আদান-প্রদান করতে পারে। ফলে ইলেকট্রনিক জ্যামিং এড়ানো সহজ হয় এবং অনেক দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়।
আরও পড়ুন: এনসিপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতার কিছু অংশ অন্য ফ্রন্টে সরিয়ে নেওয়া জাপোরিঝঝিয়ায় রুশ হামলার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, জুন মাসের শেষ সপ্তাহে জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে রাশিয়ার ৮৮৪টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনী।
যদিও দক্ষিণাঞ্চলে রুশ বাহিনী কিছুটা পিছিয়ে গেছে, তবু ইউক্রেনের অন্য কয়েকটি ফ্রন্টে তারা ধীরগতিতে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে ইউক্রেন সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার তেল শোধনাগার, জ্বালানি সংরক্ষণাগার এবং দখলকৃত অঞ্চলের সরবরাহ ব্যবস্থায় ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে রুশ সেনাদের অগ্রযাত্রা কিছুটা বাধাগ্রস্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যেও জাপোরিঝঝিয়ার কয়েক লাখ মানুষ এখনো শহর ছেড়ে যাননি। বাসিন্দা আন্না হলোভচেঙ্কো বলেন, “আমাদের খাবার আছে, জ্বালানি আছে। তাহলে কেন চলে যাব? হয়তো আমি সহজে ভয় পাই না।”
আরও পড়ুন: শিবালয়ে ওয়াই আকৃতির দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের নীতিগত সিন্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বিএনপির আনন্দ র্যালি
তবে তিনি স্বীকার করেছেন, শহর ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা মাঝে মাঝে মাথায় আসে। তারপরও তিনি চান না, জাপোরিঝঝিয়াও ইউক্রেনের অন্য ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া শহরগুলোর কাতারে নাম লেখাক।
তার কথায়, “আমরা শুধু নিরাপদে থাকার চেষ্টা করছি। বিজয় না আসা পর্যন্ত টিকে থাকার জন্য যা যা করা দরকার, তাই করছি।”
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন