১২:৪৬ পি.এম
সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নূর ইসলামের মদের ব্যবসা মূলত বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে চলে। সাধারণ একটি রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স নিয়ে তিনি দেশের সবচেয়ে বড় মদের বার আইরিশ পাব পরিচালনা করেন। বিষয়টি শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের একটি অভিযানে প্রকাশ পায়। এই অভিযানের ফলে শুল্ক কর্মকর্তারা বিপাকে পড়েন। ফৌজদারি মামলা হঠাৎ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে এই মামলা পুলিশের সিআইডিতে স্থানান্তরিত হয়। তবুও আইরিশ পাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ নূর ইসলাম চাপ প্রয়োগ করে নিজেদের পক্ষে প্রতিবেদন নেন।
কালবেলা সূত্রে জানায়, কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানির লাইসেন্সের আড়ালে নূর ইসলাম বারের মদ, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ও ফার্নিচার আমদানি করতেন। এর ফলে শুল্ক গোয়েন্দা পণ্যগুলো জব্দ করে। তবে পরবর্তীতে তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এছাড়া, আইরিশ পাবের কাছে বৈধ কোনো নথিপত্র নেই, যদিও তারা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হাজার হাজার লিটার বিদেশি মদ বিক্রি করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্ত্রী এবং শ্বশুর-শাশুড়ির পুরো পরিবার মদের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাদের দাবি, তারা দেশের আইন মেনে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তবে ২০২১ সালে রাজধানীর নিউ জুরাইনে আইরিশ পাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট লিমিটেডে অভিযানের পর কিছু প্রমাণ উঠে আসে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের একটি টিম আইরিশ পাবে অভিযান চালায়। অভিযানে স্কটল্যান্ড ও লন্ডন থেকে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ ইম্পেরিয়াল হুইস্কি এবং দামি ব্র্যান্ডের ভদকা পাওয়া যায়। এই বিদেশি মদের আমদানির বৈধ নথিপত্র শুল্ক কর্মকর্তাদের দেখাতে পারেনি। ফলে বিদেশি মদ জব্দ করা হয়।
আরও পড়ুন: আলিম পাসের পরদিনই বাসচাপায় প্রাণ গেল সাকিবের
আইরিশ পাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, এসব বিদেশি মদ পর্যটন করপোরেশন থেকে কেনা হয়েছে। তবে তারা এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। অবৈধভাবে আমদানি করা মদের জন্য রাজধানীর কদমতলী থানায় ফৌজদারি মামলা দায়ের করে শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে, ২০১৬ সালের নথিপত্র নিজেদের কাছে রেখে ২০১৯ সালে উৎপাদিত মদও বিক্রি করেছে আইরিশ পাব কর্তৃপক্ষ। এতে কর্মকর্তারা অবৈধ চোরাচালানের বিষয়টি নিশ্চিত হন। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সফিউর রহমান কালবেলাকে বলেন, "আইরিশ পাবে একটি অভিযান হয়েছিল। বিষয়টি আমি শুনেছি। ওই সময়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অন্য কিছু থাকলে আমরা বিষয়টি দেখব।"
সূত্র জানায়, সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নূর ইসলাম আইরিশ পাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। তার স্ত্রী শিলা ইসলাম ছিলেন চেয়ারম্যান এবং পরিচালক হিসেবে ছিলেন সালমান মুক্তাদিরের স্ত্রী দিশা ইসলাম। আইরিশ পাবের মোট শেয়ারের সিংহভাগ ছিল শেখ নূর ইসলাম পরিবারের কাছে। শেখ নূর ইসলামের নামে ৪ হাজার শেয়ার, শিলা ইসলামের নামে ৩ হাজার, দিশা ইসলাম ও তাসনীম ইসলামের নামে দেড় হাজার করে মোট তিন হাজার শেয়ার ছিল। সব মিলিয়ে নূর ইসলাম পরিবারের কাছে ছিল ১০ হাজার শেয়ার।
এরপর শেখ নূর ইসলাম দেলওয়ার হোসেন ও সেলিমুজ্জামানের কাছে কৌশলে সব শেয়ার হস্তান্তর করেন। শেয়ার ছেড়ে দিলেও তিনি মূলত ছিলেন। আইরিশ পাব অ্যান্ড বার লিমিটেড নামে শুরু করে এবং বুড়িগঙ্গার তীরের কাছে একটি গুদাম তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ মদের চালান আনতে তিনি এই পথকে বেছে নিতেন।
আরও পড়ুন: গ্যাস ও তেলের খনির সম্ভাবনা, আগুনের তীব্রতা কমলে রিলিফ কূপ খনন হবে
একাধিক শুল্ক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পানগাঁও কাস্টম হাউসে নদীর প্রশস্ততা তুলনামূলক কম। কাস্টম হাউসের জেটিতে জাহাজ ভিড়লে পেছনের অংশ নদীর ওই পারের কাছাকাছি চলে যায়। এই সুযোগে একটি চক্র বিদেশি মদের চালান সহজেই নিয়ে যায় এবং গুদামজাত করে। তবে এ বিষয়ে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। বিদেশি মদের বিশাল মজুদ এবং বিক্রি কিভাবে সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে তিনি ডোমিনোজ পিৎজার আদলে ডোমিনাস লিমিটেড নামে একটি মদের বারের লাইসেন্স নেন। পরবর্তীতে কোনো ধরনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স বারের লাইসেন্সে পরিণত করেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
আইরিশ পাবে অভিযান পরিচালনা করা এক শুল্ক কর্মকর্তা বলেন, "আইরিশ পাবে অভিযান পরিচালনা করার পর থেকে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি।" বিদেশি মদ বিক্রির বিপরীতে আইরিশ পাবের কাছে কোনো বিল অব এন্ট্রির নথিপত্র ছিল না।
আরও পড়ুন: ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক শফিকুল, সদস্যসচিব জাহাঙ্গীর মনোনীত
অভিযানে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) অনুমোদনবিহীন ৫৭ সেট ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়। কর্মকর্তারা বলছেন, আইরিশ পাবের সাবেক মালিকরা প্রভাব খাটিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত বাধাগ্রস্ত করেছেন। যার কারণে থানা থেকে মামলা প্রথমে পিবিআই, পরবর্তীতে সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ নূর ইসলাম বলেন, "আইরিশ পাব অ্যান্ড বার অনেক আগেই আমি বিক্রি করে দিয়েছি।" রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স নিয়ে মদের বার চালানো এবং তদন্ত বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। বর্তমানে তিনি এসব কিছুর সঙ্গে নেই বলেও জানান নূর ইসলাম।
সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের ফু-ওয়াংসহ ৪ বারে অভিযান চালিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অ্যালকোহল ও অ্যালকোহলজাত পণ্যের অবৈধ উৎস, শুল্ক-ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগে এ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে অংশ নেয় এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি), মূসক নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকার (উত্তর) কর্মকর্তারা।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকার বিভিন্ন বার, রেস্টুরেন্ট, ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও শুল্কমুক্ত দোকানে অবৈধ উৎস থেকে অ্যালকোহল বা অ্যালকোহলজাত পণ্য সংগ্রহের অভিযোগ পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে অভিযানে যাচাই করা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোর মজুতে থাকা অ্যালকোহল ও অ্যালকোহলজাত পণ্যের উৎস, আমদানি ও ক্রয়-সংক্রান্ত দলিল, পণ্যের বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট শুল্ক-মূসক ও আয়কর পরিশোধের তথ্য।
আরও পড়ুন: ঢাকাসহ ১৩ সিটি করপোরেশনে ই-রিকশার নিবন্ধন শুরু, ফি ৮-১০ হাজার টাকা
অভিযান চলাকালে নথিপত্র ও মজুদ যাচাইয়ের পাশাপাশি অনিয়ম পাওয়া গেলে পণ্য আটকের কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে। কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মজুদ, আমদানি ও ক্রয়-সংক্রান্ত দলিল এবং কর-শুল্ক পরিশোধের তথ্য পর্যালোচনা করছেন। অভিযান শেষে বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানিয়েছে এনবিআর।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন