১০:৫০ এম
ঢাকা, ৯ জুন, ২০২৬ : সাঁতার না জানার কারণে প্রতিদিন পানিতে ডুবে শিশু-কিশোরের মৃত্যুর খবর শোনা যাচ্ছে। এটি বেড়ে চলেছে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। বর্ষাকালে সন্তানের বাবা-মা বিশেষভাবে উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের পর্তুগাল প্রবাসী মো. মিজানুর রহমানের ছেলে আয়ান (১২) পুকুরের পানিতে ডুবে মারা যায় গত ১ জুন। আয়ান কুমিল্লার একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আরও পড়ুন: ইনানীতে ৪২ ঘণ্টা ধরে জ্বলছে আগুন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি
এ ছাড়া নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় ১৯ মে পুকুরের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। দুপুরের দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে। মৃত দুই শিশুর নাম মো. আরাফাত (১১) ও নূর মোহাম্মদ (১০)। তারা একই এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।
সন্তান হারিয়ে বাবা-মা আহাজারি করছে। প্রতিবেশী ও স্বজনরা সান্ত্বনা দিচ্ছেন, তবে প্রাণ প্রিয় সন্তান তো আর ফিরে আসবে না। শুধু সাঁতার না জানার কারণে অকালে ঝরে গেল ৩টি অবুঝ তাজা প্রাণ।
আয়ান, আরাফাত ও নূর মোহাম্মদ-এর মতো সাঁতার না জানার কারণে প্রতিমাসে শত শত শিশু পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে। গণমাধ্যমের কল্যাণে এর কিছু সংখ্যা আমাদের নজরে আসে।
ইউনিসেফ-এর একটি জরিপ অনুযায়ী, শুধুমাত্র সাঁতার না জানার কারণে বাংলাদেশে গড়ে ১৭ হাজার শিশু প্রতি বছর পানিতে ডুবে মারা যায়। এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে ৯ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা প্রত্যাহার, নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদী বিধৌত এই জনপদে প্রতিটি বাড়িতে না হলেও বাড়ির আশপাশে পুকুর কিংবা ডোবা থাকা খুবই স্বাভাবিক। এছাড়া খাল বিলও রয়েছে। তাই পা বাড়ালেই কোন জলাধার খুঁজতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না আমাদের। এমন কোন বছর নেই, যে বছর বন্যা আঘাত হানে না বাংলাদেশে। বন্যার পানিও নিচু এলাকায় জমে থাকে কয়েক সপ্তাহ, কখনো বা মাসব্যাপী। পানির এই সহজ লভ্যতার পরও সাঁতার না জানা শত শত শিশু প্রতি বছর পানিতে ডুবে মারা যায় বাংলাদেশে।
বাংলাদেশি শিশুদের সাঁতার শেখানোর জন্য ইউনিসেফ-এর সংগঠন সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ বা সিইপিআরবি ২০০৫ সাল থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। তাদের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুকে সাঁতার শেখানো। যাতে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার কমে আসে। এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ৩০ হাজার শিশুকে সাঁতার শিখিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান এক সাঁতার প্রশিক্ষক জেমস-এর মতে, পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশে খুবই বেশি। তবে যদি আমরা একটি শিশুকে শেখাতে পারি কীভাবে ৯০ সেকেন্ড সাঁতার কাটা যায় বা ভেসে থাকা যায়, তবে তার জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
ইউনিসেফের স্বাস্থ্য এবং পুষ্টি বিভাগের বাংলাদেশ প্রধান ব্রিথ লোকেটেলি-রসি বলেন, তারা ৪ থেকে ১০ বছরের শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। যা শিশুদের পানিতে ভেসে জীবন রক্ষা করতে সাহায্য করবে।
শিশুস্বাস্থ্য চিকিৎসক ডা. জহুরুল হক সাগর বলেন, সাঁতার শিক্ষা প্রত্যেক মানুষের জীবন সুরক্ষার জন্য জরুরি প্রয়োজন। সাঁতার শেখার উত্তম সময় হলো শিশুকাল। ৫ বছর বয়স থেকে সাঁতার শেখা শুরু করা যায়। শহরের ও গ্রামের সকল বাবা-মায়ের প্রতিটি সন্তানের সাঁতার শেখানো উচিত।
আরও পড়ুন: নওগাঁয় ভাড়া বাসায় জাল টাকার কারবার, ডিবির হাতে গ্রেপ্তার জব্বার
ডা. সাগর আরও জানান, পানির ওপর ভেসে ভেসে বিশেষ কৌশলে জলপথ অতিক্রম করার নাম সাঁতার। সাঁতারের উদ্দেশ্য হলো পানিতে না ডুবে ভেসে থাকা। পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, সমাজ ও অভিভাবকদের অজ্ঞানতাই এর মুখ্য কারণ। গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ শিশু পানিতে পড়ার কারণ হলো মা যখন দুপুরের রান্না বা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন শিশু আপন মনে খেলা করে, ইচ্ছে মতো এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়, আর তখন ঘটে এই অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা।
তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে খাল-বিল-ডোবা-পুকুর ও নদী। নদী আমাদের জীবনের সঙ্গে বিভিন্নভাবে জড়িত। এই নদী থেকে বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ করতেও আমাদের সাঁতার শিক্ষা আবশ্যক।
বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধে কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মাইকেল ব্লুমবার্গ ফাউন্ডেশন ৭৭ কোটি টাকা সহায়তা দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি এই অর্থে দুই বছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় ৮০ হাজার শিশুর দেখভাল এবং সাঁতারে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে। প্রাথমিকভাবে যেসব অঞ্চলে এই মৃত্যুর হার বেশি, সেসব অঞ্চলকে প্রাধান্য দিয়েই কাজ শুরু করবে প্রতিষ্ঠানটি। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা ডে কেয়ার ও কমিউনিটি সেন্টারগুলোর মাধ্যমে এ কার্যক্রম চালাবে। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে দুই বছর মেয়াদি প্রকল্পে ৮০ হাজার শিশু দেখাশোনা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
প্রতিষ্ঠানের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুহার শহর এলাকার চেয়ে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেশি। বাড়ির পাশেই ছোট ছোট ডোবা-নালায় বেশি মৃত্যুবরণ করে শিশুরা। দাতা প্রতিষ্ঠানের একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. কেলি হেনি জানান, পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার ঘটনা আসলেই হৃদয় বিদারক। তার মতে, কিছু পদক্ষেপ নিলেই এই মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
আরও পড়ুন: মাগুরায় বিএনপি নেতা হত্যা মামলায় সাবেক ওসি ও এসআইকে কারাগারে পাঠাল আদালত
গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, একটি যুগে কক্সবাজারের সাগরে ডুবে ৮৫ জন, সেন্ট মার্টিনে ১৪ জন পর্যটক পানিতে ডুবে মারা গেছেন। কক্সবাজারের ১২০ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকতের ১১১ কিলোমিটার এখনো সম্পূর্ণ অরক্ষিত। সাঁতার জানা থাকলে এই হৃদয় বিদারক ঘটনা নাও ঘটতে পারতো।
চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার চান্দ্রা ইমাম আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শরীরচর্চা শিক্ষক শেখ মুহাম্মদ নূরে আলম বলেন, সাঁতার একটি উত্তম ব্যায়াম। সাঁতার জানা মানুষ নিজ জীবন সুরক্ষাসহ পানিতে ডুবে যাওয়া অপরকেও বাঁচাতে পারে। পানিতে ডুবে শিশু মারা যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার অন্যতম ব্যবস্থা হচ্ছে সকল শিশুকে ৫ বছর বয়স থেকে বাধ্যতামূলকভাবে সাঁতার শেখানো।
বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি (বিএইচআইএস) মতে, বাংলাদেশে অপঘাতে প্রতিবছর ৩০ হাজার শিশু মারা যায়। এর অর্ধেক শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। ১ থেকে ১৮ বছর বয়সিদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি বছর ১৭ হাজার শিশু এভাবে মারা যায়। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৪৬ শিশু এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার হচ্ছে।
পানিতে ডুবে এই অস্বাভাবিক মৃত্যু রোধে সাঁতার শেখার পাশাপাশি সমাজের সবাইকে সচেতন হতে হবে। সাঁতার না জানা শিশুদের নজরে রাখতে হবে। স্কুলে শিশুদের সাঁতার শেখানো প্রয়োজন। মসজিদে জুমার খুতবায় অভিভাবকদের শিশুর সাঁতার শেখার বিষয়ে তাগিদ দিতে হবে। বিভিন্ন সভা সমাবেশ করে সাঁতার শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে হবে। গণমাধ্যমগুলোতে সাঁতার শেখার ওপর নাটিকা, কার্টুন ও বিজ্ঞাপন প্রচার করতে হবে। তবেই পানিতে ডুবে এই অস্বাভাবিক মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও -১ আসনে উপনির্বাচন সরকারি দলকে সমর্থন, গভীর রাতে প্রত্যাহার হলেন ৯ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন