মঙ্গলবার, ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং
০৫:০২ পি.এম
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনার নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
তিনি উল্লেখ করেছেন, অপরাধীর ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করার সুযোগ নেই। অপরাধীর একমাত্র পরিচয় হলো সে অপরাধী।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকালে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে অনুষ্ঠিত আগস্ট মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের এই নির্দেশনা দেন আইজিপি।
আইজিপি আরও বলেন, কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধেও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্যও তিনি নির্দেশনা দেন।
আসন্ন দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে উদযাপনের লক্ষ্যে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা প্রদান করেন আইজিপি। একই সঙ্গে গুজব ও অপপ্রচার রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন তিনি।
সভায় সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. সায়েদুর রহমান। সভায় মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপাররা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভাপতির বক্তব্যে অতিরিক্ত আইজি মো. সায়েদুর রহমান বলেন, কিশোর গ্যাং সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। তাদের পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছে কি না, তা উদঘাটন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতিটি ইউনিটকে নিজ নিজ নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। পূজাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার হতে পারে। এ বিষয়ে পুলিশ সদস্যদের সতর্ক থাকতে হবে। দায়িত্ব পালনের সময় যথাযথভাবে বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের নির্দেশনাও দেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন অতিরিক্ত আইজি। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে পুলিশ সদস্যদের পেশাদারিত্ব বজায় রাখার আহ্বান জানান।
সভায় আগস্ট মাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসহ দেশের সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। ডাকাতি, দস্যুতা, খুন, ধর্ষণ, পুলিশ আক্রান্ত ও অপহরণ মামলা, মুলতবি গ্রেফতারি পরোয়ানা, তদন্ত ও বিচারের অগ্রগতি এবং সাজার হারসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ইসলামাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যা করেছে কেন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য রাশিয়া থেকে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) বহনকারী বিমান পাকিস্তানি আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি পায়নি। পাকিস্তানের দাবি, অনুমতি না দেওয়ার পেছনে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং এটি সম্পূর্ণরূপে উড়োজাহাজের রুট এবং আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি সম্পর্কিত কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত জটিলতার ফলস্বরূপ হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় অবস্থিত পাকিস্তান হাইকমিশন একটি বিবৃতির মাধ্যমে এই ব্যাখ্যা প্রদান করে। বিবৃতিতে বলা হয়, কূটনৈতিক ফ্লাইট ও আকাশসীমা ব্যবহারের সব আবেদন পাকিস্তানের বিদ্যমান নিয়মাবলী, বেসামরিক বিমান চলাচল প্রটোকল এবং নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পর্যালোচনা করা হয়।
হাইকমিশন জানায়, রূপপুরের পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনসংক্রান্ত সংবাদমাধ্যমে যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা মূলত ফ্লাইটের রুট নির্ধারণ এবং আকাশসীমার অনুমোদন সম্পর্কিত একটি কারিগরি বিষয়। এই ধরনের সমন্বয়মূলক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে যোগাযোগের প্রয়োজন হয়, যার কারণে কখনও কখনও নির্ধারিত ফ্লাইটের সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে পাকিস্তান স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই ঘটনাটিকে কেবল কারিগরি প্রেক্ষাপটেই মূল্যায়ন করা উচিত এবং এমন কোনো প্রচার বা বয়ান তৈরি করা উচিত নয়, যা দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কে নীতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এর আগে বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছিলেন, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউরেনিয়াম বহনকারী বিমানটি গত ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী চালানটি আসতে পারেনি।
প্রকল্পের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে সাধারণত একাধিক দেশের আকাশসীমা অতিক্রম করতে হয়। সময়মতো অনুমোদনের অভাবে ফ্লাইটটি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। তবে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা ‘রোসাটম’ জানিয়েছে, আগামী অক্টোবর মাস থেকে ইউরেনিয়াম সরবরাহের প্রক্রিয়া পুনরারম্ভ হবে এবং চলতি বছরের মধ্যেই সকল চালান সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা নিয়ে দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় অনলাইন জুয়ার আসর সম্পর্কিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর প্রশাসনের কার্যক্রমে পরিবর্তন দেখা গেছে। রিপোর্ট প্রকাশের ১২ ঘণ্টার মধ্যে, গত সোমবার রাতে কালিয়াকৈর থানা পুলিশ বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে এবং দুই অনলাইন জুয়াড়িকে মোবাইলসহ ৬ লক্ষ ২৮ হাজার টাকা সহ আটক করে।
আটককৃতদের মধ্যে রয়েছে ১। সজিব (৩৫), পিতা- আব্দুল মজিদ, ২। সোহান (২২), পিতা- আমিরুল, উভয় সাং- রাখালিয়াচালা, থানা- কালিয়াকৈর, জেলা- গাজীপুর।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড়, পল্লীবিদ্যুৎ, মৌচাক, সফিপুর বাজার, বোর্ডঘর, ফুলবাড়ীয়া, কালিয়াকৈর বাজার ও আটাবহ এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে।
অনলাইনে আইপিএল ক্রিকেট বেটিং, ক্যাসিনো, লুডু, অনলাইন পোকারসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ অ্যাপসের মাধ্যমে প্রতিদিন কোটি টাকার লেনদেন চলছিল। বিশেষ করে উঠতি বয়সী যুবক, গার্মেন্টস শ্রমিক ও পরিবহন শ্রমিকরা এই মরণ নেশায় আসক্ত হয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে। অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে এলাকা ছেড়ে পালাচ্ছে।
এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় গত সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশিত হলে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। রিপোর্ট প্রকাশের পরই কালিয়াকৈর থানা পুলিশ নড়েচড়ে বসে।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন, "দৈনিক ইনকিলাবের রিপোর্টটি আমাদের নজরে আসার পর আমরা তাৎক্ষণিক অভিযানে নামি। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত সোমবার রাত আনুমানিক ১০টার দিকে মধ্যপাড়া ইউনিয়নের রাখালিয়া চালা এলাকায় অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়ার সাথে জড়িত ২ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে জুয়া খেলার কাজে ব্যবহৃত ১টি স্মার্টফোন ও নগদ ৬ লক্ষ ২৮ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।"
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃত সজিব ও সোহান অনলাইন জুয়ার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও জুয়া আইনে মামলা দায়ের করে বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, "আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, কালিয়াকৈরে অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স অভিযান অব্যাহত থাকবে। যুব সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে কোনো গডফাদারকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এই অভিযান চলমান থাকবে।" স্থানীয় সচেতন মহল পুলিশের এই অভিযানকে সাধুবাদ জানিয়েছে।
তারা মন্তব্য করেছেন, "অনলাইন জুয়ার কারণে শত শত পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যুব সমাজকে বাঁচাতে হলে পুলিশের এই ধারাবাহিক অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে এবং এর পেছনের মূল হোতা গডফাদারদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।"
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে সুর চড়াচ্ছে দলটি। এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন খাইবার পাখতুনখোয়ার ৩৭ বছর বয়সী সর্বকনিষ্ঠ মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি।
আল জাজিরা প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দলের কঠিন সময়ে পিটিআইয়ের শীর্ষ নেতৃত্বের অবস্থান শক্ত রাখতে এবং নতুন করে জাতীয় রাজপথের আন্দোলন জোরদার করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছেন এই তরুণ নেতা। সম্প্রতি তিনি রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে 'লং মার্চ'-এর ঘোষণা দিয়েছেন, যা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ৪ অক্টোবর ইসলামাবাদ অভিমুখে চূড়ান্ত লং মার্চের ডাক দেওয়া হয়েছে, যা পুরো পাকিস্তানে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে পৌঁছেছে। ক্ষমতাসীন শাহবাজ শরিফ সরকার খাইবার পাখতুনখোয়া থেকে রাজধানীতে প্রবেশের পথগুলো বন্ধ করতে শুরু করেছে এবং পিটিআই নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক গ্রেফতার অভিযান চালাচ্ছে। তবে সোহেল আফ্রিদি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, "লং মার্চ হবেই। এটি কোনো আত্মসমর্পণ নয়, বরং আমাদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ।" তিনি আরও সতর্ক করে দেন যে, এই বিশাল জনস্রোত ইমরান খানের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবে না এবং ৫ অক্টোবর ইমরান খানের জন্মদিনে তাঁরা "বিজয়ের দিন" উদযাপন করবেন।
উল্লেখ্য, অত্যন্ত সাধারণ ও উপজাতি পটভূমি থেকে উঠে আসা সোহেল আফ্রিদি মাত্র ৩৭ বছর বয়সে খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে কারাবন্দি ইমরান খানের প্রত্যক্ষ নির্দেশেই তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। মাঠপর্যায়ের ছাত্র রাজনীতি (ইনসাফ স্টুডেন্টস ফেডারেশন) থেকে উঠে আসা আফ্রিদির রাজপথের লড়াকু মনোভাব এবং সরকার পরিচালনায় কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষমতা তাঁকে পিটিআইয়ের অন্যতম শীর্ষ নেতায় পরিণত করেছে।
ইমরান খানের আইনি সব পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে আসায় এখন পিটিআই রাজপথের আন্দোলনকেই প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করছে। সোহেল আফ্রিদি কি এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুক্তি নিশ্চিত করতে পারবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
আগামীকাল বুধবার, চলতি বছরের তৃতীয় মুদ্রানীতি ঘোষণা হতে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি এখনও লক্ষ্যমাত্রার উপরে রয়েছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ দুর্বল, ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য বৃদ্ধি পেয়েছে এবং একই সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও নতুন বেতন কাঠামো মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই, তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতিতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে আগামীকালের ঘোষণায় নীতি সুদহারের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের পরিবর্তে বর্তমান অবস্থানই বজায় থাকবে বলে মনে হচ্ছে।
গত জুলাইয়ে, প্রায় ছয় বছর পর প্রথমবারের মতো নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর জরুরি ঋণ নেওয়ার সর্বোচ্চ সুদহার বা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশ করা হয়। তবে ব্যাংকের অতিরিক্ত অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখার সুবিধা—স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ)—৭ দশমিক ৫০ শতাংশেই রাখা হয়। এরপর সেপ্টেম্বরের এমপিসি সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
সভায় বলা হয়, মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী হলেও তা এখনও সরকারের নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার উপরে রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ঝুঁকি মূল্যস্ফীতিকে আবারও বাড়িয়ে দিতে পারে। এসব পরিস্থিতির প্রভাব মূল্যায়ন করে পরবর্তী সময়ে নীতি সুদহার পরিবর্তনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মূল্যস্ফীতিই বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, আগস্টে দেশের পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতিতে সামান্য স্বস্তি এলেও তা এখনও লক্ষ্য মাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ১২ মাসের চলমান গড় মূল্যস্ফীতিও আগস্টে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে ছিল।
এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার কতটা কড়াকড়ি রাখা হবে এবং একই সঙ্গে দুর্বল অর্থনীতিকে কীভাবে ঋণ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া যাবে।
কারণ উচ্চ সুদহারের কারণে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকঋণের খরচ বড় বোঝা হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় দ্রুত সুদহার কমানোর সুযোগও সীমিত।
ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কম
মুদ্রানীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুন মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য এক বছরে ৩৯ দশমিক ৪০ শতাংশ বেড়ে ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থের অভাব নেই; বরং অর্থ থাকলেও তার যথেষ্ট ব্যবহার হচ্ছে না। বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য নতুন ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কম থাকায় ব্যাংকগুলোর হাতে বিপুল অর্থ পড়ে রয়েছে।
এই পরিস্থিতি মুদ্রানীতির কার্যকারিতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু নীতি সুদহার কমানো বা বাড়ানো হলেই অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে না। ব্যাংকঋণের চাহিদা, ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা, খেলাপি ঋণ, ব্যবসায়ীদের আস্থা এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ—সবকিছু মিলেই মুদ্রানীতির সঞ্চালন ব্যবস্থা কাজ করে।
ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিবৃতিতে অর্থনীতির একাধিক দুর্বলতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে মার্চে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। একই সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়ায় বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদাও কমেছে। ফলে নতুন মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা এবং ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। বিশেষ করে ব্যাংক খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে নতুন ঋণ বিতরণে ব্যাংকারদের ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহ কমতে পারে। আবার দুর্বল ঋণ চাহিদার কারণে ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা অতিরিক্ত তারল্যও উৎপাদনশীল খাতে পর্যাপ্তভাবে প্রবাহিত হচ্ছে না।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নতুন চাপ
মুদ্রানীতি ঘোষণার আগে মূল্যস্ফীতির জন্য নতুন ঝুঁকি হিসেবে সামনে এসেছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দেশে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন ব্যয় এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতিতে দ্বিতীয় দফার চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণেই ২৩ সেপ্টেম্বরের এমপিসি সভায় জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধিকে মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতাও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামোর প্রভাব
মূল্যস্ফীতির আরেকটি সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোকেও দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছে। এর আওতায় সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ায় ভোগব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে চাহিদা বাড়তে পারে। নতুন কাঠামোতে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। পূর্ণ বাস্তবায়ন ধাপে ধাপে হওয়ার কথা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃষ্টিতে বেতন বৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে কতটা পড়ে, সেটিও আগামী দিনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রবৃদ্ধি বনাম মূল্যস্ফীতি
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৩ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমে আসে। দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া এবং দেশীয় ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। এ কারণে নতুন মুদ্রানীতিতে একদিকে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার লক্ষ্য, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়োজন —দুটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। সুদের হার দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে ব্যবসার ঋণ ব্যয় বাড়ে এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে। আবার মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার আগে সুদহার দ্রুত কমানো হলে চাহিদা ও আমদানি বাড়ার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
রিজার্ভ ও বৈদেশিক খাত
মুদ্রানীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণে বাহ্যিক খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিবৃতিতেও বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা এবং রেমিট্যান্সের ইতিবাচক ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যবাজারের অস্থিরতা আমদানি ব্যয় বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে। ফলে মুদ্রানীতিতে বিনিময় হার, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
আগামীকালের মুদ্রানীতিতে মূল নজর থাকবে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস, নীতি সুদহারের অবস্থান, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের নীতিতে। ২৩ সেপ্টেম্বরের এমপিসি সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নীতি সুদহার বহাল রাখার অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তাই নতুন ঘোষণায় বড় ধরনের সুদহার পরিবর্তনের চেয়ে বিদ্যমান নীতির সঙ্গে অর্থনীতির বিভিন্ন ঝুঁকি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখে অর্থনীতিতে ঋণ ও বিনিয়োগের গতি ফেরানো। কারণ একদিকে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার ওপরে, অন্যদিকে ব্যাংক খাতে বিপুল অতিরিক্ত তারল্য এবং বেসরকারি ঋণের দুর্বল প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির চাহিদার দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে আগামীকালের মুদ্রানীতি শুধু নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হবে কি না—এই প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধি, ঋণপ্রবাহ, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক খাত—এই পাঁচটি জায়গায় বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী ছয় মাসে কীভাবে ভারসাম্য তৈরি করতে চায়, মুদ্রানীতির মূল বার্তা সেদিকেই থাকবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ