প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
আগামীকাল বুধবার, চলতি বছরের তৃতীয় মুদ্রানীতি ঘোষণা হতে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি এখনও লক্ষ্যমাত্রার উপরে রয়েছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ দুর্বল, ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য বৃদ্ধি পেয়েছে এবং একই সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও নতুন বেতন কাঠামো মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই, তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতিতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে আগামীকালের ঘোষণায় নীতি সুদহারের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের পরিবর্তে বর্তমান অবস্থানই বজায় থাকবে বলে মনে হচ্ছে।
গত জুলাইয়ে, প্রায় ছয় বছর পর প্রথমবারের মতো নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর জরুরি ঋণ নেওয়ার সর্বোচ্চ সুদহার বা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশ করা হয়। তবে ব্যাংকের অতিরিক্ত অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখার সুবিধা—স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ)—৭ দশমিক ৫০ শতাংশেই রাখা হয়। এরপর সেপ্টেম্বরের এমপিসি সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
সভায় বলা হয়, মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী হলেও তা এখনও সরকারের নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার উপরে রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ঝুঁকি মূল্যস্ফীতিকে আবারও বাড়িয়ে দিতে পারে। এসব পরিস্থিতির প্রভাব মূল্যায়ন করে পরবর্তী সময়ে নীতি সুদহার পরিবর্তনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মূল্যস্ফীতিই বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, আগস্টে দেশের পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতিতে সামান্য স্বস্তি এলেও তা এখনও লক্ষ্য মাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ১২ মাসের চলমান গড় মূল্যস্ফীতিও আগস্টে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে ছিল।
এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার কতটা কড়াকড়ি রাখা হবে এবং একই সঙ্গে দুর্বল অর্থনীতিকে কীভাবে ঋণ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া যাবে।
কারণ উচ্চ সুদহারের কারণে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকঋণের খরচ বড় বোঝা হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় দ্রুত সুদহার কমানোর সুযোগও সীমিত।
ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কম
মুদ্রানীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুন মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য এক বছরে ৩৯ দশমিক ৪০ শতাংশ বেড়ে ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থের অভাব নেই; বরং অর্থ থাকলেও তার যথেষ্ট ব্যবহার হচ্ছে না। বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য নতুন ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কম থাকায় ব্যাংকগুলোর হাতে বিপুল অর্থ পড়ে রয়েছে।
এই পরিস্থিতি মুদ্রানীতির কার্যকারিতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু নীতি সুদহার কমানো বা বাড়ানো হলেই অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে না। ব্যাংকঋণের চাহিদা, ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা, খেলাপি ঋণ, ব্যবসায়ীদের আস্থা এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ—সবকিছু মিলেই মুদ্রানীতির সঞ্চালন ব্যবস্থা কাজ করে।
ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিবৃতিতে অর্থনীতির একাধিক দুর্বলতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে মার্চে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। একই সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়ায় বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদাও কমেছে। ফলে নতুন মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা এবং ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। বিশেষ করে ব্যাংক খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে নতুন ঋণ বিতরণে ব্যাংকারদের ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহ কমতে পারে। আবার দুর্বল ঋণ চাহিদার কারণে ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা অতিরিক্ত তারল্যও উৎপাদনশীল খাতে পর্যাপ্তভাবে প্রবাহিত হচ্ছে না।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নতুন চাপ
মুদ্রানীতি ঘোষণার আগে মূল্যস্ফীতির জন্য নতুন ঝুঁকি হিসেবে সামনে এসেছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দেশে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন ব্যয় এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতিতে দ্বিতীয় দফার চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণেই ২৩ সেপ্টেম্বরের এমপিসি সভায় জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধিকে মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতাও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামোর প্রভাব
মূল্যস্ফীতির আরেকটি সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোকেও দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছে। এর আওতায় সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ায় ভোগব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে চাহিদা বাড়তে পারে। নতুন কাঠামোতে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। পূর্ণ বাস্তবায়ন ধাপে ধাপে হওয়ার কথা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃষ্টিতে বেতন বৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে কতটা পড়ে, সেটিও আগামী দিনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রবৃদ্ধি বনাম মূল্যস্ফীতি
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৩ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমে আসে। দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া এবং দেশীয় ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। এ কারণে নতুন মুদ্রানীতিতে একদিকে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার লক্ষ্য, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়োজন —দুটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। সুদের হার দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে ব্যবসার ঋণ ব্যয় বাড়ে এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে। আবার মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার আগে সুদহার দ্রুত কমানো হলে চাহিদা ও আমদানি বাড়ার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
রিজার্ভ ও বৈদেশিক খাত
মুদ্রানীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণে বাহ্যিক খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিবৃতিতেও বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা এবং রেমিট্যান্সের ইতিবাচক ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যবাজারের অস্থিরতা আমদানি ব্যয় বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে। ফলে মুদ্রানীতিতে বিনিময় হার, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
আগামীকালের মুদ্রানীতিতে মূল নজর থাকবে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস, নীতি সুদহারের অবস্থান, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের নীতিতে। ২৩ সেপ্টেম্বরের এমপিসি সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নীতি সুদহার বহাল রাখার অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তাই নতুন ঘোষণায় বড় ধরনের সুদহার পরিবর্তনের চেয়ে বিদ্যমান নীতির সঙ্গে অর্থনীতির বিভিন্ন ঝুঁকি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখে অর্থনীতিতে ঋণ ও বিনিয়োগের গতি ফেরানো। কারণ একদিকে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার ওপরে, অন্যদিকে ব্যাংক খাতে বিপুল অতিরিক্ত তারল্য এবং বেসরকারি ঋণের দুর্বল প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির চাহিদার দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে আগামীকালের মুদ্রানীতি শুধু নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হবে কি না—এই প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধি, ঋণপ্রবাহ, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক খাত—এই পাঁচটি জায়গায় বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী ছয় মাসে কীভাবে ভারসাম্য তৈরি করতে চায়, মুদ্রানীতির মূল বার্তা সেদিকেই থাকবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন