০৪:৫০ পি.এম
শিক্ষা সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি বর্তমানে ভারতের একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়ে বর্তমান নিয়ন্ত্রণকারী দল বিজেপির ওপর নজিরবিহীন চাপ পড়েছে। এমনকি এই আন্দোলন কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তা এখনো অজানা। আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ভারতের কাকরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
আন্দোলনরত যুব নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী ও তাদের সমর্থকদের ওপর পুলিশ চড়াও হওয়ার পরের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ভারতের রাজধানী দিল্লিতে আবার হাজারো মানুষের সমাবেশ ঘটে। তবে এই আন্দোলন শুধু দিল্লি সীমিত থাকে নি; এটি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কেরালা রাজ্য, যেখানে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করে নিরাপত্তা বাহিনী।
অন্যদিকে, রাজস্থান থেকে মানুষ এসে দিল্লিতে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই দাবি করেছেন যে আন্দোলনে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণও ঘটছে।
আরও পড়ুন: পাকিস্তানে ভারত সমর্থিত গোষ্ঠীর ৯ সন্ত্রাসী নিহত
সোমবার (২০ জুলাই) অনুষ্ঠিত প্রতিবাদে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী অংশগ্রহণ করে। তারা পুলিশের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পার্লামেন্টের দিকে পদযাত্রা করার চেষ্টা করে।
মধ্যাঞ্চলীয় দিল্লি সহিংসতার সাক্ষী হয়, যেখানে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ করে, ফলে অন্তত ৬০ জন আন্দোলনকারী আহত হন। পুলিশ প্রতিবাদস্থলের মঞ্চ এবং অস্থায়ী তাঁবুগুলোও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।
পুলিশ জানিয়েছে, তাদের ১১৮ জন কর্মী আহত হয়েছেন এবং ৭০ জন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে। প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে লাঠি ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের বিষয়ে পুলিশ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার কোনো মন্তব্য করেনি। তবে বিরোধী দলগুলো এই সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
সিজেপি মূলত একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন, যা চলতি বছরের শুরুর দিকে ভারতের প্রধান বিচারপতির মন্তব্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গড়ে ওঠে। প্রধান বিচারপতি সাংবাদিকতা ও অ্যাক্টিভিজমের দিকে ঝুঁকে পড়া যুবকদের বোঝাতে কাকরোচ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। এই মন্তব্য নিয়ে যখন ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, তখন তিনি ব্যাখ্যা দেন যে, এটি কেবল ভুয়া ও বানোয়াট ডিগ্রিধারিদের উদ্দেশ্যে ছিল।
আরও পড়ুন: ডিএনসিসি প্রশাসক: ফুটপাতে ব্যবসার পক্ষে কেউ নেই, সড়ক দখল উচ্ছেদে জনগণের সহযোগিতা জরুরি
সোমবারের জনসমাগম প্রমাণ করে যে, সিজেপি কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল না হলেও লাখ লাখ মানুষকে রাজপথে নামতে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিবাদকারীরা গত এক মাস ধরে দিল্লির ৩০০ বছরের পুরনো পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ‘জন্তর মন্তরে’ অবস্থান করছেন।
২৮ জুন অ্যাক্টিভিস্ট ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক তাদের সাথে যোগ দিয়ে অননির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করলে এটি আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে। শনিবার পুলিশ তাকে জোরপূর্বক প্রতিবাদস্থল থেকে সরিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি এখনও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই আন্দোলন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোদীর বিরুদ্ধে সর্বজনীন অসন্তোষ প্রকাশের একটি স্পষ্ট ও দৃশ্যমান রিপ্রেজেন্টেশনে পরিণত হয়েছে। ওয়াংচুক এবং সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বেশিরভাগ প্রধান বিরোধী দল, কৃষক নেতা, অ্যাক্টিভিস্ট এবং বলিউড তারকারা সমর্থন দিয়েছেন।
বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো সঠিক ছিল এবং তিনি মোদীকে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে যুব-বিরোধী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সোমবারের আগে সরকার আন্দোলনকারীদের সাথে আলোচনা করেনি। অবশেষে সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা সিজেপির কয়েকজন নেতার সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের দাবি শুনেছেন।
আরও পড়ুন: ইসরাইলি আরব কারা, নির্বাচনে তারা কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো?
আন্দোলনকারীদের ডাকা পার্লামেন্ট অভিযানে অংশ নিতে সারাদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হয়েছেন; এর পর মন্ত্রী তাদের সাথে বৈঠকে বসেছেন। নাড্ডা, যিনি ক্ষমতাসীন বিজেপির শীর্ষ নেতা, বলেছেন যে বৈঠকটি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে হয়েছে। তিনি সব প্রতিবাদকারীকে তাদের অবস্থান কর্মসূচি শেষ করার জন্য এবং আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করতে প্রশাসনকে সহায়তা করার জন্য অনুরোধ করেছেন।
সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস জানান, নাড্ডার সাথে তাদের ১০ মিনিটের বৈঠকটি কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস ছাড়াই শেষ হয়েছে, কেবল বিষয়টি খতিয়ে দেখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সিজেপির আরেক নেতা আশুতোষ রাঙ্কা এই বৈঠকের জন্য চার ঘণ্টা অপেক্ষা করাকে সময়ের অপচয় বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
সোমবার সন্ধ্যায় এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে সিজেপি হয়তো বৈঠকের পর তাদের প্রতিবাদ স্থগিত করতে রাজি হবে। কিন্তু সারা দিন এলাকাটিতে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ থাকা পর সহিংসতার ঘটনার ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ পেলে তাদের অবস্থান আরও কঠোর হয়।
দিনের বেলায় আমি প্রতিবাদকারীদের আহতদের জন্তর মন্তরে নিয়ে আসতে দেখি। তাদের মধ্যে একজন তরুণ, যার মাথা ফেটে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল,কে স্বেচ্ছাসেবক চিকিৎসকরা ব্যান্ডেজ করছিলেন এবং একজন ছাত্রের পা ভেঙে গিয়েছিল।
আরও পড়ুন: সরকার অবাধ ও সুষ্ঠু স্থানীয় নির্বাচন উপহার দেবে: মীর শাহে আলম
প্রতিবাদকারীরা নাড্ডার সাথে সাক্ষাৎ করার মুহূর্তেই পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী জন্তর মন্তর খালি করতে অভিযান চালাতে আসে। তাদের মধ্যে কিছুর সাদা পোশাকের কর্মকর্তাও ছিলেন, যাদের অনেকের মুখ ঢাকা ছিল। তারা ইউনিফর্ম পরা পুলিশদের সাথে মিলিত হয়ে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া করে এবং লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করে।
মাইকে বারবার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছিল- এখনই চলে যান, এই প্রতিবাদ শেষ করুন। প্রতিবাদকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময়ে পুলিশের ব্যারিকেড টপকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। আমি দেখতে পাই অনেকে মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন, কেউ কেউ লাঠির আঘাতে আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছিল, ভাই-বোন ও বন্ধুবান্ধবরা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল এবং নারীরা কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন।
এই অপারেশনের নেতৃত্বে থাকা একটি জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হননি। কয়েক মিনিট পর, আমাকে বাইরে পৌঁছানোর জন্য এক নারী কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়।
ইন্টারনেট ফের চালুর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এমন সব ভিডিওতে ভরে যায় যেখানে দেখা যায় যে নিরাপত্তা বাহিনী নারীসহ প্রতিবাদকারীদের বেধড়ক পেটাচ্ছে এবং অনেকে মাটিতে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন।
আরও পড়ুন: নির্বাচনে পরাজিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন বলসোনারো
সোমবার রাতে সিজেপি পুনরায় জন্তর মন্তরের প্রতিবাদস্থল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে: “এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শেষ হচ্ছে না!” “পুলিশি বর্বরতা সত্ত্বেও সিজেপির সাহসী প্রতিবাদকারীরা ফিরে এসেছে। দিল্লিবাসী, বাইরে আসুন এবং জন্তর মন্তরে আমাদের সাথে যোগ দিন—এটি হয় এখন, না হয় কখনোই নয়! ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে!”—এমন বার্তা পাঠানো হয়।
পুলিশ পরবর্তীতে একটি বিবৃতিতে দাবি করেছে যে প্রতিবাদকারীরা “উচ্ছৃঙ্খল, আক্রমণাত্মক ও হিংসাত্মক আচরণ” প্রদর্শন করেছে, ছত্রভঙ্গ হতে অস্বীকার করেছে এবং বারবার সতর্ক করার পরও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেছে। পুলিশ আরও জানায়, “প্রতিবাদকারীরা পুলিশ কর্মীদের লক্ষ্য করে পাথর ও অন্যান্য বস্তু দিয়ে আক্রমণ করে, ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করে, পুলিশ ও অন্যান্য সরকারি গাড়ি ভাঙচুর করে, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করে এবং ব্যাপক সহিংসতায় লিপ্ত হয়।”
সিজেপি পুলিশের এই বিবরণ প্রত্যাখ্যান করে তাদের বিরুদ্ধে প্রথম আক্রমণকারী হওয়ার অভিযোগ এনেছে। সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে তারা আহত বা আইনি সহায়তার প্রয়োজনীয় সমর্থকদের তাদের সাথে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছে।
“আমাদের সব সমর্থকদের কাছে, বিশেষ করে পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তাদের দ্বারা নৃশংসভাবে মারধরের শিকার হওয়া মেয়েদের কাছে আমি ক্ষমা চাইছি। আমরা আরও ভালো ব্যবস্থা নিতে পারতাম। দিল্লি পুলিশের অমানবিক আচরণ থেকে আপনাদের রক্ষা করতে আমার আরও উদ্যোগী হওয়া উচিত ছিল,” দিপকে এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করেন।
আরও পড়ুন: মিডিয়ার ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে নতুন মামলায় বিচারের মুখোমুখি মেটা ও স্ন্যাপ
অন্য একটি পোস্টে তিনি জানান, এক আহত নারী সমর্থকের অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং তিনি তাকে দেখতে হাসপাতালে যাচ্ছেন।
সিজেপি ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কঠোর জবাবদিহির দাবি জানাচ্ছে। ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (NEET)-এর প্রশ্ন ফাঁসের পর তারা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে তাদের মুখ্য দাবি বানিয়েছে।
৩ মে অনুষ্ঠিত এই মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রায় ২২.৮ লাখ পরীক্ষার্থী অংশ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁসের খবরের পর পরীক্ষাটি বাতিল করা হয় এবং কয়েক সপ্তাহ পর পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হয়। এ পর্যন্ত ২০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে তাদের পরিবার জানিয়েছে।
প্রতিবাদকারীদের দাবি, প্রধানের এই ফাঁসের নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করা উচিত। তিনি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে সিজেপি ও তাদের সমর্থকদের “বিশৃঙ্খলা সৃষ্টকারী উপাদানের বি-টিম” বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে সোমাবরের বিশাল জনসমাগম, সহিংসতা এবং সিজেপির অবস্থান চলে না যাওয়ার অনড় মনোভাব এই আন্দোলনকে দীর্ঘ সময় আলোচনার কেন্দ্রে রাখবে বলেই মনে হচ্ছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন