০৪:০৮ পি.এম
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মেগাপ্রকল্প— কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে ১ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় চিহ্নিত করেছে।
১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নকৃত এই মেগাপ্রকল্পের উপর সম্প্রতি একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সেখানে এ আর্থিক অনিয়মের উল্লেখ রয়েছে।
আইএমইডির মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত তিন অর্থবছরে ৬৮টি অডিট আপত্তি অনিষ্পন্ন রয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি ‘গুরুতর আর্থিক অনিয়ম’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অডিট আপত্তিগুলো নিষ্পন্ন না হওয়ায় এগুলো আর্থিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
আরও পড়ুন: দুর্গাপূজা সামনে রেখে পাইকগাছায় পুলিশের অভিযান, ৯ জন আটক
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিশাল প্রকল্পে গাছ লাগানোর জন্য ৪৮ কোটি টাকা খরচ দেখানো হলেও বাস্তবে একটি গাছও লাগানো হয়নি। চমকে দেওয়ার মতো অনিয়ম হিসাবে একটি বড় ‘সার্ভিস এরিয়া’ নির্মাণের ক্ষেত্রে ৫০৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
আইএমইডির মতে, এই সার্ভিস এরিয়া অপ্রয়োজনীয় ছিল এবং টানেলের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। সার্ভিস এরিয়া নামের এলাকার মধ্যে বাংলো, মোটেল, কনভেনশন সেন্টার, চিকিৎসাকেন্দ্র এবং একটি জাদুঘর নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু, এসব স্থাপনার সঙ্গে টানেলের সরাসরি সড়ক সংযোগ নেই। সেই কারণে আইএমইডি এই খরচকে ‘পুরোপুরি অপচয় ও নীতিগত অনিয়ম’ বলে অভিমত দিয়েছে।
এছাড়া, প্রতিবেদনটির মাধ্যমে আরও বলা হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ল্যান্ডস্কেপিং ও গাছ লাগানোর কাজে ৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। কিন্তু সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) কিংবা প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে (পিসিসিআর) এর কোন কাজের প্রমাণ মেলেনি।
অন্য অনিয়ম হিসেবে রয়েছে— কন্টিনজেন্সি বা আপৎকালীন তহবিল থেকে ২২৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে, তবে জেনারেল ফ্যাসিলিটিজ তহবিলের অধীনে একই ধরনের খরচ অন্তর্ভুক্ত ছিল; ২২৪ কোটি টাকার অননুমোদিত মূল্য সমন্বয়; আলাদা পরামর্শক নিয়োগের পরও তদারকি ফি (সুপারভিশন ফি) বাবদ অতিরিক্ত ৭০ কোটি ১০ লাখ টাকা প্রদান এবং বরাদ্দ থাকা অর্থ থেকে অতিরিক্ত ৯০ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: গুজব ও বিশৃঙ্খলা রোধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের আহ্বান আনসার-ভিডিপির মহাপরিচালকের
আইএমইডির মতে, সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন এবং চুক্তির শর্ত ভঙ্গের কারণে এই অনিয়মগুলো ঘটেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভাগের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে কেন প্রকল্পের চূড়ান্ত খরচ ২৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেড়েছে এবং মেয়াদ দ্বিগুণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক তদারকির দুর্বলতার ব্যাপারে কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। যেমন: প্রকল্পের অধীনে কেনা ২৯টি গাড়ির মধ্যে মাত্র ৬টি সেতু বিভাগকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর বাকি ২৩টি গাড়ি এখনও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৫০ কোটি টাকার বেশি খরচের প্রকল্পে একজন সার্বক্ষণিক ও অভিজ্ঞ প্রকল্প পরিচালক থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু, কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের কাজ চলাকালে অন্তত চারজন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে, প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী দুই বছর ধরে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রকল্প পরিচালনার কাজ করেছেন। আইএমইডির মতে, এতে করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধারাবাহিকতা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২০১৫ সালের নভেম্বরে প্রাথমিকভাবে ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৯১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক দিয়েছে, যা ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছরে শোধ করতে হবে।
আরও পড়ুন: হঠাৎ ঢাকায় আসছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো
আইএমইডির প্রতিবেদনে টানেলের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলা হয়েছে, প্রত্যাশার তুলনায় গাড়ি কম চলাচল করায় টানেলটি এখন ক্ষতির সম্মুখীন। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় বলা হয়েছিল, ২০২৫ সাল নাগাদ প্রতিদিন গড়ে ২৮ হাজার ৩০৫টি গাড়ি এই টানেল ব্যবহার করবে। কিন্তু বাস্তবে গাড়ির সংখ্যা অনেক কম। ২০২৩ সালের অক্টোবরে উদ্বোধনের পর প্রথম কয়েক মাসে গড়ে প্রতিদিন ৫-৬ হাজার গাড়ি চলাচল করত, যা ২০২৬ সালের শুরুতে কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪২২ থেকে ৩ হাজার ৪৮৮টিতে।
বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র চার থেকে সাড়ে চার হাজার ছোট বা হালকা যান টানেল দিয়ে চলাচল করছে, যা পূর্বাভাসের মাত্র ১৪ শতাংশ। আর পণ্যবাহী ভারী যানবাহনগুলোর অধিকাংশই এই পথ এড়িয়ে চলছে। এর কারণে টানেলে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। প্রতিদিনের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য খরচ হচ্ছে প্রায় ২২ লাখ টাকা, যেখানে টোল আদায় থেকে আয় হচ্ছে মাত্র ১২ লাখ টাকা। ফলে, এই ঘাটতি মেটাতে বছরে প্রায় সাড়ে ৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারের।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন