প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সম্প্রতি চীন থেকে পাকিস্থান অত্যাধুনিক স্টিলথ সাবমেরিন ‘পিএনএস হাঙর’ হাতে পেয়েছে। এই সাবমেরিনটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত পানির নিচে থেকে গোপনে অভিযান চালাতে সক্ষম।
পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রধারী নৌবাহিনী দাবি করে করছে যে, এই সাবমেরিন শুধু তাদের সামুদ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে না, বরং ভারত মহাসাগরে পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থানও আরও মজবুত করবে।
সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন এই সংযোজন ভারতের সঙ্গে নৌ শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তান সর্বশেষ বঙ্গোপসাগরে সাবমেরিন মোতায়েন করেছিল। ভারতীয় বাহিনীর হাতে সেই যুদ্ধে পাকিস্তানের সাবমেরিন ধ্বংস হয়েছিল। এরপর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দেশটি ওই কৌশলগত সমুদ্রসীমায় কার্যকর উপস্থিতি তৈরি করতে পারেনি। তবে, কিছু সপ্তাহ আগে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে।
গত মাসে পাকিস্তান চীন থেকে একটি নতুন আক্রমণাত্মক সাবমেরিন দেশে এনেছে। ‘পিএনএস হাঙর’ নামের এই সাবমেরিনটি গত এপ্রিলে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আটটি একই ধরনের সাবমেরিন পাওয়া যাবে এবং এটি ওই আটটির মধ্যে প্রথম। গত ১১ জুন এটি করাচি বন্দরে এসেছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানো হয়েছে।
নতুন সাবমেরিন বহরের মিশন কমান্ডার কমোডর ওমর ফারুক জানিয়েছেন যে, এই অত্যাধুনিক সাবমেরিন ‘গেমচেঞ্জার’ হবে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান নৌবাহিনী নিজেদের সমুদ্রসীমার বাইরেও অনেক দূর অবাধে অভিযান চালানোর ক্ষমতা অর্জন করবে এবং পূর্ব ভারত মহাসাগরে দীর্ঘ সময় উপস্থিতি বজায় রাখতে সক্ষম হবে। ১৯৭১ সালে যেখানে পিএনএস গাজি ধ্বংস হয়েছিল, সেই অঞ্চলে কার্যকর উপস্থিতি গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
৭৬ মিটার দীর্ঘ ও ৮.৪ মিটার প্রশস্ত ‘পিএনএস হাঙর’ দেখতে কালো রঙের অশ্রুবিন্দু আকৃতির। এটি বর্তমান চলতি অনেক সাবমেরিনের তুলনায় আকারে বড়। এই সাবমেরিনটি ধীরে ধীরে পাকিস্তানের পুরোনো ফ্রান্সে তৈরি ‘আগোস্তা’ শ্রেণির সাবমেরিনগুলোর জায়গা নেবে।
‘হাঙর’ সাবমেরিনে অত্যাধুনিক এয়ার ইনডিপেন্ডেন্ট প্রপালশন (এআইপি) প্রযুক্তি রয়েছে। এর ফলে এটি কয়েক সপ্তাহ পানির নিচে অবস্থান করতে সক্ষম। এই প্রযুক্তি বাতাস বা বায়ুমণ্ডল থেকে নির্ভর না করেই সাবমেরিনকে চলতে সহায়তা করে এবং দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার সক্ষমতা প্রদান করে। এটি তুলনামূলকভাবে কম শব্দ ও কম কম্পন তৈরি করে, ফলে সাবমেরিন শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
হাঙর শ্রেণির সাবমেরিনে ছয়টি ৫৩৩ মিলিমিটার টর্পেডো টিউব রয়েছে, যা টর্পেডো'র পাশাপাশি দূরপাল্লার জাহাজ-বিধ্বংসী মিসাইল ছুঁড়তে সক্ষম। সুনির্দিষ্ট অস্ত্রের তালিকা এখনও প্রকাশিত হয়নি, তবে অনুমান করা হচ্ছে পাকিস্তান নৌবাহিনী চীনের ওয়াইজে-১৮ বা ওয়াইজে-৮২ মিসাইল ব্যবহার করবে।
ওয়াইজে-১৮-এর সর্বাধিক পাল্লা ২৯০ নটিক্যাল মাইল হলেও রফতানি সীমাবদ্ধতার কারণে পাকিস্তান সম্ভবত শুধুমাত্র ওয়াইজে-১৮ই পাবে, যার পাল্লা প্রায় ১৫৭ নটিক্যাল মাইল। অন্যদিকে ওয়াইজে-৮২-এর মূল সংস্করণের পাল্লা ২০ নটিক্যাল মাইল হলেও উন্নত সংস্করণের পাল্লা ১৫৭ ও ৬৯ নটিক্যাল মাইল।
এছাড়া এই সাবমেরিনগুলোতে স্টিলথ বা গোপন চলাচলের সক্ষমতা রয়েছে। এতে ‘ক্যাবিন-রাফট’ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে, যার ফলে শব্দের মাত্রা ৩৫ ডেসিবেল পর্যন্ত নেমে যেতে পারে। সাবমেরিনের বাইরের অংশে রাবার দিয়ে তৈরি অ্যানেকোয়িক টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে, যা শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি কমায়।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি চীনের হাইনান প্রদেশের সানইয়ায় গিয়ে সাবমেরিনটি গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, ‘হাঙর’ বহরকে আধুনিক অস্ত্র ও নেভিগেশন ব্যবস্থায় সজ্জিত করা হবে। এসব সাবমেরিন আঞ্চলিক সামুদ্রিক শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পাকিস্তানকে সহায়তা করবে।
বর্তমানে ভারতের হাতে ১৯টি সাবমেরিন রয়েছে, তবে পাকিস্তানের বিশ্লেষকদের মতে, ‘হাঙর’ সাবমেরিনের উপস্থিতি তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মোকাবিলায় শক্তিশালী উপস্থিতি নিশ্চিত করবে।
পাকিস্তানের সরকারি একজন কর্মকর্তা জানিয়ে ছিলেন, ‘হাঙর’ সাবমেরিনের আটটির মধ্যে চারটি সাবমেরিন চীনে এবং বাকি চারটি পাকিস্তানে প্রযুক্তি হস্তান্তর কর্মসূচির আওতায় তৈরি হবে। পাকিস্তানের নৌ বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরো বহর গড়ে তুলতে ২০৩২ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
চীন এই চুক্তিকে মিত্র দুই দেশের মধ্যে ‘স্বাভাবিক সামরিক সহযোগিতা’ বলে অভিহিত করলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারত মহাসাগরে ভারতকে আরও উন্নত সামরিক প্রযুক্তির মুখোমুখি হতে হবে। বিশেষ করে যখন দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গত বছর ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। কাশ্মীরে হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে ভারত সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পাকিস্তানি ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালায়। পাল্টা হামলা চালায় পাকিস্তানও। চার দিন ধরে তীব্র সংঘর্ষ চলে, যেখানে শত শত মানুষ নিহত হয়। এই অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন সিঁদুর’। তবে ওই অভিযানে ভারতের একাধিক যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। অনেক বিশেষজ্ঞ এর কৃতিত্ব পাকিস্তানের চীনা সামরিক সরঞ্জামকে দিয়েছেন।
অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল সৈয়দ ফয়সাল আলী শাহ বলেন, ওই সংঘাত পাকিস্তান ও ভারতের প্রচলিত সামরিক শক্তির ব্যবধান নিয়ে প্রচলিত ধারণা ভেঙে দিয়েছে। নতুন ‘হাঙর’ সাবমেরিনের বহর পাকিস্তানের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।
তিনি বলেন, “শুধু আকাশযুদ্ধ নয়, সমুদ্রেও ভারতীয় নৌবাহিনী করাচি থেকে ৪০০ থেকে ৫০০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করেছিল। কিন্তু তারা সামনে এগোয়নি। এ ধরনের সিদ্ধান্ত ঝুঁকির জন্য বিবেচনা করেই নেয়া হয়েছিল।”
তার মতে, “ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যতে কোন সংঘাত হলে এসব সাবমেরিন পাকিস্তান নৌবাহিনীর সক্ষমতা, বিশেষ করে পানির নিচে অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা আরও বাড়াবে। এটি ভারতীয় সামরিক নেতৃত্বের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, এসব সাবমেরিন বঙ্গোপসাগর, হরমুজ প্রণালী, পারস্য উপসাগর এবং এডেন উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ রক্ষার ক্ষেত্রেও পাকিস্তানকে সহায়তা করবে।
শাহ স্বীকার করেন যে, ভারতের তিনটি পারমাণবিক সাবমেরিন রয়েছে এবং আরও ছয়টি যুক্ত করার পরিকল্পনা আছে। যদিও এর পরেও তার মতে, পাকিস্তানের নতুন ক্ষমতাগুলো ভারতকে উদ্বেগে ফেলবে।
তিনি বলেন, “আমার অভিজ্ঞতায় একটি সাবমেরিন আর ১০টি সাবমেরিনের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য দেখা দেয় না। কারণ পানির নিচে থাকা একটি সাবমেরিনকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত কোন জাহাজই সেই এলাকায় নিশ্চিন্তে চলাচল করতে পারে না।”
কার্নেগি ইন্ডিয়ার নিরাপত্তা বিশ্লেষক দিনাকর পেরি বলেন, পাকিস্তানের হাতে বর্তমানে মাত্র তিনটি ‘আগোস্তা’ সাবমেরিন রয়েছে। অন্যদিকে ভারতেরও ১৬টি সাবমেরিনের বেশিরভাগই পুরোনো।
তার মতে, সামগ্রিকভাবে ভারতের নৌবাহিনী এখনও অনেক ‘বেশি শক্তিশালী’। তবে পাকিস্তানের নতুন সাবমেরিন বহর এবং আধুনিকায়ন ভারতের কৌশলগত পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য করতে পারে, যদি ভবিষ্যতেও গত বছরের মতো সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
পেরির মতে, পাকিস্তানের কাছে এই নতুন সাবমেরিন মোতায়েন চীনের জন্যও কৌশলগত সুবিধা বয়ে আনবে। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের মে মাসে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় চীন-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতা স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। তবে পাকিস্তানকে শক্তিশালী করার বাইরে, সমুদ্রপথে এর প্রভাব সীমিত থাকবে।
তিনি আরও বলেন, চীন নজিরবিহীন গতিতে নিজেদের নৌ সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ভারতীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সময় চীনা গবেষণা জাহাজের ঘন ঘন উপস্থিতি ভারতের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।
এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে- ভারত, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কি অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে? রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহের মতে, অস্ত্র প্রতিযোগিতা চলছে, তবে এতে শুধু এই তিন দেশ নয়, আরও অনেক শক্তি জড়িত।
তিনি অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জোট ‘অকাস’-এর উদাহরণ দিয়ে বলেন, “এটি এক ধরনের ডমিনো প্রভাব। এই অঞ্চলের বাইরের কিছু শক্তিই এখানে অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে উসকে দিয়েছে।” সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন