১০:০৮ পি.এম
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অবৈধ সামরিক আগ্রাসনের জবাবে শুরু হওয়া ৪০ দিনের অসম যুদ্ধে বিশ্ব এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যা বহু বছরের মার্কিন সামরিক আধিপত্যের ধারণাকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর একক বিশ্ব সুপার পাওয়ার নয় এমনটা বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র ধারণা করতে শুরু করেছে। এই যুদ্ধের শুরুতে যাদের ধারণা ছিল কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানকে সামরিকভাবে নতজানু করা যাবে, যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে তারাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হতে বাধ্য হয়।
এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই ইরান তার অবস্থান আরও স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়—হরমুজ প্রণালী তাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নিজস্ব জলসীমার অংশ এবং এর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে তারা কোনো আপস করবে না। ইরানের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে এই বাস্তবতা উল্লেখ থাকার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বিকল্প পথে ওমান উপসাগর ব্যবহার করে সামরিক ও বাণিজ্যিক চলাচলের চেষ্টা চালায়। ইরান তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে প্রতিরোধ করলে পুনরায় সংঘাত শুরু হয় এবং যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা কার্যত ভেঙে পড়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্কের ন্যাটো সম্মেলনে প্রকাশ্য ঘোষণা দেন যুদ্ধবিরতি চুক্তি আর নেই।
ইরানের আরো অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র শুধু যুদ্ধবিরতি চুক্তিই ভঙ্গ করেনি, এমনকি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সমাহিতকরণের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি লঙ্ঘন করে ব্যাপক হামলা চালায়। এর পাল্টা জবাবে ইরানও হাত গুটিয়ে নতজানু হয়ে বসে থাকেনি বরং পাল্টা বিধ্বংসী ও ব্যাপক হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি, অস্ত্রাগার, রাডার ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ও ড্রোন হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে ধারাবাহিক আঘাত হানে এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এত বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয় যে অনেক বিশ্লেষক ধারণা করছেন যে, মধ্যেপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমরাস্ত্রের শক্তি প্রায় ধ্বংসের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এমনকি ইরানের এসব নিখুঁত পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর বড় অংশ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক অজেয়তার ভাবমূর্তি গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
আরও পড়ুন: লিমোজের ঐতিহাসিক টাউন হলে আগুন, ৩৪ বছর বয়সী সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে বাস্তবে কী কী বিকল্প রয়েছে?
===============================
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে যুদ্ধ শুরুর পূর্ব থেকে শুরু করে সব শেষ বক্তব্য পর্যন্ত বড় বড় হুমকি কিংবা রাজনৈতিক ভাষণ দিয়ে বর্তমান সংকট আর সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ইরান যে ধরনের কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো যেভাবে ধারাবাহিক হামলায় ধ্বংসের মুখে পড়ছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রচলিত সামরিক চাপ কার্যকর হচ্ছে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও নিজেদের বিশ্ব পরাশক্তির অবস্থান প্রদর্শনের চেষ্টা করে, তবে তাদের সামনে "হয় ইরানের সঙ্গে বাধ্য হয়ে একপ্রকার আত্মসমর্পণ বা সমঝোতার পথ বেছে নেওয়া", নয়তো "এমন এক সামরিক অভিযানে জড়িয়ে পড়া, যার শেষ সীমায় পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে"। এই দুইয়ের বাইরে কার্যকর কোনো তৃতীয় পথ এখন দৃশ্যমান নয়। তবে এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন কি করবেন?
পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করা কি আদৌ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ কোনো সিদ্ধান্ত?
=================================
ইতিহাস বলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের সময় বিশ্বের কৌশলগত বাস্তবতা আজকের মতো ছিল না। তখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সমমানের কোনো পারমাণবিক প্রতিপক্ষ ছিল না। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি পরমাণু বোমার ট্রিগার চাপলে হয়তো বা উত্তর কোরিয়া, চীন ও রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাক করা পরমাণু বোমার ওয়ারহেডগুলো ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালাস্টিক মিসাইল বা আইসিবিএম ক্ষেপণাস্ত্রসহ উড়ে যেতে পারে-এমন আশঙ্কা করা অমূলক নয়।
আজ বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি পদক্ষেপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে কারণ সেখানে রাশিয়াকে বিপর্যস্ত করতে অশ্চিমা শক্তি তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বাধুনিক প্রযুক্তির অস্ত্র দিয়ে ইউক্রেনকে সহায়তা করছে। অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তিতে পরবর্তী সম্ভাব্য পরাশক্তি হিসেবে দ্রুত উত্থান ঘটানো চীনও আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠনের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রও পারমাণবিক সক্ষমতার প্রশ্নে বারবার নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ইরানের সঙ্গে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক বিবেচনায় নিলে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো চরম পদক্ষেপ একক সংঘাতের মধ্যে আর সীমাবদ্ধ থাকবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার সুযোগ নেই।
বরং একটি ভুল সিদ্ধান্ত পুরো বিশ্বকে এমন এক সর্বাত্মক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যার পরিণতি মানবসভ্যতার জন্য অকল্পনীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে। এ কারণে যে, বর্তমান সংকট কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিশ্ব শক্তির ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক রাজনৈতিক কাঠামোরও একটি কঠিন পরীক্ষা, যাতে যুক্তরাষ্ট্র মনে রাখা উচিত, একক পরাশক্তি হিসেবে আর যুক্তরাষ্ট্র নেই বরং বিশ্বের অপর দুই পরাশক্তির স্নায়ু যুদ্ধ-ই চলছে ইউক্রেন ও ইরানে।
আরও পড়ুন: যেসব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করবে না ইরান
এখন প্রশ্ন একটাই—ডোনাল্ড ট্রাম্প কি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ইহুদীবাদী ইজরাইলি লবির চাপে নিজের বিশ্ব পরাশক্তিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিবেন নাকি ইসরাইলকেন্দ্রিক সামরিক কৌশল থেকে সরে এসে ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পথে হাঁটবেন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি পুনর্বিবেচনা করবেন এবং সমঝোতার নতুন অধ্যায় খুলবেন? নাকি শক্তি প্রদর্শনের নামে এমন এক বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নেবেন, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেই অভূতপূর্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো সময়ই দেবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—আজকের বিশ্ব আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী একমেরু ভিত্তিক বিশ্ব নয় বরং ইতিমধ্যেই বহু মেরু ভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থা তৈরি হয়ে গেছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় প্রতিটি সামরিক সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া বহুগুণ বেশি জটিল, বহুমাত্রিক এবং সুদূরপ্রসারী। তাই শক্তির প্রদর্শন কিংবা কোন ভুল সিদ্ধান্তই হয়তো আগামী দিনের ইতিহাস নির্ধারণ করবে, বিশ্ব কি নতুন করে আলোর মুখ দেখবে নাকি মহাপ্রলয়ের ধ্বংসলীলা দেখবে এখনকার সিদ্ধান্তই তা নির্ধারণ করবে এমন কথা বলা মনে হয় আজকের দিনে অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
আরও পড়ুন: ৩৬৭ দিন ধরে চলা তাপঝড়ের প্রভাব পড়েছে পৃথিবীর ৮৫ শতাংশ এলাকায়
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন