০৭:৪১ পি.এম
অনেকেই মনে করেন, মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার তেমন মিল নেই। এখানে ইসলামিক শিক্ষাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। শিক্ষার্থীরাও তাদের মেধা বিকাশের খুব একটা সুযোগ পায় না। কিন্তু বাস্তবতা আসলে তা নয়। আর সেটাই প্রমাণ করেছে টাঙ্গাইলের কুরতুবী মাদরাসার আলিম শাখার ছাত্রীরা।
তারা উদ্ভাবন করেছে এমন একটি কলা- যা উৎপাদনের মাধ্যমে স্বাদ অপরিবর্তিত রেখে কলাকে অধিক প্রোটিন সমৃদ্ধ করা যাবে। এটি অপুষ্টি দূরীকরণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কৃষি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। ইচ্ছা, চেষ্টা আর সাধনা দিয়ে মাত্র এক মাসের গবেষণায় তারা এ সাফল্যের দেখা পেয়েছে।
কথা হয় এই অভিনব উদ্ভাবন দলের সদস্যদের সাথে। তারা হলেন কুরতুবী আলিম মাদরাসার প্রথম বর্ষের ছাত্রী ফাতেমাতুজ জহুরা, অনামিকা আলফি আমরি, মিফতাহুল জান্নাত মায়া, মেঘলা আক্তার ও ফারজানা আক্তার। দলের সদস্যরা জানান, এই প্রজেক্টের মূল উদ্দেশ্য হলো কলার ডিএনএ নিষ্কাশন করা এবং রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রোটিন সমৃদ্ধ কলার একটি মডেল তৈরি করা। এ প্রজেক্টে মুসুর ডাল থেকে ডিএইচডিপিএস জিন নির্বাচন করা হয়েছে, যা লাইসিন সামৃদ্ধ প্রোটিন উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: সিলেটে রাবার বাগান থেকে বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও দুটি এয়ারগান উদ্ধার
লাইসিন একটি অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড, যা মানবদেহের বৃদ্ধি, টিস্যু গঠন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিভিন্ন জৈবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণ কলায় লাইসিনের পরিমাণ কম থাকায় জেনেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এর পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি করার চেষ্টা করা হয়েছে।
ছাত্রীরা জানান, চলতি বছরের মার্চ মাসে তারা জীববিজ্ঞান ল্যাব ক্লাসে ডিএনএ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছিলেন। এ সময় হঠাৎ করেই তাদের মাথায় আসে নতুন প্রযুক্তি আবিস্কারের ধারণা। কোন চিন্তা-ভাবনা না করে তারা শুরু করে দেন গবেষণা। তাদের গাইড শিক্ষক আরিফুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে চলতে থাকে গবেষণা। প্রবল আগ্রহ, কঠোর সাধনা শুরু হয়। এভাবে তাদের সময়ের বড় অংশ কাটতে থাকে গবেষণার কাজে। মাত্র এক মাসের মাথায়ই তারা সাফল্যের দেখা পান। গবেষণা শেষে তারা উদ্ভাবন করেন- স্বাদ অপরিবর্তিত রেখে কলাকে অধিক প্রোটিন সমৃদ্ধ করা সম্ভব। তারা এ প্রজেক্টের নাম দেয়, ‘প্রোটিন সমৃদ্ধ কলা তৈরির জন্য কলার ডিএনএ নিষ্কাশন ও রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ মডেল’।
এদিকে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে টাঙ্গাইল সদর উপজেলা ও জেলা জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে কুরতুবী আলিম মাদরাসার ছাত্রীদের এই নয়া উদ্ভাবন প্রথম স্থান অর্জন করে। পরে বিভাগীয় পর্যায়ে গিয়ে দ্বিতীয় হয়ে অংশগ্রহণ করে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায়। জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কৃত হতে না পারলেও বিচারকসহ আমন্ত্রিত অতিথিদের ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে।
প্রজেক্টের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ছাত্রীরা জানান, কলার ডিএনএ নিষ্কাশন করা, রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা অর্জন করা, মুসুর ডালের ডিএইচডিপিএস জিন কলার ডিএনএ-তে সংযুক্ত করার মডেল তৈরি করা, লাইসিন সমৃদ্ধ ও প্রোটিনযুক্ত কলা উৎপাদনের ধারণা প্রদান করা, কলার স্বাদ ও গুণগত মান অপরিবর্তিত রাখা, অপুষ্টি দূরীকরণে জৈবপ্রযুক্তির ভূমিকা তুলে ধরা এবং কৃষি ও অর্থনীতিতে জেনেটিক পরিবর্তিত ফসলের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা।
আরও পড়ুন: পাবনায় অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে ডিবির অভিযান, গ্রেপ্তার ৪
এ প্রযুক্তি আবিস্কারের জন্য তারা কিছু উপকরণ বেছে নিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য উপকরণগুলো হল, পাকা কলা, লবণ, গরম পানি, ডিশ ওয়াশিং লিকুইড, ব্লেন্ডার/চামচ, কফি ফিল্টার বা পাতলা কাপড়, টেস্ট টিউব/গ্লাস, ঠান্ডা অ্যালকোহল বা ইথানল এবং কাঠি বা টুথপিক।
আবিস্কৃত প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ছাত্রীরা জানান, বাণিজ্যিকভাবে প্রোটিন সমৃদ্ধ কলা উৎপাদন, অন্যান্য ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ ফসল তৈরি, বৃহৎ পরিসরে গবেষণা ও চাষাবাদ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জৈবপ্রযুক্তি গবেষণায় অংশগ্রহণ। তবে এর জন্য তাদের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এজন্য তাদের উন্নত ল্যাব সুবিধা প্রয়োজন। জেনেটিক পরিবর্তিত খাদ্য নিয়ে সামাজিক ও নৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে। এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যবহারের আগে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন বলে তারা উল্লেখ করেন।
কুরতুবী আলিম মাদরাসার শিক্ষক আরিফুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের জানার আগ্রহ অনেক বেশি। তাদের যদি একটু ধারণা দেয়া হয় তবে তারা ভালো কিছু করতে পারবে।
আরও পড়ুন: নিয়ত বিশুদ্ধ না হলে ইবাদতের প্রকৃত শিক্ষা অর্জন ব্যাহত হয় -ছারছীনা পীর ছাহেব
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন