০৬:১২ এম
কক্সবাজার জেলায় টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণে অনন্ত ৩৫ ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত ৪ দিনে পাহাড় ধস ও পানিতে ডুবে রোহিঙ্গাসহ ২৪ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
কক্সবাজার জেলার অধিকাংশ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, এবং বন্ধ রয়েছে সব গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে, পাহাড়ের পাদদেশ, ঢালু এলাকা এবং বন্যাকবলিত নিচু স্থানে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করেছে। এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ৬৪৮টি স্থানে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। খোলা হয়েছে একটি কন্ট্রোল রুম।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেল ৩টা পর্যন্ত কক্সবাজারে ৪৮ ঘণ্টায় ২২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। বর্তমানে সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে এবং বৃষ্টি আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
আরও পড়ুন: ইনানীতে ৪২ ঘণ্টা ধরে জ্বলছে আগুন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি
ভারী বৃষ্টিতে বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের চকরিয়ায় আবারও পাহাড় ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং এ ঘটনায় আরও একটি নারী আহত হয়েছেন। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত এখনও কার্যকর রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাস মতে, আগামী কয়েকদিন ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে যেকোনো ধরনের প্রাণহানি প্রতিরোধের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিকটস্থ সাইক্লোন শেল্টার বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের ০১৮৭২৬১৫১৩২ নম্বরে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান নিশ্চিত করেছেন যে, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম চালু হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া দূর না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের দেয়া তথ্যমতে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কক্সবাজার জেলার ১০ উপজেলার অন্তত ৩৫টি ইউনিয়নে দেড় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় পড়েছে। কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, চকরিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরি এবং ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন দুর্যোগজনিত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে ৯ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা প্রত্যাহার, নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি পানিসিক্ত হয়ে পড়েছে। তাই যেকোনো সময় নতুন করে বড় ধরনের পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটতে পারে। শহর ও গ্রামীণ এলাকার খাল-নালা উপচে পড়ায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, জেলার শতাধিক বাড়িতে পানি প্রবাহিত হয়েছে। বহু গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গেছে, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিভিন্ন স্থানে বিঘ্নিত হয়েছে। কক্সবাজার শহরের কলাতলী, সুগন্ধা, হোটেল-মোটেল জোন, বাজারঘাটা, তারাবনিয়াছড়া, আলীরজাহাল এবং বাস টার্মিনাল এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে গিয়ে শহরের অধিকাংশ সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে উত্তাল সাগরের কারণে টানা ৭ দিন ধরে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে যাত্রীবাহী ট্রলারসহ সকল নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। সেইসঙ্গে কক্সবাজার-মহেশখালী ও পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথেও নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজারো মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিশ্বের বৃহত্তম রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়েছে। টানা বর্ষণে সেখানে দুই শতাধিক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে।
ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানি চকরিয়া, পেকুয়া এবং মাতামুহুরি উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করেছে। এতে বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গিয়ে জনজীবনে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটেছে। বিভিন্ন এলাকার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সড়কের পানির কারণে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: নওগাঁয় ভাড়া বাসায় জাল টাকার কারবার, ডিবির হাতে গ্রেপ্তার জব্বার
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজাখালী, মগনামা এবং উজানটিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের এলাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজাখালী ইউনিয়নের বামুলাপাড়া-উলুডিয়া পাড়া, সুন্দরীপাড়া এলাকায় পানি আটকে থাকার কারণে জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হচ্ছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিপদ বাড়ছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টানা বৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে টইটং ইউনিয়নের হাজীবাজার এবং সোনাইছড়ি, শিলখালীর হেদায়াতাবাদ, মাঝেরঘোনা, কাছারীমোড়া ও পেঠান মাতবরপাড়া, রাজাখালীর বামুলাপাড়া, মৌলভীপাড়া, উলুডিয়াপাড়া, মগনামার শরৎঘোনা, পশ্চিম বাজারপাড়া, ধারিয়াখালী, ধরদরীঘোনা, মটকাভাঙা, চেরাংঘোনা, মরিচ্যাদিয়া, রঙ্গিয়াখালী, মগঘোনা, মাঝিরপাড়া ও মৌলভীপাড়া, উজানটিয়ার মিয়াপাড়া, সাবখালীপাড়া, ঘোষলপাড়া, পেকুয়ারচর এবং পেরাসিংগাপাড়া, পেকুয়া সদর ইউনিয়নের মোরারপাড়া, সৈকতপাড়া, পূর্ব মেহেরনামা এবং পশ্চিম গোয়াঁখালী।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বহু পরিবারের ঘরে পানি ঢুকে যাচ্ছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। অন্যান্যের মধ্যে গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যাতায়াতও চরম দুর্ভোগের মুখে পড়ছে। অনেক পরিবার নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান জানান, 'টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড় ধসের আশঙ্কা রয়েছে। এই কারণে পাহাড়সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।'
আরও পড়ুন: মাগুরায় বিএনপি নেতা হত্যা মামলায় সাবেক ওসি ও এসআইকে কারাগারে পাঠাল আদালত
পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও পেকুয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম বাহাদুর শাহ বলেন, 'নবগঠিত পেকুয়া পৌর এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে পেকুয়া বাজারের জেনারেল হাসপাতাল থেকে বাজারের পশ্চিম মাথা পর্যন্ত কহেলখালী খালের প্রয়োজনীয় জায়গায় ময়লা ও আবর্জনা অপসারণ করে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।'
এছাড়া খুলে দেয়া হয়েছে প্রবহমান খালের ওয়াপদা সংলগ্ন স্লুইস গেট। পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন, 'অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো পরিদর্শনসহ উপজেলা প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের পাশাপাশি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নিম্নাঞ্চল ও পাহাড়সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকবার আহ্বান করা হয়েছে।'
অন্যদিকে চকরিয়া কাকারা ফাহাশিয়া খালী লক্ষেশ্বর করইয়া ঘোনা বমুবিল ছড়ি চকরিয়া পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ড পানিতে তলিয়ে গেছে। এমনকি চকরিয়া সরকারি কলেজের মধ্যে হাঁটু পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয়েছে, যা নিয়ে ক্লাস এবং দাপ্তরিক কাজ করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রয়েছে। অতিরিক্ত শুকনো খাবারের চাহিদাও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ঢেউটিন তার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে কন্ট্রোল রুমের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে এবং সব উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও -১ আসনে উপনির্বাচন সরকারি দলকে সমর্থন, গভীর রাতে প্রত্যাহার হলেন ৯ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন