০২:৪৩ এম
জাহাজের স্ক্র্যাপ থেকে বের হয়ে আসা এসব লাইফবোট এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ছবির মধ্যে দেখা যাচ্ছে: আমার দেশ পত্রিকা। জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে একসময় যেসব লাইফবোট পরিত্যক্ত সামগ্রী হিসেবে পড়ে থাকত, এখন সেগুলোই কোটি টাকার বাণিজ্যের উপকরণ হয়ে উঠেছে। সমুদ্রগামী জাহাজের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত লাইফবোটগুলো সংগ্রহ, সংস্কার এবং আধুনিকায়নের মাধ্যমে নতুন জীবন পাচ্ছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে। জাহাজের স্ক্র্যাপ থেকে বের হয়ে আসা এসব বোট বর্তমানে দেশের সমুদ্র, নদী, হাওর এবং পর্যটন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। মাছ ধরার, যাত্রী পরিবহনের, পর্যটন ব্যবসা থেকে শুরু করে বন্যা ও দুর্যোগের সময় উদ্ধারকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এসব জলযান।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী, মাদাম বিবিরহাট, মদনহাট, কদমরসুল, শীতলপুর এবং সোনাইছড়ি এলাকায় লাইফবোটের একটি জমজমাট বাজার গড়ে উঠেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে এবং বিভিন্ন খালের মধ্যে সারি সারি ফাইবার লাইফবোট ও স্পিডবোট এখন এ এলাকার নতুন পরিচিতি। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা, জেলে, পর্যটন উদ্যোক্তা এবং সাধারণ ক্রেতারা এসে এসব বোট কিনছেন।
এ সম্পর্কিত সূত্র জানাচ্ছে, ফৌজদারহাট থেকে ছোট কুমিরা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকায় ৩০ থেকে ৪০টি শিপব্রেকিং ইয়ার্ড রয়েছে। বিদেশ থেকে আমদানি করা বড় জাহাজগুলো ভাঙার সময় উদ্ধার হয় লাইফবোটগুলো। পরে ব্যবসায়ীরা এসব বোট সংগ্রহ করেন টেন্ডারের মাধ্যমে। পুরোনো কাঠামো পরীক্ষা করে দক্ষ কারিগররা এগুলো মেরামত করেন, ফাইবারের কাজ, রং করাসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করে সেগুলোকে আবার ব্যবহারযোগ্য করে তোলেন।
আরও পড়ুন: কাঁঠালিয়ায় ৫০ চুল্লিতে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি, জনস্বাস্থ্যে ঝুঁকি
এসএল শিপ ইয়ার্ডের মালিক লোকমান হাকিম জানান, জাহাজ ভাঙা কারখানায় আসা বড় জাহাজ থেকে প্রতিবছর শত শত ছোট, মাঝারি এবং বড় স্পিডবোট উদ্ধার করা হয়। ব্যবসায়ীরা টেন্ডারের মাধ্যমে এসব বোট সংগ্রহ করে নতুনভাবে প্রস্তুত এবং বিক্রি করেন। জাহাজ গভীর সমুদ্রে বিপদে পড়লে নাবিকদের জীবন রক্ষার জন্য এসব লাইফবোট রাখা হয়ে থাকে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, একসময় জেলেরা গাছের তৈরি বড় নৌকা ব্যবহার করতেন। এখন সেই জায়গা দখল করেছে ফাইবার লাইফবোট ও স্পিডবোট। শক্তিশালী ইঞ্জিন বসিয়ে এসব বোট দিয়ে জেলেরা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরছেন। কাঠের নৌকার তুলনায় এগুলো অধিক নিরাপদ, দ্রুতগতি সম্পন্ন এবং দীর্ঘস্থায়ী।
সীতাকুণ্ডের বাজারে আকার ও সক্ষমতা অনুযায়ী বিভিন্ন দামের বোট পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণ ফাইবার বোটের দাম ৫০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকার মধ্যে। ইঞ্জিনসহ মাঝারি আকারের লাইফবোট বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। আর উচ্চগতির রেসকিউ স্পিডবোটের দাম ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে। ব্যবসায়ীরা জানান, কাঠের নৌকার তুলনায় ফাইবার লাইফবোটের স্থায়িত্ব বেশি এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম। কাঠ পচে যাওয়া, নিয়মিত আলকাতরা দেওয়ার বা ঘন ঘন মেরামতের প্রয়োজন হয় না। এ কারণে উপকূলীয় এলাকার জেলে, মাছ ব্যবসায়ী, পর্যটন উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে এসব বোটের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
বোট ব্যবসায়ী শওকত হোসেন বলেন, সীতাকুণ্ডের বোটের বাজার এখন চট্টগ্রাম অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এখানে বোট কিনতে আসছে। নোয়াখালী, চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী ও খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকার ক্রেতারা এসব বোট নিয়ে যাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের খোসা থেকে তৈরি হচ্ছে 'ম্যাংগো পিল টি'
বাঁশবাড়িয়ার জেলে পাড়ার নিরঞ্জন ও উপেন্দ্র জলদাস বলেছেন, এ বোটে প্রয়োজন অনুযায়ী ইঞ্জিন বসিয়ে সাগর ও নদীতে মাছ ধরা যায়। কাঠের নৌকার তুলনায় এটি অনেক বেশি নিরাপদ এবং দীর্ঘদিন ব্যবহার করা সম্ভব। মৎস্য আহরণের পাশাপাশি পর্যটন খাতে এসব লাইফবোটের ব্যবহার দ্রুত বেড়ে চলেছে। দেশের বিভিন্ন লেক, হ্রদ এবং পর্যটন এলাকায় ছাদযুক্ত স্পিডবোট বর্তমানে পর্যটকদের চলাচলের এবং বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। সিলেটের জাফলং থেকে আসা পর্যটন উদ্যোক্তা নুরে আলম জানান, তিনি পর্যটন এলাকায় ব্যবহারের জন্য ভালো মানের ও সাশ্রয়ী বোটের খোঁজে সীতাকুণ্ডে এসেছেন। এখন অনেক উদ্যোক্তা এখান থেকেই বোট সংগ্রহ করছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আন্তর্জাতিক মানের জাহাজে ব্যবহৃত লাইফবোটে বিশেষ ভাসমান ব্যবস্থা থাকায় এগুলো সহজে ডুবে যায় না। এ কারণে হাওর, নদী ও উপকূলীয় এলাকায় এগুলোকে নিরাপদ জলযান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে সীতাকুণ্ড থেকে ট্রাক ও ট্রেইলারের মাধ্যমে এসব বোট যাচ্ছে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল, কাপ্তাই হ্রদ, রাঙামাটি, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, খুলনা ও পিরোজপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
দুর্যোগকালেও এসব বোটের গুরুত্ব বাড়ছে। গত বছর ফেনীতে ভয়াবহ বন্যার সময় সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্প এলাকার এসব স্পিডবোট ব্যবহার করে পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার, ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া এবং জরুরি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছিল। স্থানীয় উদ্যোক্তারা জানান, জাহাজ ভাঙা শিল্পের ফেলে দেওয়া সম্পদকে পুনর্ব্যবহার করে গড়ে ওঠা এই বাজার এখন সীতাকুণ্ডের নতুন অর্থনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছে। একদিকে যেমন তৈরি হচ্ছে নতুন ব্যবসার সুযোগ, অন্যদিকে দেশের নৌ অর্থনীতি, মৎস্য খাত এবং পর্যটন শিল্প নতুন গতি পাচ্ছে। প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা, সহজ অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত হলে সীতাকুণ্ডের লাইফবোটের এই বাজার ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম বৃহত্তম পুনর্ব্যবহৃত নৌযান সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে পরিণত হতে পারে।
আরও পড়ুন: ইউপি নির্বাচনে বিএনপির দুই পক্ষে সংঘর্ষ, দুজন গুলিবিদ্ধসহ আহত ৩
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন